ফেক আইডি ও সাইবার বুলিং : মামলা হচ্ছে কিন্তু বিচার কতটা কার্যকর হচ্ছে

তৌসিফ রেজা আশরাফী

প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডিজিটাল যুগে আমরা এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে মানুষের উপস্থিতি শুধু শারীরিক জগতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি সমান্তরাল ভার্চুয়াল পরিচয়ও তৈরি হয়েছে। এই ভার্চুয়াল জগত আমাদের যোগাযোগকে সহজ করেছে, মত প্রকাশের সুযোগ বিস্তৃত করেছে, কিন্তু একইসঙ্গে জন্ম দিয়েছে এক নতুন ধরনের অনিরাপত্তা। ফেক আইডি ও সাইবার বুলিং এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে এই ভার্চুয়াল জগত কি বাস্তবের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে?

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তার যেমন দ্রুত ঘটেছে, তেমনি অনলাইন অপরাধও সমানতালে বেড়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটিরও বেশি। এত বড় একটি ডিজিটাল জনসংখ্যা যখন প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়, তখন সেখানে অপব্যবহারের সুযোগও তৈরি হয়। এই সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবহারকারী, যারা ফেক আইডির আড়ালে থেকে অন্যকে হয়রানি করছে, অপমান করছে, এমনকি আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ফেক আইডির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অজ্ঞাতপরিচয় থাকা। বাস্তব জীবনে একজন ব্যক্তি যতটা সংযত থাকে, অনলাইনে ফেক পরিচয়ের আড়ালে সে ততটাই বেপরোয়া হয়ে ওঠে। কারও ছবি নিয়ে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করা, সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে প্রতারণা করা এসব এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। অনেক সময় রাজনৈতিক বা ধর্মীয় উদ্দেশেও এসব আইডি ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে সাইবার বুলিং বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। এটি এমন এক ধরনের মানসিক নিপীড়ন, যা সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও ভুক্তভোগীর ওপর তীব্র প্রভাব ফেলে। কাউকে নিয়ে কটূক্তি করা, অপমানজনক মন্তব্য ছড়ানো, ধারাবাহিকভাবে হুমকি দেওয়া বা ট্রল করা এসবই সাইবার বুলিংয়ের অন্তর্ভুক্ত। UNICEF -এর এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বে প্রতি তিনজন কিশোরের একজন কোনো না কোনোভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এই সংখ্যা আরও উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ-এর গবেষণা বলছে, প্রায় ৬০ শতাংশ তরুণ-তরুণী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অনলাইন হয়রানির শিকার হয়েছে। আইনগতভাবে বাংলাদেশে এই সমস্যা মোকাবিলার জন্য কিছু কাঠামো রয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর আওতায় ভুয়া তথ্য প্রচার, মানহানি, অনলাইন হয়রানি এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের জন্য কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬-এর কিছু ধারা সাইবার অপরাধ দমনে ব্যবহৃত হচ্ছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী ৩ বছর থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থদণ্ড হতে পারে। তবে আইন থাকলেই যে সমস্যা সমাধান হয়ে যায়, তা নয়। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে ভয় পায় বা সামাজিক কারণে নীরব থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় নেয়, ফলে ন্যায়বিচার বিলম্বিত হয়। এই বাস্তবতা অপরাধীদের জন্য এক ধরনের সুযোগ তৈরি করে।

শুধু হয়রানি নয়, এর বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার চাওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। বিভিন্ন আদালত ও গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত এক দশকে হাজার হাজার সাইবার অপরাধের মামলা দায়ের হয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সাইবার ট্রাইব্যুনালে প্রায় ২,৬০০-এর বেশি মামলা হয়েছে, এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৫,০০০-এরও বেশি ছাড়িয়েছে। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলোএই বিপুল সংখ্যক মামলার মধ্যে খুব অল্প সংখ্যকই শেষ পর্যন্ত দণ্ডাদেশে পৌঁছায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিষ্পত্তি হওয়া মামলার মধ্যে প্রায় ৯৫ থেকে ৯৭ শতাংশ ক্ষেত্রে আসামিরা খালাস পায় বা মামলা খারিজ হয়ে যায়। কোনো কোনো পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, হাজার হাজার মামলার বিপরীতে দণ্ডাদেশের সংখ্যা মাত্র কয়েক ডজন। এই বাস্তবতা একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করে মামলা হচ্ছে, কিন্তু বিচার কতটা কার্যকর হচ্ছে? এর সঙ্গে যুক্ত হয় অভিযোগ করার অনীহা, সামাজিক লজ্জা এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, যা সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তোলে। অনেক ভুক্তভোগী শুরুতেই আইনি পদক্ষেপ নিতে ভয় পায়, আবার যারা নেয়, তাদের অনেকেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় হতাশ হয়ে পড়ে। অনেকে মনে করেন, অনলাইনে যা ঘটে তা বাস্তব জীবনের মতো গুরুতর নয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাস্তব জীবনে একটি অপমান হয়তো সীমিত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু ভার্চুয়াল জগতে একটি অপমান মুহূর্তেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। একটি ছবি বা ভিডিও একবার ছড়িয়ে পড়লে তা পুরোপুরি মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। ফলে ভুক্তভোগীকে দীর্ঘ সময় ধরে একই মানসিক আঘাত বহন করতে হয়। এই দিক থেকে বিবেচনা করলে, ভার্চুয়াল জগত অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবের চেয়েও বেশি নির্মম। সমাধানের প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র সব স্তরেই ডিজিটাল আচরণ নিয়ে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করতে হবে। একজন ব্যবহারকারী হিসেবে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেমন আছে, তেমনি অন্যের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণও জরুরি। অচেনা আইডির সঙ্গে যোগাযোগে সতর্ক থাকা, ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করা, এবং হয়রানির শিকার হলে প্রমাণ সংরক্ষণ করে আইনি সহায়তা নেওয়া এসব বিষয় এখন মৌলিক নাগরিক দক্ষতার অংশ হওয়া উচিত। সর্বশেষে বলা যায়, ভার্চুয়াল জগত নিজে ভয়ঙ্কর নয়; ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তখনই, যখন এটি দায়িত্বহীন মানুষের হাতে পড়ে। ফেক আইডি ও সাইবার বুলিং সেই দায়িত্বহীনতারই প্রতিফলন।

তৌসিফ রেজা আশরাফী

লেখক ও কলামিস্ট