হাতের স্মার্টফোনটি যখন হ্যাকারদের হাতিয়ার

আমানুর রহমান

প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির এই সুবর্ণ সময়ে স্মার্টফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে করে তুলেছে অভাবনীয় মাত্রায় সহজ ও গতিশীল। ব্যাংকের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর ক্লান্তি এড়িয়ে হাতের মুঠোয় থাকা যন্ত্রটির সাহায্যেই মানুষ মুহূর্তের মধ্যে সম্পন্ন করতে পারছে লক্ষাধিক টাকার লেনদেন। কিন্তু এই স্বাচ্ছন্দ্যের আড়ালেই নিঃশব্দে বিস্তার লাভ করছে সাইবার প্রতারণার এক ভয়ংকর জাল। সাইবার জগতে ‘বিনা মূল্যে’ বলে আসলে কিছুই নেই- এই চরম সত্যটি ভুলে গেলেই সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এক অভিনব ও ভয়াবহ হ্যাকিং পদ্ধতির প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে, যেখানে একটি ভুয়া অ্যাপের প্রলোভনে পড়ে নিমিষেই শূন্য হয়ে যাচ্ছে মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয়।

বর্তমান সময়ে প্রতারক চক্র মূলত সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে খেলছে। তারা বিভিন্ন ওয়েবসাইটে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত লোভনীয় অফার, বিনামূল্যে প্রিমিয়াম সেবা কিংবা সরাসরি খেলা দেখার সুযোগ দেওয়ার কথা বলে চটকদার বিজ্ঞাপন প্রচার করে। অনেকেই এসব বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দিয়ে আনঅফিশিয়াল বা থার্ড পার্টি লিংক থেকে না বুঝেই অ্যাপ ডাউনলোড করে বসেন। এই অ্যাপগুলোই মূলত ক্ষতিকর ম্যালওয়্যার হিসেবে কাজ করে। একজন ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, তিনি খেলা দেখার জন্য ‘এনবি’ নামের একটি ফ্রি অ্যাপ ইনস্টল করেছিলেন। অ্যাপটি ইনস্টল করার পরপরই তার মোবাইল ফোনটি হ্যাং হয়ে যায় এবং স্ক্রিন সম্পূর্ণ কালো হয়ে বারবার রিস্টার্ট নিতে থাকে। ভুক্তভোগী বুঝতেও পারেননি যে, এই ব্ল্যাক স্ক্রিনের আড়ালেই হ্যাকাররা দূর থেকে তার ফোনের রিমোট কন্ট্রোল বা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছে। এরপর তিনি আতঙ্কিত হয়ে ব্যালেন্স চেক করতে নিজের ব্যাংকিং অ্যাপে প্রবেশ করার সময় হ্যাকাররা স্ক্রিন মিররিংয়ের মাধ্যমে তার গোপন পিন জেনে নেয় এবং মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে অ্যাকাউন্ট থেকে পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। একই অভিনব কৌশলের শিকার হয়ে আরেক ভুক্তভোগী মাত্র পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যে তিন লাখ টাকা হারান। তার ফোনেও হঠাৎ করে ‘সিস্টেম আপডেটিং’ লেখা ভেসে উঠেছিল এবং তিনি কোনো বাটন চাপতে পারছিলেন না। এই সুযোগে হ্যাকাররা ব্যাংকের ওটিপি (ঙঞচ) নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে লেনদেন সম্পন্ন করে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাইবার ইউনিটের তথ্য মতে, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে তাদের কাছে এমন অভিনব প্রতারণার অন্তত ৩০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। গোয়েন্দা তদন্তে দেখা গেছে, হ্যাকাররা দেশের ভেতরেরই বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে টাকাগুলো সরিয়ে নিচ্ছে। তবে যে অ্যাকাউন্টগুলোতে টাকা জমা হচ্ছে, সেগুলো মূলত ভুয়া পরিচয়ে খোলা। সাইবার বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই প্রতারক চক্রের শিকড় অনেক গভীরে এবং অনেক ক্ষেত্রে দেশের বাইরে, বিশেষ করে চীন থেকে এসব সংঘবদ্ধ সাইবার হামলা পরিচালিত হচ্ছে।

এই ভীতিকর প্রভাব থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে সাইবার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শগুলো খুবই যুক্তিসংগত এবং পরিষ্কার। প্রথমত, গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোরের মতো অফিশিয়াল প্ল্যাটফর্ম বাদে অন্য কোনো অচেনা লিংক, ওয়েবসাইট বা ডোমেইন থেকে কখনই অ্যাপ ডাউনলোড করা উচিত নয়। দ্বিতীয়ত, যে যন্ত্রে ব্যাংকিং লেনদেন, মোবাইল ব্যাংকিং বা অফিস-সম্পর্কিত গোপন কাজ করা হয়, সেখানে অযথা কোনো বিনা মূল্যের গেম বা অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ইনস্টল করা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎক্ষণিক সুরক্ষা পদক্ষেপ হলো- যদি ভুলবশত কোনো লিংকে ক্লিক বা অ্যাপ ইনস্টল করার পর ফোনের স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে যায় অথবা ফোনের আচরণ সন্দেহজনক হতে শুরু করে, তবে বিন্দুমাত্র দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গেই ফোনের ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করতে হবে।

ইন্টারনেটের এই বিশাল জগতে বিনা মূল্যে পাওয়া কোনো সেবাই আসলে পুরোপুরি ফ্রি নয়; এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার বড় কোনো ফাঁদ। তাই ডিজিটাল প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিশেষজ্ঞদের দেওয়া সাইবার নিরাপত্তার নিয়মগুলো মেনে চলার মাধ্যমেই আমরা আমাদের কষ্টার্জিত অর্থ সুরক্ষিত রাখতে পারি।

আমানুর রহমান

শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ