পার্বত্য চট্টগ্রাম : অমীমাংসিত অধ্যায় নয় অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

এম মহাসিন মিয়া

প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত, সমালোচিত ও বিতর্কিত এক ভূখণ্ড। অনেকেই একে ‘অমীমাংসিত অধ্যায়’ হিসেবে আখ্যা দেন। কিন্তু সময়ের দাবি হলো, এই অঞ্চলকে আর সংকট, সংঘাত ও সন্দেহের ফ্রেমে না দেখে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অধ্যায়’ হিসেবে গড়ে তোলা। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়, এটি বহুজাতিক, বহুসাংস্কৃতিক ও বহুমাত্রিক সম্ভাবনার এক অনন্য সংমিশ্রণ।

?পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা বুঝতে হলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাতের অবসানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। চুক্তিটি ছিল আস্থা পুনর্গঠন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পরও নানা কারণে পূর্ণ বাস্তবায়ন ও পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে ‘অমীমাংসিত অধ্যায়’ কথাটি এখনও জনমানসে ঘুরপাক খায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সমস্যাকে বারবার উচ্চারণ করলেই সমাধান আসে না, সমাধানের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলেই পরিবর্তন সম্ভব। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান। প্রতিটি জেলাই ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সম্পদ ও পর্যটন সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ। কিন্তু উন্নয়নের সূচকে এই অঞ্চল এখনও জাতীয় গড়ের তুলনায় পিছিয়ে। অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ সবক্ষেত্রেই রয়েছে বিশেষ চ্যালেঞ্জ।

?এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একমাত্র পথ হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন মানে কেবল রাস্তা-ঘাট নির্মাণ নয়, বরং এমন উন্নয়ন, যেখানে সব জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সমান মতামত, সংস্কৃতি ও অধিকারকে সম্মান জানানো হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খিয়াংসহ বহু উপজাতি জনগোষ্ঠী এবং বাঙালি জনগোষ্ঠী একসঙ্গে বসবাস করে। উন্নয়নের পরিকল্পনায় যদি কোনো একটি পক্ষ নিজেকে বঞ্চিত মনে করে, তাহলে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না। সমান অধিকার নিশ্চিত করা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার প্রধান শর্ত। ভূমি বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম জটিল সমস্যা। ভূমি কমিশনের কার্যকারিতা বাড়ানো, বিরোধ নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা ও দ্রুততা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করা জরুরি। একইসঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ করলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুরা মূলধারায় আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।

??অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদগুলোকে আরও কার্যকর, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করা প্রয়োজন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতায়ন এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ালে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য হবে। উন্নয়ন যেন ‘উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া’ না হয়ে ‘ভিত্তি থেকে উঠে আসা’ হয়, সেই মনোভাব গড়ে তোলা জরুরি। অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও পার্বত্য চট্টগ্রাম এক সম্ভাবনাময় অঞ্চল। কৃষি, ফলচাষ, বাঁশ ও বনজ সম্পদ, ইকো-ট্যুরিজম, সব ক্ষেত্রেই রয়েছে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সুযোগ। তবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড় কেটে অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা অনিয়ন্ত্রিত বন উজাড় দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা অপরিহার্য।

?সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পারস্পরিক অবিশ্বাস, গুজব ও রাজনৈতিক বিভাজনকে পুঁজি করে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা সহজ। তাই প্রয়োজন আন্তঃজাতিগোষ্ঠী সংলাপ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং যৌথ সামাজিক উদ্যোগ। স্কুল, কলেজ ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে শুধু সংঘাতের খবরের উৎস হিসেবে না তুলে ধরে, বরং ইতিবাচক পরিবর্তন, সাফল্য ও সহাবস্থানের গল্পগুলোও সামনে আনে। রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন জরুরি। নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে নিরাপত্তার পাশাপাশি উন্নয়ন, আস্থা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সমান জরুরি। জনগণের সঙ্গে প্রশাসনের সম্পর্ক যদি বিশ্বাসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, তাহলে বিচ্ছিন্নতাবাদী বা উগ্রপন্থি শক্তির প্রভাব কমে আসবে। তরুণ প্রজন্মকে কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সহায়তার মাধ্যমে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।

?সবচেয়ে বড় কথা, পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘অমীমাংসিত অধ্যায়’ বলে চিহ্নিত করা মানে এক ধরনের মানসিক দূরত্ব বজায় রাখা। বরং একে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অধ্যায়’ হিসেবে দেখলে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। তখন প্রশ্ন হয়, কিভাবে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোনো যায়, কীভাবে বৈচিত্র্যকে শক্তিতে রূপান্তর করা যায়, কীভাবে পাহাড়, মানুষ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে ভবিষ্যতের পথে হাঁটে। একটি শান্ত, সমৃদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়া সম্ভব, যদি আমরা সমান অধিকার, পারস্পরিক সম্মান ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নকে মূলমন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করি। পাহাড়ের সৌন্দর্য শুধু প্রকৃতির নয়, এটি মানুষের সহাবস্থান, সংস্কৃতি ও সংগ্রামেরও প্রতীক। সেই প্রতীককে সম্মান জানিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে এমন এক ভবিষ্যতের দিকে, যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম আর কোনো অমীমাংসিত অধ্যায় নয়, বরং বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রযাত্রার এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

এম মহাসিন মিয়া

সাংবাদিক, লেখক ও আঞ্চলিক গবেষক, পার্বত্য চট্টগ্রাম