প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৬ মে, ২০২৬
নদীমাতৃক বাংলাদেশে সহস্রাধিক নদী জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। নদী এদেশের প্রাণস্বরূপ। অসংখ্য নদী দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করার মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখতে সাহায্য করে। এছাড়াও নদী এদেশের অর্থনীতি, কৃষি এবং সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। নদীর দুপাশ ঘেঁষেই এদেশের অধিকাংশ জনপদ, শহর ও বন্দর গড়ে উঠেছে। যা হাজার বছরের সংস্কৃতিকে ধারণ করে। এদেশের অধিকাংশ নদীই এখন বর্জ্য দূষণের শিকার। তেমনি বর্জ্য দূষণের শিকার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে চলা কাঁচামাটিয়া নদীটি। নদীটির ব্রিজ সংলগ্ন রাস্তার পাশে গড়ে উঠেছে বিশাল ময়লার স্তূপ। স্থানীয় জনগণের বেখেয়ালি মনোভাব ও প্রশাসনের উদাসীনতায় নদীটি তার স্বকীয়তা হারাতে বসেছে। দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা এই ময়লার স্তূপে শুধু নদীর সৌন্দর্যই নষ্ট হচ্ছে না, বরং পরিবেশের উপরেও ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে।
রাস্তা ও নদীর পাশে এই ময়লার স্তূপের কারণে যানচলাচল ও জনগণের চলাচলের সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পরিবেশ ও জনজীবনের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতায় মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর তীব্র দুর্গন্ধে পথচারীসহ বিপর্যস্ত জনজীবন। নদী দূষণের কারণে জলজ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি নদীটি তার স্বাভাবিক গতিপথ হারাচ্ছে। রয়েছে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও। তাছাড়াও নদীর পানিতে প্লাস্টিক ও পলিথিন এর কারণে অক্সিজেন এর মাত্রা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে জলজ প্রাণীগুলো তাদের বাসস্থানের অভাবে ধ্বংসের মুখে নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে বেড়াচ্ছে। ময়লা থেকে বিষাক্ত পদার্থ নদীর পানির সঙ্গে মিশে সেই পানিকে ব্যবহার অযোগ্য করে তুলেছে। নিয়মিত ময়লা ফেলার কারণে নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে। সড়ক অবরুদ্ধ হওয়ায় যাতায়াত বিঘ্নিত ও শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। ময়লার স্তূপ থেকে প্রতিনিয়ত উৎকট দুর্গন্ধ ছড়ায় যা মূলত পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করে। ময়লা থেকে উৎপন্ন ক্ষতিকর গ্যাস বাতাসের সঙ্গে মিশে বায়ুদূষণ বাড়াচ্ছে। ফলে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগের উপদ্রব বাড়ছে। বাতাসের মাধ্যমে দূষিত এই কণা ও দুর্গন্ধ দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই ময়লা আবর্জনা থেকেই পানিবাহিত ও মশা বাহিত রোগ ছড়াচ্ছে। এই ময়লার স্তূপ মশা মাছির বংশবৃদ্ধির নিরাপদ স্থান, যা থেকে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া ও নানান ধরনের পানবাহিত রোগ ছড়ায়। পথচারীদের নাকে কাপড় চেপে চলাচল করতে হয়, যা মুলত অস্বস্তিকর। নদীর উপরে বা পাড়ে ময়লার স্তূপ পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য একটি ভয়াবহ হুমকি। স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের সমন্বয়হীনতার কারণে এই সমস্যা প্রকট হচ্ছে।
এই সমস্যা সমাধানে নাগরিক ও প্রশাসনের উভয়েরই সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সচেতনতা বৃদ্ধি করা। যত্রতত্র ময়লা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার অভ্যাস করা। নিজের ঘর বা দোকানের ময়লা নদীতে না ফেলে বর্জ্য সংগ্রহকারীদের কাছে দেওয়া। সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। স্থানীয় যুবসমাজ ও বাসিন্দাদের উদ্যোগে মাঝে মধ্যে নদীর পাড় পরিষ্কারের আয়োজন করা। প্রশাসনের ভূমিকা হিসেবে বিকল্প ডাম্পিং ইয়ার্ড স্থাপন করা। এলাকায় ময়লা ফেলার জায়গা না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে নদীতে ময়লা ফেলে। তাই নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ করা, আইন প্রয়োগ ও শাস্তির ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়। নদী খনন করে নদীর স্বকীয়তা ফিরিয়ে আনতে হবে, নদীর ময়লার স্তূপ পরিষ্কার করে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসন এক সঙ্গে কাজ করলে এ সমস্যা দ্রুত সমাধান সম্ভব। দোষারোপ রাজনীতি বন্ধ করে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। যদি নাগরিকরা সচেতন হয়ে ময়লা ফেলা বন্ধ করে এবং প্রশাসন ময়লা অপসারণের সঠিক ব্যবস্থাপনা করে, তাহলেই নদীগুলো রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা পাবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নদী রক্ষাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নদী পরিষ্কার রাখা দেশ ও প্রকৃতি উভয়ের জন্যই অপরিহার্য। নদী হলো প্রকৃতির ধমনী। নদী দূষণ মুক্ত ও পরিষ্কার থাকলে পরিবেশ, অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। নদী পরিষ্কার থাকলে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ কমে যায়। কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ উদ্ভিদ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে ওঠে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল করে। নদী পরিষ্কার রাখা শুধু পরিবেশের দায়িত্ব নয়, বরং টেকসই উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির এক দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
নদী আমাদের জীবনরেখা অথচ শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক ও মানুষের অসচেতনতার কারণে নদীগুলো আজ মারাত্মক দূষণের শিকার। নদী পরিষ্কার রাখা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, এটি নাগরিক হিসেবে আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে আমাদের অসচেতনতায় যেন আমরা আমাদের নদীগুলোকে হারিয়ে না ফেলি। ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই নদীগুলোকে প্রাণবন্ত করে তোলা সম্ভব।
সাদিয়া হোসাইন
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা