ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শিক্ষক রাজনীতি ও আমাদের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ

খন্দকার রামীম হাসান পায়েল
শিক্ষক রাজনীতি ও আমাদের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক সচেতনতা অর্জন ও তার চর্চা করা প্রত্যেকের মৌলিক অধিকার। তবে বিপত্তি ঘটে ঠিক তখনই, যখন এই অধিকারের আড়ালে প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে অন্যের অধিকারকে খর্ব করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণ হলো জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মুক্ত ও গঠনমূলক চিন্তার বিকাশ ঘটানো এবং গবেষণার পথকে প্রসারিত করা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে আমাদের শিক্ষাঙ্গনে জ্ঞানচর্চার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সমীকরণ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক রাজনীতি ক্রমশ একটি কাঠামোগত সংকটে রূপ নিচ্ছে। শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় যুক্ত থেকে অনেকেই যখন জ্ঞান বিতরণের চেয়ে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক পদমর্যাদা লাভকে বেশি গুরুত্ব দেন, তখন তা শিক্ষার মূল উদ্দেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। শ্রেণিকক্ষে ও গবেষণাগারে সময় দেওয়ার চেয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সমীকরণে শিক্ষকদের এই ব্যস্ততা তাদের অ্যাকাডেমিক লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যকার চিরায়ত পরম শ্রদ্ধার জায়গাটি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি শিক্ষাঙ্গনের সার্বিক পরিবেশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সবার দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাজনৈতিক মতবাদ ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। একজন শিক্ষকের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন বা সমর্থন থাকতেই পারে। তবে এই অধিকারের চর্চা যখন ক্যাম্পাসের অ্যাকাডেমিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক বলয়ে যুক্ত হতে বাধ্য করে, তখন তা আমাদের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ তৈরি করে। শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতার দরুন ক্লাস-পরীক্ষায় বিঘ্ন ঘটে ও সেশনজটের আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে চাকরির ক্ষেত্রে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় হাজারো প্রার্থীকে। পাশাপাশি যেসব শিক্ষক প্রকৃত অর্থে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ায় অগ্রগামী, তাদেরকেও হতে হয় নানামুখী বঞ্চনা ও অবমূল্যায়নের শিকার। শিক্ষক রাজনীতির এই নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ায়। মেধা, যোগ্যতা ও গবেষণার চেয়ে যখন নির্দিষ্ট মতাদর্শ বা লবিং নিয়োগের প্রধান মাপকাঠি হয়ে ওঠে, তখন তা বাংলাদেশ সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘সরকারি নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতা’ নীতির সুস্পষ্ট পরিপন্থি হয়ে দাঁড়ায়। পদণ্ডপদবি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পাওয়ার এই অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতায় প্রকৃত গবেষক ও যোগ্য প্রার্থীরা বারবার পিছিয়ে পড়েন। ফলশ্রুতিতে মেধার অবমূল্যায়ন ঘটে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি অ্যাকাডেমিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। শিক্ষকরা হলেন সমাজের বিবেক। ছাত্ররা যখন দেখে তাদের শিক্ষকেরাই দুর্নীতি ও অনৈতিক লবিংয়ের সঙ্গে যুক্ত, তখন তাদের নিজেদের নৈতিক ভিত্তিও নষ্ট হয়; সমাজ পতিত হয় এক গভীর মূল্যবোধের সংকটে। তাছাড়া যেসব শিক্ষক দুর্নীতির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার ‘গ্রিন কার্ড’ পান, তাদের দুর্নীতি করার ঝোঁক অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। ক্ষমতার আসনে বসে তাদের মনে স্বভাবতই দুর্নীতির বীজ বড় হয়ে বটগাছে পরিণত হয়। প্রশাসনিক সুবিধা, ভিসি, প্রোভিসি, ডিন বা প্রভোস্ট হওয়ার তাড়নায় তারা অসাধু পন্থা অবলম্বনে পিছপা হন না। দলীয় তোষণনীতির কারণে এভাবেই প্রকৃত গবেষক ও যোগ্য শিক্ষকরা অবমূল্যায়িত হয়ে সাইডলাইনে পড়ে থাকেন। দিনশেষে এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও কাঠামোগত উন্নয়নের ওপর। প্রশাসনিক সমীকরণ মেলাতে গিয়ে ক্লাসরুমের আধুনিকায়ন, ল্যাবরেটরির সরঞ্জাম বৃদ্ধি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ডিজিটালাইজেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আড়ালে চলে যাচ্ছে। নানা অজুহাতে সময়সীমা বৃদ্ধির মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর প্রতি তীব্র দায়িত্বহীনতা এবং দুর্নীতির চিত্র এখন সাধারণ ব্যাপারে রূপ নিয়েছে। শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার রক্ষার্থে আন্দোলনে নামলে রাজনৈতিক ট্যাগিং থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বিভক্তি সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখার প্রবণতাও কম দেখা যায় না। পাশাপাশি ইউজিসির (টএঈ) বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণায় অপর্যাপ্ত বরাদ্দের যে চিত্র উঠে আসে, তা মূলত অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষ সাধনের প্রতি এই কাঠামোগত অনীহারই প্রতিফলন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বরাদ্দকৃত বাজেটের টাকা অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়, অথচ পর্যাপ্ত শিক্ষক বা ল্যাব সরঞ্জাম থাকে না। সংবিধান অনুযায়ী রাজনীতি করার অধিকার সবার আছে, কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিজেদের রাজনৈতিক ঢাল, লাঠিয়াল বা মিছিলে লোক বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চরম অনৈতিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠনগুলোর মূলমন্ত্র যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় করা, সেখানে এই নীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের শিক্ষকদের রাজনৈতিক প্যানেলের লেজুড়বৃত্তি করতে দেখা যায়। শিক্ষকদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ছাত্রনেতারা যেন অনুঘটক হিসেবে কাজ করেন। ফলশ্রুতিতে শিক্ষার্থীদের এক বিরাট অংশ শিক্ষকদের রাজনৈতিক মত বা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধাচরণ করতে ভয় পায়। কারণ তাদের মনে এই ভীতি কাজ করে যে, বিরুদ্ধে গেলে ভাইভাতে বা পরীক্ষার খাতায় নম্বর কম দেওয়া হবে বা ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়া হবে। এই অদৃশ্য ভীতি শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতাকে আক্ষরিক অর্থেই গলা টিপে মারে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, শিক্ষক রাজনীতি এবং ক্যাম্পাসের এই নোংরা পরিবেশের কারণে দেশের সেরা মেধাবী শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। তারা দেশে ফিরে শিক্ষকতা পেশায় আসতে চাইছে না, যার চড়া খেসারত দিচ্ছে পুরো জাতি। অথচ বহির্বিশ্বের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র চোখে পড়ে। সেখানে শিক্ষকদের মূল্যায়ন হয় তাদের গবেষণাপত্র, উদ্ভাবন ও শিক্ষাদান পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে। আর আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই মূল্যায়নের অলিখিত মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক সক্রিয়তা। এই বৈপরীত্য আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে বৈশ্বিক মানদণ্ড থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে দিচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়কে এই কাঠামোগত সংকট থেকে বের করে আনতে হলে শিক্ষাঙ্গনকে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। পিএসসির আদলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন কমিশন গঠন করা এখন সময়ের দাবি। শুধু চাকরির বয়সের ওপর নির্ভর করে প্রমোশন না দিয়ে, আন্তর্জাতিক জার্নালে মানসম্মত গবেষণাকে পদোন্নতির মূল শর্ত হিসেবে বাধ্যতামূলক করতে হবে; এতে শিক্ষকেরা রাজনৈতিক লবিংয়ের বদলে গবেষণায় বেশি মনোযোগ দিতে বাধ্য হবেন। ডিন, প্রভোস্ট বা সিন্ডিকেট সদস্য হওয়ার জন্য শিক্ষকদের যে ভোটের রাজনীতি বা প্যানেলভিত্তিক নির্বাচন হয়, তা সম্পূর্ণ বাতিল করে জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব দেওয়ার নিয়ম চালু করতে হবে। পাশাপাশি ইউজিসির তদন্ত ও নজরদারির স্বার্থে কাঠামোগত পরিবর্তন এবং ডিজিটালাইজেশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য। শিক্ষকদের মূল পরিচয় হোক তাদের অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষ ও গবেষণায়; প্রাতিষ্ঠানিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চায় নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় জ্ঞান চর্চার আদর্শ ও নিরাপদ আঙিনায় পরিণত হোক- এটাই আজকের সাধারণ শিক্ষার্থী ও সচেতন সমাজের প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত