কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এবং কান্তকবি রজনীকান্ত : এক অনন্য যোগসূত্র

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল

প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘ভালোবাসেন জানি, তাই এত কথা বললাম। কিছু মনে করবেন না।’ হাসপাতালের বিছানায় রোগশয্যাশায়ী কান্তকবি রজনীকান্ত সেন উপস্থিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রশ্নের জবাবে এই উত্তর লিখে দিয়েছিলেন। সেই প্রসঙ্গে প্রবেশের পূর্বে বাংলা সাহিত্যের এই দুই অমর সাহিত্যিক সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া আবশ্যক। বাংলা সাহিত্যের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কান্তকবি রজনীকান্ত সেন- পঞ্চকবির পাঁচটি আসনের দুটি আসন অলংকৃত করে রয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক রচিত মোট গানের সংখ্যা ২২৩২। তার গানের কথায় উপনিষদ, সংস্কৃত সাহিত্য, বৈষ্ণব সাহিত্য ও বাউল দর্শন গভীরভাবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে রজনীকান্ত সেনের রচিত গানের সংখ্যা ২৯০। তার গানগুলি মূলত দেশাত্মবোধক, ভক্তিমূলক ও হাস্যরসাত্মক। বঙ্গভূমির এই দুই অমর পুরুষ বাংলা সাহিত্যকে করেছেন রসে ও ভাবনায় সমৃদ্ধ। রজনীকান্ত সেনের জন্ম ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জুলাই এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ মে। সেই হিসেবে রজনীকান্ত সেন রবীন্দ্রনাথের চেয়ে চার বছরের ছোট, অর্থাৎ তিনি রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক। পঞ্চকবির আরেকজন কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়েরও তিনি সমসাময়িক ছিলেন।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি কান্তকবির ছিল অসীম শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসা। কান্তকবির তৃতীয় প্রকাশিত গ্রন্থ ‘অমৃত’। এই গ্রন্থটি তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘কণিকা’র আদর্শে রচনা করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে হাসপাতালে দেখতে আসা রবীন্দ্রনাথকে কবি বলেছিলেন : ‘আর ‘কণিকা’র আদর্শে ‘অমৃত’ লিখেছি। লিখে ধন্য হয়েছি—ঐ আদর্শে লিখে ধন্য হয়েছি।’

উল্লেখ্য, তখন রজনীকান্ত বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। রাজশাহীর থিয়েটারে রজনীকান্ত একবার রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা ও রাণী’ নাটকে রাজার ভূমিকায় দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেন। হাসপাতালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কবির শেষ সাক্ষাতের সময় এই প্রসঙ্গটিরও অবতারণা করেন কান্তকবি। রজনীকান্ত সেনের মেয়ে শান্তিলতা রায়ের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, কলকাতার হিন্দু হোস্টেলে থাকাকালীন সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে রজনীকান্ত সেনের ঘনিষ্ঠ সখ্যতা তৈরি হয় এবং তার সঙ্গে হৃদ্যতা রজনীকান্তের শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ছিল। সেই সূত্রে তিনি প্রায়ই জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে যেতেন। রজনীকান্ত সেনের পিতা গুরুপ্রসাদ সেনের লেখা ‘পদচিন্তা মণিমালা’ গ্রন্থটি একবার রজনীকান্ত রবীন্দ্রনাথকে দেখিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থটি পড়ে ভূয়সী প্রশংসা করেন।

কান্তকবির জীবনীকার পণ্ডিত নলিনীরঞ্জন রচিত ‘কান্তকবি রজনীকান্ত’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৩১৫ বঙ্গাব্দের ২১ অগ্রহায়ণ, রবিবার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের নবগৃহ প্রবেশোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রজনীকান্ত সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞাপন দেখে সেই সাহিত্য মন্দিরের মহতী সভায় যোগদানের জন্য কলকাতায় আসেন। ২০ অগ্রহায়ণ কলকাতায় পৌঁছে তিনি রায়সাহেব শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেনের আতিথ্য গ্রহণ করেন। পরদিন ২১ অগ্রহায়ণ, রবিবার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের নবগৃহপ্রবেশের দিন বাঙালির সারস্বত সাধনার শাশ্বতী প্রতিষ্ঠার মঙ্গলবাসর। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের নবনির্মিত গৃহে সেদিন দেশ-বিদেশ থেকে আগত অতিথিদের সমাগমে লোকে লোকারণ্য ছিল। অত্যধিক লোকসমাগমে দোতলা ও একতলায় দুটি পৃথক সভা করা হয়েছিল। একতলায় অনুষ্ঠিত সভার সভাপতিত্বে ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

রজনীকান্ত বিপুল জনতার ভিড় ভেদ করে দোতলায় উঠতে না পেরে একতলার সভাতেই যোগ দেন। এবং সেখানেই ঘটে রবীন্দ্র-কান্তের অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎ। কবিগুরু কান্তকবির পরিচয় পেয়ে উপস্থিত সকল সাহিত্যঅনুরাগীর সঙ্গে রজনীকান্তের পরিচয় করিয়ে দেন। কবিগুরু রজনীকান্তকে গান গাইতে অনুরোধ করেন। কবিগুরুর অনুরোধে রজনীকান্ত স্বরচিত দুটি গান গেয়ে সভায় উপস্থিত সকলকে মুগ্ধ করে দেন। মুগ্ধ হন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। ‘সৃষ্টির বিশালতা’ এবং ‘সৃষ্টির সূক্ষ্মতা’ শীর্ষক দুটি গান রজনীকান্ত সেদিন পরিবেশন করেন। গান দুটি রজনীকান্তের ‘অভয়া’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। সেই সাক্ষাতেই রজনীকান্ত রবীন্দ্রনাথের আপন হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথ তাকে তার বাড়িতে আসার আমন্ত্রণ জানান। পরদিন ২২ অগ্রহায়ণ, সোমবার সকালে দীনেশচন্দ্র সেনকে নিয়ে রজনীকান্ত কবিগুরুর গৃহে উপস্থিত হন। সেদিনও রজনীকান্তের কণ্ঠে কবিগুরু পূর্বোক্ত গান দুটি শোনেন। রজনীকান্তের এই ঘটনার স্মৃতিচারণ পাওয়া যায় তাঁর হাসপাতালে লিখিত ডায়েরিতে।

কান্তকবি লিখছেন : ‘এই গান শুনে রবি ঠাকুর আমাকে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেন। আমি দীনেশকে সঙ্গে করে রবি ঠাকুরের বাড়ি পরদিন যাই। সেখানে তিনি আবার ঐ গান শোনেন, শুনে বলেন যে, বহির্জগৎ সম্বন্ধে বেশ হয়েছে, অন্তর্জগৎ সম্বন্ধে আর একটি করুন।’ ১৩১৬ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে রজনীকান্তের গলায় ক্যান্সার রোগের সূত্রপাত হয়। অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ হতে থাকে। অস্ত্রোপচার করেও তেমন লাভ হয়নি। ক্রমে তিনি বাকশক্তি হারান। কবির স্বজনরা তাকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কটেজের একটি কক্ষে (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯১০, শনিবার) রাখেন। সেখানেই তার জীবনের অন্তিম দিনগুলি অতিবাহিত হয়। এই সময় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে দেখতে আসেন। রজনীকান্ত রোগাক্রান্ত শরীর নিয়ে হেঁটে গিয়ে কবিকে অভ্যর্থনা জানান এবং এটিই ছিল কবিগুরুর সাথে কান্তকবির শেষ সাক্ষাৎ। তারিখটি ছিল ১৩১৭ বঙ্গাব্দের ১৮ জ্যৈষ্ঠ। সেদিন রবীন্দ্রনাথের সব প্রশ্নের উত্তর রজনীকান্ত লিখে জানিয়েছিলেন।

অশ্রুসজল চোখে তিনি লিখেন : ‘আজ আমার যাত্রা সফল হইল! তোমারি চরণ স্মরণ করিয়া, তোমারই ‘কণিকা’র আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া অমৃতের সন্ধানে ছুটিয়াছি। আশীর্বাদ করুন, যেন আমার যাত্রা সফল হয়।’ সেদিন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অমৃতপথযাত্রী রজনীকান্তের দীর্ঘক্ষণ আলাপ হয়।

কান্তকবি রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করে লিখেন : ‘আর একবার যদি দয়াল কণ্ঠ দিত। তবে আপনার ‘রাজা ও রাণী’ আপনার কাছে একবার অভিনয় করে দেখাতাম। আমি রাজার অভিনয় করেছি। এমন কাব্য, অমন নাটক কোথায় পাব?’

রজনীকান্ত তার ‘অমৃত’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি কবিগুরুর শ্রীচরণে অর্পণ করে বিনীতভাবে লিখেন : ‘অমৃতের ছোট কবিতাগুলি কি পড়েছিলেন? আমার এই পীড়ার মধ্যে লেখা, কত অপরাধ হয়েছে। আপনার চরণে দিতে আমার হাত কাঁপে।’

সেদিন কাস্তকবির জ্যেষ্ঠা কন্যা শান্তিবালা রায় ও পুত্র ক্ষিতীন্দ্রনাথ সেন তাদের পিতা রজনীকান্ত সেনের রচিত নিম্নলিখিত গান গেয়ে রবীন্দ্রনাথকে শোনান। রজনীকান্ত নিজে এই গানের সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজান। ‘বেলা যে ফুরায়ে যায়, খেলা কি ভাঙে না হায়, অবোধ জীবন-পথ-যাত্রি।’ গানটি রজনীকান্তের ‘অভয়া’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। রবীন্দ্রনাথ রজনীকান্তের এক পুত্রকে বোলপুর ব্রহ্মবিদ্যালয়ে রাখার ইচ্ছা জানিয়েছিলেন। কোনো এক কারণে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

হাসপাতাল থেকে কবিগুরুর প্রস্থানের পর কবিকে উদ্দেশ্য করে রজনীকান্ত তার ডায়েরিতে লিখেন : ‘আজ রবি ঠাকুর আমাকে বড় অনুগ্রহ করে গেছেন। আমাকে তিনি বললেন, ‘আপনাকে পূজা করতে ইচ্ছা করে।’- শুনে আমি লজ্জায় মরি।’ ১৫ আষাঢ়, ১৩১৭ (২৯.০৬.১৯১০) রজনীকান্ত কবিগুরুর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটি পত্র লিখেন। সেই সঙ্গে ১ আষাঢ় রাতে রচিত একটি গানও পাঠান।

উক্ত পত্রে কবিগুরুকে উদ্দেশ্য করে রজনীকান্ত লিখেন : ‘যেদিন চরণধূলায় এই কুটির পবিত্র করিয়াছিলেন, সেইদিন হইতে তিল তিল করিয়া যেন ব্যাধির উপশম হইতেছে। এই উন্নতি স্থায়ী হয় না। কতবার মরিলাম, কতবার বাঁচিলাম, -এইরূপেই দিন যাইতেছে। আমি ঠিক বুঝিয়াছি, ভগবৎকৃপা ভিন্ন এই দেহরক্ষায় কোনো উপায় বা সম্ভাবনা নেই। আর একবার দেখিতে ইচ্ছা করে কিন্তু সাধুসন্দর্শন তো সর্বদা হয় না।’

সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন সদ্যরচিত, ‘এই মুক্ত প্রাণের দৃপ্ত বাসনা তৃপ্ত করিবে কে’ গানটি।

রবীন্দ্রনাথ পরের দিন-ই অর্থাৎ ১৬ আষাঢ় পত্রের উত্তর দিয়েছিলেন। পত্রের উত্তরে কবিগুরু লিখেন- ‘সেদিন আপনার রোগ-শয্যার পাশ্বে বসিয়া মানবাত্মার একটি জ্যোতির্ম্ময় প্রকাশ দেখিয়া আসিয়াছি। শরীর তাহাকে আপনার সমস্ত অস্থিমাংস, স্নায়ু-পেশি দিয়া চারিদিকে বেষ্টন করিয়া ধরিয়াও কোনোমতে বন্দি করিতে পারিতেছে না, ইহাই আমি প্রত্যক্ষ দেখিতে পাইলাম।... শরীর হার মানিয়াছে কিন্তু চিত্তকে পরাভূত করিতে পারেনি- কণ্ঠ বিদীর্ণ হইয়াছে; কিন্তু সঙ্গীতকে নিবৃত্ত করিতে পারে নাই- পৃথিবীর সমস্ত আরাম ও আশা ধূলিসাৎ হইয়াছে, কিন্তু ভূমার প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাসকে স্নান করিতে পারে নাই। মানুষের আত্মার সত্যপ্রতিষ্ঠা যে কোথায়, তাহা যে অস্থিমাংস ও ক্ষুধাতৃষ্ণার মধ্যে নহে, তাহা সেদিন সুস্পষ্ট উপলব্ধি করিয়া আমি ধন্য হইয়াছি।

সছিদ্র বাঁশির ভিতর হইতে পরিপূর্ণ সঙ্গীতের আবির্ভাব যেরূপ, আপনার রোগক্ষত, বেদনাপূর্ণ শরীরের অন্তরাল হইতে অপরাজিত আনন্দের প্রকাশও সেইরূপ আশ্চর্য। যেদিন আপনার সহিত দেখা হইয়াছে, সেদিন-ই আমি বোলপুরে চলিয়া আসিয়াছি। এরইমধ্যে আবার যদি কলকাতায় যাওয়া ঘটে, তবে নিশ্চয় দেখা হইবে।’

কান্তকবির রচিত গানটি পড়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন : ‘...আপনি যে গানটি পাঠাইয়াছেন, তাহা শিরোধার্য করিয়া লইলাম। সিদ্ধিদাতা ত আপনার কিছুই অবশিষ্ট রাখেন নাই, সমস্তই ত তিনি নিজের হাতে লইয়াছেন- আপনার প্রাণ, আপনার গান, আপনার আনন্দ সমস্ত ত তাঁহাকেই অবলম্বন করিয়া রহিয়াছে- অন্য সমস্ত আশ্রয় ও উপকরণ ত একেবারে তুচ্ছ হইয়া গিয়াছে। ঈশ্বর যাহাকে রিক্ত করেন, তাহাকে কেমন গভীরভাবে পূর্ণ করিয়া থাকেন। আজ আপনার জীবনসঙ্গীতে তাহাই ধ্বনিত হইতেছে ও আপনার ভাষাসঙ্গীত তাহারই প্রতিধ্বনি বহন করিতেছে।’

শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে রজনীকান্ত সেনের রোগ আরও জটিল হয়। বাংলার ক্ষণজন্মা পুরুষ কান্তকবি রজনীকান্ত সেন সত্যিই অমৃতলোকে যাত্রা করলেন। তাঁর ভাষায় তিনি ‘সকল রকমে কাঙাল হইলেন’। কান্তকবির জীবনপ্রদীপ নিভে গেল। হাস্যময়, সঙ্গীতময়, কৌতুকময় কবির হাসি-সঙ্গীত-কৌতুক চিরতরে স্থবির হয়ে গেল। হাসপাতালে রোগশয্যাশায়ী রজনীকান্ত তার জীবনচরিত লেখার জন্য নলিনীরঞ্জন পণ্ডিতকে অনুরোধ করেছিলেন। কান্তকবির প্রয়াণের প্রায় ১২ বছর পর কবির সেই অনুরোধকে আদেশ বলে শিরোধার্য করে নলিনীরঞ্জন পণ্ডিত ‘কান্তকবি রজনীকান্ত’ নামে রজনীকান্তের একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনীগ্রন্থ লিখেন। সেই জীবনীগ্রন্থের ভূমিকা লিখেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। গ্রন্থের ভূমিকায় কবিগুরু লিখেন ‘রজনীকান্ত সেনের সহিত আমার প্রত্যক্ষ পরিচয় অতি সামান্যই ছিল। আমি কয়েকবার মাত্র তাহার গান তাহার মুখে শুনিয়াছি এবং রোগশয্যায় যখন ক্ষতকণ্ঠে তিনি মৃত্যুর অপেক্ষা করিতেছিলেন। তখন একদিন তাহার সহিত আমার সাক্ষাৎ হইয়াছিল। এই স্বল্প পরিচয়ে তাঁহার সম্বন্ধে আমার মনে যে ভাবের উদয় হইয়াছে সে আমি তৎকালে তাঁহাকে পত্রদ্বারাই জানাইয়াছিলাম।...’।

আজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রচর্চা যেমন- এপার-ওপার দুই বাংলাতেই সুপ্রতিষ্ঠিত ও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত, তেমনি রজনীকান্ত সেনকে ঘিরে চর্চা আমাদের সাহিত্য-পরিসরে ক্রমশই ম্লান হয়ে পড়ছে। সময়ের স্রোতে বর্তমান প্রজন্ম ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে ঠেলে দিচ্ছে তাদেরই এক বঙ্গরত্ন- পঞ্চকবির উজ্জ্বল এক নক্ষত্রকে।

অথচ রজনীকান্ত সেনের জীবনসংগ্রাম, সাধনা এবং স্রষ্টার প্রতি তাঁর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ বাংলা সাহিত্যকে যে গভীর মানবিকতা ও আধ্যাত্মিক ঔজ্জ্বল্যে সমৃদ্ধ করেছে, তা কোনোভাবেই উপেক্ষণীয় নয়; বরং তা নতুন করে অনুধাবন, পুনর্মূল্যায়ন ও পুনরাবিষ্কারের দৃঢ় দাবি রাখে। কবিগুরুর দৃষ্টিতে যিনি ছিলেন মানবাত্মার এক জ্যোতির্ময়, অপরাজেয় প্রকাশ- সেই কান্তকবিকে স্মরণ ও চর্চা করা আজ শুধু শ্রদ্ধার প্রকাশ নয়, বরং বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি আমাদের এক নৈতিক অঙ্গীকার। তাই এখনই সময়- ভুলে যাওয়ার অন্ধকার ভেদ করে আবার নতুন করে ফিরে দেখা রজনীকান্ত সেনকে, তাকে আমাদের চিন্তা ও চর্চার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করা।

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়