নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন ও আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা

আমানুর রহমান

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতি গঠনের পবিত্র স্থান। কিন্তু গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে দেশের আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থী নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার ঘটনা চরম আকার ধারণ করেছে। সবচেয়ে নিরাপদ স্থানটিতেই শিশুরা শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হচ্ছে, যা আমাদের চরম নৈতিক ব্যর্থতার প্রমাণ। এই অন্ধকার থেকে উত্তরণে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, আইনি কঠোরতা এবং পারিবারিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা আজ সময়ের দাবি। নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও কঠোর নজরদারি অপরিহার্য। প্রতিটি আবাসিক প্রতিষ্ঠানে শক্তিশালী তদারকি কমিটি, নির্জন স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের সার্বিক কার্যক্রম নজরদারিতে রাখলে অপরাধপ্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি, শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ভয়হীন ‘অভিযোগ বাক্স’ (কমপ্লেইন বক্স) রাখা এবং ১০৯ বা ৯৯৯-এর মতো জাতীয় হেল্পলাইন সম্পর্কে তাদের সচেতন করা জরুরি, যাতে তারা বিপদে স্বাধীনভাবে সহায়তা চাইতে পারে।

নিপীড়ন প্রতিরোধে শিশুদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের সমাজে এসব বিষয়ে আলোচনা ‘ট্যাবু’ হলেও, এর সুযোগ নেয় বিকৃত মানসিকতার অপরাধীরা। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি শিশুদের ‘নিরাপদ স্পর্শ’ এবং ‘অনিরাপদ স্পর্শ’ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। অস্বস্তিকর কোনো আচরণের শিকার হলে তা যেন তারা তৎক্ষণাৎ অভিভাবক বা বিশ্বস্ত কাউকে জানায়, সেই আত্মবিশ্বাস ও সাহস তাদের মধ্যে গড়ে তোলা অপরিহার্য।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের সমাজে অনেক সময় ভুক্তভোগী শিশুর ওপরই দোষ চাপানো হয় বা সামাজিক সম্মানের ভয়ে পরিবার ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়। এই নীরবতা অপরাধীকে আরও বেপরোয়া করে তোলে। নির্যাতনের শিকার শিশুর কোনো দোষ নেই- এটি প্রতিষ্ঠা করে তাকে পর্যাপ্ত মানসিক সমর্থন ও চিকিৎসা প্রদান করা জরুরি। এসব জঘন্য অপরাধে কোনো স্থানীয় ‘সালিশ’ নয়, বরং সরাসরি প্রচলিত আইনে মামলা করতে হবে। রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে দ্রুততম সময়ে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি পরিবর্তনে তৃণমূল পর্যায়ে অভিভাবকদের সচেতনতা সবচেয়ে বড় অনুঘটক। শুধু ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করেই দায়িত্ব শেষ নয়; সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করা অত্যন্ত জরুরি। সন্তান যদি প্রতিষ্ঠানে যেতে অনীহা প্রকাশ করে, তবে তা এড়িয়ে না গিয়ে গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। অভিভাবকরা সচেতন ও সোচ্চার হলে অপরাধীরা যেমন ভয় পাবে, তেমনি প্রশাসনও সঠিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আইনি বিষয় নয়, এটি একটি জাতির নৈতিক অস্তিত্ব রক্ষারও পরীক্ষা। আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ভয়ের সংস্কৃতি দূর করে আস্থার পরিবেশ ফেরাতে রাষ্ট্রের কঠোর আইন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও পরিবারের অতন্দ্র প্রহরা অপরিহার্য। শৈশবের পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের সামগ্রিক সামাজিক দায়বদ্ধতা। শিশুরা যখন ভয়হীন পরিবেশে শিক্ষার আলোয় বিকশিত হতে পারবে, তখনই আমাদের জাতীয় উন্নয়ন সার্থক হবে এবং একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রজন্ম গড়ে উঠবে।

আমানুর রহমান

শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ