প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি লাঙল থেকে ল্যাপটপে
সাবিহা তারান্নুম মিম
প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
প্রাচীন বাংলার জীবিকার প্রধান উৎস ছিল কৃষি। তৎকালীন বাংলার কৃষি কেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা ছিল বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ। প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন ভৌত নিদর্শন ও সাহিত্যের কল্যাণের তাম্রপ্রস্তর যুগ থেকে প্রাচীনকালের সমৃদ্ধশালী কৃষির ইতিহাস উল্লেখ রয়েছে। তৎকালীন ইতিহাস থেকে উঠে আসে বাংলার নবান্ন উৎসবের পূর্বসূরী বিখ্যাত হল প্রসারণ দিন উদযাপিত প্রদীপ জ্বালিয়ে লাঙ্গল চালানো উৎসব। আবহমানকাল থেকে ধ্যান, জ্ঞান কর্মকাণ্ড সমগ্রই ছিল কৃষি কেন্দ্রিক। বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান ও নদনদীর বেষ্টনীর কল্যাণে আদিকাল থেকেই অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের একটি বৃহৎ অংশ নির্ভর করে কৃষি খাতে। বর্তমানে প্রযুক্তির সংস্পর্শে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির মুখশ্রী। ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ ও টেকসই উন্নয়নে স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থা গ্রামীণ অর্থনীতিতে রচনা করেছে তথ্যপ্রযুক্তির অবদানের এক নতুন ইতিহাস। একবিংশ শতাব্দীতে এসে একটি দেশের গ্রামীন অর্থনীতির পূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তনে প্রয়োজন কৃষিখাতে প্রযুক্তির পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ।
কৃষি গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কৃষির প্রতি এই নির্ভরশীলতা তাদের জীবন ও জীবিকার মূল ভিত্তি। তাই মাটি, পানি ও বনজ সম্পদের উপর নির্ভর করে গ্রামীন অর্থনীতি। আর এই সব সম্পদের সঠিক ব্যবহার উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করে তোলে। কৃষি পণ্যের চাহিদা পূরণ এবং বাণিজ্যিক কৃষির ধনাত্মক প্রবৃদ্ধির হারের ইতিবাচক পরিবর্তন বর্তমান কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে পূর্ণ সম্ভাবনাময় দ্বার খুলেছে। যা পারিবারিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যেখানে সুজলা সুফলা বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশ। সেখানে টেকসই গ্রামীন অর্থনীতি গঠনের জন্য প্রয়োজন কৃষি খাতের উৎপাদন ব্যবস্থায় স্মার্ট ডেটা চালিত ব্যবস্থাপনার প্রসার ঘটানো। এর সম্পূর্ণ কার্যকারিতা নিশ্চিতকরণের লক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন আরও জোরদারকরণ। পাশাপাশি স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি সহজলভ্য করা এবং স্বল্প ব্যয় বা বিনা খরচে কৃষকদের আইসিটি প্রশিক্ষণ প্রদানেও গুরুত্বারোপ।
যা কৃষি বাজার ব্যবস্থাকে সার্বিক আধুনিকীকরণ করতে সক্ষম হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কৃষি স্টার্টআপ ও এগ্রিটেক খাতে বিনিয়োগ এবং কৃষিশিক্ষা কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষক- দক্ষতা উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে প্রযুক্তি নির্ভর কৃষিখাতের জন্য স্মার্টকৃষি ব্যবস্থায় ডিজিটাল সেবার প্রসার উৎপাদনশীলতার গতি রূপান্তরে সক্ষম হবে। তবে সেক্ষেত্রে সার্বিক অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দক্ষতার ঘাটতি পূরণে প্রযুক্তিগত কৃষি ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ আবশ্যক। তবেই প্রযুক্তিগত ও মানবসম্পদের সমন্বিত উন্নয়ন গ্রামীণ অর্থনীতির ধারক কৃষি খাতে টেকসই উন্নয়ন অর্জনে পূর্ণ সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে।
অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, জমির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং কৃষি খাতে উৎপাদন ব্যবস্থায় বাজেট সুপরিকল্পিত ব্যবহারের ঘাটতি কৃষি খাতকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
আমাদের দেশের জলবায়ু পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে জলবায়ু সহনশীল কৃষি নীতি বাস্তবায়ন অপরিহার্য। কেননা উচ্চফলনশীল বীজ নিশ্চিত করবে উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি। ঋঅঙ এবং অন্যান্য সংস্থার পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ের প্রধান প্রধান ফসল উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় ৬২ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদন, ভুট্টা উৎপাদন রেকর্ড হারে বৃদ্ধি এবং সবজি ও ফল উৎপাদনে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থায় উৎপাদন খাতে যান্ত্রিকীকরণ ইতিবাচক পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার লক্ষে বাংলাদেশের গ্রামীন ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণে ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল কৃষি সেন্টার, কৃষি কল সেন্টার সংযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। যা আধুনিক বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত ও মধ্যসত্ত্বভোগকারী শ্রেণীর প্রভাব কাটাতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে Total Factor Productivity একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। TFP নির্দেশ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহারের ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিলেও দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলকভাবে তা ধীরগতি সম্পন্ন।
বাংলাদেশের কৃষি খাতে উৎপাদন ব্যবস্থা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল জলবায়ু পরিবর্তনে বিভিন্ন দুর্যোগের প্রভাব। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত প্রতিবছরের অলিখিত ভাগ্য। ফলে প্রয়োজন অভিযোজন কৌশল যা জলবায়ুর সহনশীল বীজসহ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, স্মার্ট সীমিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিজিটাল আবহাওয়া চার্ট প্রভৃতি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। অর্থাৎ কৃষকদের ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রদান, গ্রামীণ পর্যায়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং উচ্চমানের ডিজিটাল সেবা উৎপাদন খাতে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জনে সহায়তা করবে। কৃষকদের আয় বৃদ্ধি উৎপাদন খাতসহ স্থানীয় বাজার, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কুটির শিল্পের সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে গ্রামের অর্থনৈতিক প্রবাহ বৃদ্ধি করে। তাই প্রযুক্তির সহজলভ্যতা কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে দেশের সামগ্রিক সমন্বিত উন্নয়নে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। গ্রামের তৃণমূল পর্যায়ে কৃষকদের ব্যাংকিং সুবিধা প্রদানের প্রসার গুরুত্বপূর্ণ। যা এই যুগের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক আয় বৃদ্ধিতেও সহায়ক। ২০২৬ সালে কৃষি আধুনিকীকরণ ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষে নতুন প্রকল্প কৃষি কার্ড চালু হয়েছে। সরকার এতে ২৭.৫ মিলিয়ন কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করেছে ভর্তুকি প্রদানের পাশাপাশি সহজ ঋণ প্রদান এবং ডিজিটাল তথ্য সেবা প্রদানের উদ্দেশে। এই কৃষি কার্ড প্রকল্পের সর্বোচ্চ কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অনিয়ম প্রতিরোধে যথাযথ মনিটরিং। এছাড়াও আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষে উন্নত বীজ সংগ্রহ প্রকল্প, সহজলভ্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন বীজ উৎপাদনে আধুনিক গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়ন। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার কৃষির ঐতিহ্যগত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উৎপাদন সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া উন্নত করবে। কেননা বাংলাদেশের বাস্তবিক সংকট হলো শ্রম সংকট।
এই উদ্বেগজনক সংকট কাটানোর লক্ষে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। সে লক্ষে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অনলাইনে বিভিন্ন প্লাটফর্মের ব্যবহারের প্রসার এবং অ্যাপের সাহায্যে কৃষকদের পরামর্শ প্রদান সময়োপযোগী। বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় আধুনিকীকরণ এর আরেকটি দিক হলো আধুনিক গুদাম ব্যবস্থায় ফসল সংরক্ষণ এবং রোবোটিক কৃষি ব্যবস্থা বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার উৎপাদন ব্যবস্থায় উন্নয়নের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতির অগ্রগতির পথকে আরও সুগম করবে। ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলে ভবিষ্যতে দেশের স্থিতিশীল গ্রামীণ অর্থনীতি সমৃদ্ধশালী ও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই খাদ্য উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বাংলাদেশ প্রযুক্তি নির্ভর স্মার্ট কৃষি খাদ্য ব্যবস্থায় দেশের সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি বৈশ্বিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হয়ে উঠবে।
সাবিহা তারান্নুম মিম
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ, সমাজকর্ম বিভাগ
