ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শিশুর বাসযোগ্য বাংলাদেশ চাই

মো. কামরুল হাসান
শিশুর বাসযোগ্য বাংলাদেশ চাই

‘আমি এই পৃথিবীকে প্রতিটি শিশুর বাসযোগ্য করে রেখে যেতে চাই’- কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বলেছেন কথাটি। কিন্তু, বাংলাদেশের চিত্রটা ভয়াবহ, বীভৎস কত উদাহরণ চোখে পড়ে নৈত্যদিন! খেই হারিয়ে ফেলতে হয় কখনও, সহজাত মানবীয় মস্তিষ্ক বৈদ্যুতিক শক খায় আর সেইসঙ্গে শব্দরা হারিয়ে যায় শোক ও ক্রোধের অগ্নিপুরে- উপলব্ধি-ক্ষমতা তালগোল পাকিয়ে ফেলে। ১১ বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে মাদ্রাসা শিক্ষকের উপর।

শিশুটির গর্ভে এখন আরেকটা শিশু! চিকিৎসককে তার সরল শিশুতোষ উক্তি, ‘ম্যাডাম, আমার পেটটা ভার ভার লাগে, কি জানি নড়ে’! কী বীভৎস এই উক্তি, মানুষের কী ভয়াবহ নৈতিক অধঃপতন হলে এই নির্মম উক্তি একটি শিশুর মুখে শুনতে হয়! চিকিৎসকের ভাষ্যমতে এমন জটিল অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু ঝুঁকি সর্বোচ্চ! চিকিৎসকের জিজ্ঞাসায় শিশুটি প্যানিকড, শুধু হুজুর হুজুর শব্দ আওড়াচ্ছে!

বাংলাদেশে মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষক দ্বারা শিশু নির্যাতনের খবর অহরহ। কখনও শিশু বলাৎকার, কখনও ধর্ষণ! কিন্তু, যথোপযুক্ত তদন্ত ও বিচারিক গতি দেখা যায় না। ধর্মীয় শিক্ষার ফাঁকা বুলি ছুঁড়ে যত্রযত্রে অনুমোদনবিহীন আবাসিক অনাবাসিক মাদ্রাসা গড়ে উঠছে, সরকারের বিধি ও নিয়মের বাইরে এসব প্রতিষ্ঠান জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকে। যে কেউ ইচ্ছে হলেই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে, ছোট্ট বিল্ডিং এ আবাসিক মহিলা বা বালিকা মাদ্রাসা চালু করতে পারে মন চাইলেই।

এখানে প্রতিষ্ঠাতা বা উদ্যোক্তাই সর্বেসর্বা, কেন্দ্রীয় কোনো নিয়ন্ত্রণ পক্ষ নেই। এসব মাদ্রাসাগুলোতে পড়াশোনা করে মূলত ছিন্নমূল ও দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশের ছেলে-মেয়েরা, ফলে নির্যাতিত হলে বিচার পাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। নানা ভয়-ভিতি ও সংকটে কখনও আপোষে যেতে বাধ্য হয়, কখনও ন্যূনতম বিচারই পায়না ভুক্তভোগী পরিবার। ভিকটিম ১১ বছরের শিশুটির মা বিধবা, অন্যের বাড়িতে থাকেন।

ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর এই দেশে ধর্মীয় শিক্ষায় মানুষের আলাদা আগ্রহ আছে, সেইসঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষকদের প্রতিও বিশেষ শ্রদ্ধা থাকে। কিন্তু, কিছু অসাধু ব্যক্তি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বৃহত্তর আলেমগণের মান-সম্ভ্রম বিনষ্ট করে, যথোপযুক্ত যোগ্য শিক্ষকের অভাবে মাদ্রাসাগুলোতে শিশুরা গুণগত শিক্ষা পায়না, ধর্মীয় শিক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করতে দেখা যায় বিভিন্ন চাঁদা সংগ্রহে, বাড়ি বাড়ি পাঠানো হয় চাল ডাল অনুদান সংগ্রহে, কখনও মাহফিলের নামে কখনও নিজেদের প্রতিষ্ঠানের নামে। গ্রামে এগুলো নিত্য-নৈমিত্তিক চিত্র। ধর্মীয় রঙের আড়ালে রীতিমতো ভিক্ষাবৃত্তির শিক্ষা দেওয়া হয় কোমলমতি শিশুদের।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে ধর্মীয় শিক্ষা অপরিহার্য। মাদ্রাসা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ এটি অস্বীকার করার জো নেই। কিন্তু সেখানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও তদারকি প্রয়োজন। সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো ও কারিকুলামের অধীন এই মাদ্রাসা ব্যবস্থাকে চালানো উচিত, আরও উন্নত করা উচিত- যেখানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ থাকবে। জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। শিশুদের মানসিক বিকাশে ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের অবারিত সুযোগ থাকবে। উল্লেখ্য, মানবীয় জীবনচক্রের দুটি শিশুতোষ পর্যায় আছে যার মূল বৈশিষ্ট্য শিশুত্ব। ১১ বছর বয়সের কন্যাশিশু আর ৭৫ বছরের একজন বৃদ্ধা- দুই পর্যায়ে দুজনই শিশু, শুধু অবস্থা ও দৃষ্টিকোণ ভীন্ন। ১১ বছর বয়সটা মানসিক ও দৈহিক গড়নে শিশু, আর দ্বিতীয়টা মানসিকভাবে শিশু। পৃথিবীর সব মানুষ শিশু হয়ে জন্ম নেয়, সময়ের পরিক্রমে আবার একসময় শিশু হয়ে যায়। কারণ, শিশুরই কোনো রঙ নেই, ধর্ম নেই, জাত নেই, উঁচু-নিচ সমাজ নেই- শিশু মাত্রই পবিত্রতা, মায়া ও স্নিগ্ধতার প্রতীক।

বাংলাদেশ শিশুর জন্য বাস উপযোগী নয়। এখানে শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রকট আকার ধারণ করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে ২০২৪ সালের প্রথম সাত মাসেই ১৭৫ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে বছরের শেষ নাগাদ ২৫৪ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০২৫ সালে ১,৮৯৭ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ২৪ সালের তুলনায় যা অধিক। ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ধর্ষণের পর অন্তত ৪৭ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, এছাড়াও ১০৪ জন শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে! সরকারি শিশু সহায়তা কেন্দ্রে (১০৯৮) এ শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত কল ২০২২ সালে ৮০২১টি ছিল, ২০২৫ যার সংখ্যা ২৬,৩০০তে দাঁড়িয়েছে।

এগুলো শুধু পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্যমতে। বাস্তবে এর সংখ্যা বহুগুণ বেশি। সাধারণত লোকলজ্জার ভয়ে, শিশু বা ভিকটিম কন্যার স্বজনরা মামলা ঝামেলা এড়াতে চান, তাছাড়াও আইনি দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে ধর্ষণ মামলাগুলো ঝুলে থাকে। ফলে, বিচার যথাসময়ে পাওয়া যায় না। গ্রাম্যসমাজে সালিশ-বাণিজ্য করেও ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়। ফলে, একটি দেশে ভয়াবহ আকারে বেড়েই চলছে কোমলপ্রাণ শিশু নির্যাতন। আমরাও ভিকটিম এই শিশুদের অভিশাপ নিঃশ্বাস গিলে গিলে অভিশপ্ত হয়ে যাচ্ছি!

এই ঘটনায়ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এরইমধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, প্রকৃত অপরাধী তদন্তসাপেক্ষ নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশু নির্যাতন নতুন নয়, এগুলো দিনদিন বেড়েই চলছে। নির্মম সত্য হলো- ১১ বছর বয়সের শিশুটির সঙ্গে ভয়াবহ অন্যায় হয়েছে, এটা ভাবতেই শিউরে ওঠে গা! যেকোনো মূল্যেই এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হতে হবে। শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।

মো. কামরুল হাসান

ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত