বিকাশমান অর্থনীতির মূল ভিত্তি : আমাদের কৃষক ও কৃষি
ওসমান গনি
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের মানদণ্ড শুধু সুউচ্চ অট্টালিকা, বড় বড় মেগা প্রজেক্ট কিংবা ডিজিটাল বিপ্লবের গতি দিয়ে নিরূপণ করা সম্ভব নয়, বরং এর প্রকৃত ভিত্তি প্রোথিত থাকে মাটির গভীর স্তরে, যেখানে সাধারণ মানুষের অন্ন সংস্থানের নিশ্চয়তা তৈরি হয়। বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল এবং উন্নয়নশীল ভূখণ্ডের প্রেক্ষাপটে এই ধ্রুব সত্যটি ধ্রুপদী সাহিত্যের মতোই শাশ্বত। আমাদের জাতীয় অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন হলো কৃষি, আর এই হৃৎপিণ্ডকে সচল রাখার অক্লান্ত কারিগর হলেন এ দেশের রোদণ্ডবৃষ্টি জয়ী কৃষক। সভ্যতার আদিলগ্ন থেকে আজ অবধি কৃষিই মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে এবং আধুনিক বিশ্বের তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থাতেও এটি বাংলাদেশের জন্য একটি অবিনাশী স্তম্ভ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, গাঙ্গেয় বদ্বীপের উর্বর পলিমাটি এবং নাতিশীতোষ্ণ ঋতুচক্র এ দেশকে প্রাকৃতিকভাবেই একটি কৃষিপ্রধান জনপদে রূপান্তরিত করেছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সাড়ে পাঁচ দশকে আমাদের জাতীয় আয়ে কৃষির আনুপাতিক হার শিল্প বা সেবা খাতের তুলনায় কিছুটা পরিবর্তিত মনে হলেও, এর গুরুত্ব এক চুলও কমেনি। বরং দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষায় এর কোনো বিকল্প আজও তৈরি হয়নি।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মানচিত্রের দিকে নিবিড়ভাবে তাকালে দেখা যায় যে, ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও নগরায়নের ঢেউ সত্ত্বেও কৃষি খাত এখনও কর্মসংস্থানের একক বৃহত্তম উৎস হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। দেশের প্রায় অর্ধেক শ্রমশক্তি সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। এই বিশাল জনবল শুধু তাদের পারিবারিক জীবিকা নির্বাহের জন্য মাঠে নামে না, বরং তারা ১৬ কোটিরও বেশি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যখন খাদ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল সমীকরণে খাদ্য আমদানিতে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তখন এই প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদিত ফসলই আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন শুধু একটি অর্থনৈতিক লক্ষ্য নয়, এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদার প্রতীক। কৃষক যদি কোনো কারণে মাঠের কাজে নিরুৎসাহিত হয় কিংবা চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে পুরো অর্থনৈতিক অবকাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই একটি বিকাশমান ও টেকসই অর্থনীতি বিনির্মাণে কৃষিকে মূলধারার পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই।
বর্তমান সময়ের পরিবর্তিত বিশ্বে কৃষিতে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে এবং এই বিবর্তন অপরিহার্য ছিল। আগেকার সেই মান্ধাতা আমলের লাঙল-জোয়াল আর বলদের সাহায্যে চাষাবাদ আজ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিচ্ছে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর এবং আধুনিক হারভেস্টর মেশিন। সেচ ব্যবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন, গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে এখন শুষ্ক মৌসুমেও ধু ধু বালুচরে সোনার ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে। উচ্চফলনশীল জাতের বীজ, জৈব ও রাসায়নিক সারের সুষম ব্যবহার এবং কীটনাশকের সঠিক প্রয়োগ উৎপাদনকে কয়েক দশকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে এই আধুনিকায়নের একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা মেটাতে গিয়ে অনেক সময় প্রান্তিক কৃষক মহাজনি ঋণ বা চড়া সুদের ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে। আমাদের দেশের কৃষকরা জন্মগতভাবেই অত্যন্ত সহনশীল এবং অসম্ভব উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী। তারা সীমিত সম্পদ আর প্রতিকূলতাকে জয় করে যেভাবে একের পর এক ধান, গম, সবজি ও ফলের বাম্পার ফলন উপহার দিচ্ছে, তা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের কাছেও বিস্ময়কর। শস্য উৎপাদনের পাশাপাশি মৎস্য চাষ, হাঁস-মুরগি পালন এবং ডেইরি ফার্মিংয়ের ব্যাপক প্রসার গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহকে সচল রেখেছে, যার প্রত্যক্ষ সুফল ভোগ করছে শহরের ভোক্তা সাধারণও।
তবে সফলতার এই উজ্জ্বল চিত্রের আড়ালে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির হাহাকার এক দীর্ঘস্থায়ী দীর্ঘশ্বাস হয়ে বিরাজ করছে।
প্রতি বছর যখন মাঠভরা ফসলের ঘ্রাণে কৃষকের ঘর ভরে ওঠার কথা, তখন দেখা যায় বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়াদের কারসাজিতে কৃষক তার হাড়ভাঙা খাটুনির প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ভোক্তা যখন চড়া দামে চাল কিংবা সবজি কিনছে, তখন কৃষকের পকেটে যাচ্ছে তার অতি সামান্য অংশ, যা অনেক সময় উৎপাদন খরচও তুলতে পারে না। এই কাঠামোগত বৈষম্য দূর করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করবে। কোনো পেশা যদি সম্মান এবং অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেখানে মেধাবী জনশক্তির অভাব দেখা দেয়। কৃষিকে একটি লাভজনক ও আধুনিক শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বাজার ব্যবস্থাপনায় সরাসরি কৃষকের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য ক্রয়ের সরকারি প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল, হয়রানিমুক্ত এবং স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে কোনো সিন্ডিকেট সাধারণ কৃষকের ঘাম জড়ানো আয়ের ভাগ বসাতে না পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের যে বৈশ্বিক হুমকি আজ মানবসভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, তার অগ্রভাগে থেকে লড়ছে আমাদের কৃষি খাত। অসময়ে বৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, মরুকরণ কিংবা লোনা পানির অনুপ্রবেশ আমাদের চিরচেনা ফসলি জমিগুলোকে গ্রাস করছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় চাষাবাদ কঠিন হয়ে পড়েছে। আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীরা নিরলসভাবে লবণাক্ততাণ্ডসহিষ্ণু বা খরা-সহিষ্ণু জাতের বীজ উদ্ভাবন করে চলেছেন, যা প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু শুধু গবেষণাগারে সাফল্য পেলেই চলবে না, সেই উদ্ভাবনকে কৃষকের হাতের নাগালে পৌঁছে দিতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হবে মাঠ পর্যায়ে কৃষকের পাশে দাঁড়িয়ে আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সাথে কৃষকের হাজার বছরের অর্জিত অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটানো। ডিজিটাল তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে স্মার্টফোন বা কৃষি অ্যাপের মাধ্যমে পোকা দমন, সারের পরিমাণ নির্ধারণ কিংবা আবহাওয়ার পূর্বাভাস কৃষকের কাছে দ্রুত পৌঁছে দিতে পারলে উৎপাদন ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
বাংলাদেশের শিল্পায়নের ভিত্তিও কিন্তু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর দণ্ডায়মান। আমাদের পাটশিল্প, বস্ত্রশিল্প, চিনিকল কিংবা চা বাগান, সবই কৃষিভিত্তিক কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান বিশ্বে ‘ভ্যালু অ্যাডেড’ পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। আমরা যদি মাঠ থেকে উৎপাদিত কাঁচা সবজি বা ফল সরাসরি রপ্তানি না করে সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে উন্নত মানের ক্যানিং বা প্যাকেটজাত খাবারে রূপান্তর করতে পারি, তবে রপ্তানি আয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এই ‘অ্যাগ্রো-প্রসেসিং’ শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে গ্রামীণ অঞ্চলে হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা শহরমুখী অভিবাসনের চাপ কমাবে। বিকাশমান অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে হলে শিল্প ও কৃষির মধ্যে একটি সুসংহত সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে, যেখানে কৃষকের পণ্য সরাসরি কারখানার কাঁচামাল হিসেবে ন্যায্যমূল্যে গণ্য হবে।
দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে কৃষকের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। যারা আমাদের ক্ষুধার অন্ন জোগায়, যারা সভ্যতার চাকা সচল রাখে, তাদের ‘চাষা’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। কৃষকের সন্তান যাতে উন্নত শিক্ষা পায়, কৃষক পরিবার যাতে সুচিকিৎসা পায় এবং বৃদ্ধ বয়সে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় থাকে, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত। ক্রমবর্ধমান আবাসন প্রকল্পের নামে তিন ফসলি জমি নষ্ট করার যে আত্মঘাতী প্রবণতা শুরু হয়েছে, তা কঠোর আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, জনসংখ্যা বাড়ছে; কিন্তু আবাদি জমির পরিমাণ সীমিত। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের চাহিদা মেটাতে হলে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং উলম্ব কৃষি বা আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে।
পরিশেষে এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো মাটি এবং সেই মাটির সঙ্গে মিশে থাকা মানুষগুলো। কৃষকের মুখে হাসি না থাকলে দেশের উন্নয়ন কখনোই টেকসই হবে না। একটি সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন এবং স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে কৃষিবান্ধব টেকসই বিনিয়োগ ও নীতিমালার কোনো বিকল্প নেই। কৃষকের ঘামেই সিক্ত হয়ে উর্বর হোক আমাদের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ। আমরা যদি তাদের শ্রমের মর্যাদা দিতে পারি এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও সহজ শর্তে পুঁজির জোগান নিশ্চিত করতে পারি, তবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে কেবল একটি জনবহুল দেশ হিসেবে নয়, বরং একটি শক্তিশালী কৃষিশিল্প সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। কৃষকের উন্নয়নই হোক আমাদের জাতীয় উন্নয়নের মূলমন্ত্র।
ওসমান গনি
লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
