শুধু জ্বালানি নয় : বড় সংকট হতে পারে পানি
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান বিশ্বে উন্নয়ন ও অগ্রগতির আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় জ্বালানি নিরাপত্তা। তেলের দাম বাড়লে বা বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মুহূর্তেই অস্থিরতা তৈরি হয়। কিন্তু আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি, জ্বালানির চেয়েও বড় এবং অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে অনিবার্য সংকট আমাদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে? সেই সংকটটি হলো পানি সংকট। পানি ছাড়া প্রাণের অস্তিত্ব যেমন কল্পনা করা যায় না, তেমনি পানির অভাব হলে থমকে যাবে কৃষি, শিল্প এবং জনস্বাস্থ্য। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সংকটের চেয়েও পানি সংকটকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখার সময় এসেছে।
পৃথিবীর তিন-চতুর্থাংশ জল হলেও ব্যবহারের যোগ্য স্বাদু পানির পরিমাণ মাত্র ৩ শতাংশেরও কম। এই নগণ্য পরিমাণ পানির একটি বড় অংশ আবার হিমবাহে আটকা পড়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সেই হিমবাহগুলো গলছে ঠিকই, কিন্তু তা মিশে যাচ্ছে সমুদ্রের নোনা জলে। ফলে মানুষের ব্যবহারযোগ্য পানির উৎস ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ তীব্র পানি সংকটের মুখে পড়বে। জ্বালানির বিকল্প হিসেবে সৌরশক্তি বা বায়ুশক্তি ব্যবহার করা সম্ভব; কিন্তু পানির কোনো বিকল্প আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি।
কৃষিকাজ সম্পূর্ণভাবে পানির ওপর নির্ভরশীল। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ কাজ ব্যাহত হচ্ছে। পানি না থাকলে ফসল ফলবে না, আর খাদ্যসংকটে পড়বে কোটি কোটি মানুষ। পাশাকশিল্প থেকে শুরু করে ভারি শিল্প- সবখানেই পানির বিপুল ব্যবহার রয়েছে। পানির অভাব মানেই উৎপাদন বন্ধ হওয়া এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়। জ্বালানি নিয়ে যেমন যুদ্ধ হয়, তেমনি অদূর ভবিষ্যতে পানি নিয়ে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সংঘাত বা ‘পানি যুদ্ধ’ হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে অভিন্ন নদ-নদীর পানি বণ্টন নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। সুপেয় পানির অভাবে পানিবাহিত রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। স্যানিটেশন ব্যবস্থার বিপর্যয় জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে।
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ হওয়া সত্ত্বেও এখানে পানিসংকট প্রকট হচ্ছে। একদিকে উজানে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ নদ-নদীগুলো দখল ও দূষণে মৃতপ্রায়। রাজধানী ঢাকা-সহ বড় শহরগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর কয়েক ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। বর্ষাকালে বন্যায় দেশ ভাসলেও শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় তীব্র পানির হাহাকার। এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেখানে সুপেয় পানির সংকট এখন নিত্যদিনের চিত্র।
এই আসন্ন মহাবিপদ থেকে বাঁচতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা- সর্বত্র পানির মিতব্যয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা ব্যবহারের প্রযুক্তি (Rainwater Harvesting) জনপ্রিয় করতে হবে। দেশের নদ-নদীগুলো খনন করে পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং দূষণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। অভিন্ন নদ-নদীর ন্যায্য হিস্যা আদায়ে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন। সমুদ্রের নোনা পানিকে সুপেয় পানিতে রূপান্তর করার মতো উন্নত প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। জ্বালানি সংকট হয়তো কৃচ্ছ্রসাধন বা নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে সামাল দেওয়া সম্ভব; কিন্তু পানির অভাব হলে জীবনই থেমে যাবে। আমরা উন্নয়ন চাই, কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংস করে অর্জিত হয়, তবে তা টেকসই হবে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে হলে এখনই পানি ব্যবস্থাপনায় বিপ্লব ঘটাতে হবে। মনে রাখতে হবে, পানির অপর নাম জীবন- আর এই জীবনের সুরক্ষাই হওয়া উচিত আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।
