ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

তরুণ প্রজন্মের ঝুঁকিতে ই-সিগারেট : নীতিগত সিদ্ধান্তের সংকট ও জনস্বাস্থ্য প্রশ্ন

জুবাইয়া বিন্তে কবির
তরুণ প্রজন্মের ঝুঁকিতে ই-সিগারেট : নীতিগত সিদ্ধান্তের সংকট ও জনস্বাস্থ্য প্রশ্ন

আধুনিক প্রযুক্তির ঝলমলে আবরণে আজ এক নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট বিশ্বজুড়ে ছায়া ফেলেছে ই-সিগারেট, ভেপ ও হিটেড টোব্যাকো তারই নতুন রূপ। ‘কম ক্ষতিকর’, ‘ফ্যাশনেবল’ কিংবা ‘স্মার্ট লাইফস্টাইল’ এর মোহময় প্রচারণায় বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে নিকোটিন আসক্তির দিকে অজান্তেই পা বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশেও ২০১০-এর দশকের শেষভাগ থেকে অনলাইন ও সীমিত আমদানির মাধ্যমে প্রবেশ করা এসব পণ্য দ্রুতই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার লাভ করে, যা অভিভাবক, চিকিৎসক ও নীতিনির্ধারকদের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে এগুলো কোনোভাবেই নিরাপদ বিকল্প নয়; বরং নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিকোটিন নির্ভরতা ছড়িয়ে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত মাধ্যম। একজন মা হিসেবে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার যে উদ্বেগ, একজন গবেষক হিসেবে তথ্যের যে সতর্কতা, আর একজন নাগরিক হিসেবে দায়িত্ববোধ সব মিলিয়ে এই বাস্তবতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। কৈশোরের কৌতূহল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং আধুনিকতার ভ্রান্ত মোহ আজ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের এক নীরব বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইতিহাস একদিন সিগারেটকে আধুনিকতার প্রতীক ভেবেছিল, পরে বিশ্ব বুঝেছে সেটি ছিল ভয়াবহ প্রতারণা; আজ সেই একই বিপদ নতুন প্রযুক্তির মুখোশে ফিরে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে ই-সিগারেটের প্রবেশ, বিস্তার ও নীতিগত আলোচনার পাশাপাশি এর সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব বিশ্লেষণ এখন সময়ের দাবি।

ই-সিগারেট কী এবং এর ইতিহাস : ই-সিগারেট মূলত ব্যাটারিচালিত একটি ডিভাইস, যা তরল নিকোটিনকে গরম করে বাষ্পে পরিণত করে এবং ব্যবহারকারী সেই বাষ্প ফুসফুসে টেনে নেয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ভ্যাপিং’। ২০০৩ সালে চীনের ফার্মাসিস্ট হোন লিক প্রথম আধুনিক ই-সিগারেট তৈরি করেন। উদ্দেশ্য ছিল ধূমপায়ীদের জন্য অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর বিকল্প তৈরি করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ধূমপান ত্যাগের মাধ্যমের চেয়ে নতুন প্রজন্মের নেশায় পরিণত হয়েছে। শুরুতে এটি ছিল সীমিত বাজারের একটি পণ্য, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো এটিকে বিশাল ব্যবসায় রূপ দেয়। নানা রঙ, ডিজাইন ও ফলের স্বাদযুক্ত ফ্লেভার যুক্ত করে এটিকে তরুণদের কাছে ‘ফ্যাশনেবল’ করে তোলা হয়। ফলাফল যারা কখনও ধূমপান করেনি, তারাও কৌতূহল থেকে ভ্যাপিং শুরু করেছে।

তরুণদের ঝুঁকিতে ই-সিগারেট : বাংলাদেশে প্রবেশ, বিস্তার ও নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপট : বাংলাদেশে ই-সিগারেট বা ভেপিং পণ্য ২০১০ সালের শেষভাগে অনলাইন ও সীমিত আমদানির মাধ্যমে বাজারে প্রবেশ করে, কিন্তু তখন কোনো পৃথক আইনগত কাঠামো না থাকায় এটি অনিয়ন্ত্রিতভাবে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। তরুণদের মধ্যে ‘নিরাপদ বিকল্প’ ধারণা ও আকর্ষণীয় বিপণনের কারণে ব্যবহার বাড়লেও, চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকেই এর নিকোটিন আসক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বিষয়ে সতর্ক করেন। পরবর্তীতে ২০২১ সালের পর সরকার এ খাতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে এবং ২০২২ সালে ই-সিগারেট, ভেপ ও অন্যান্য ইমার্জিং টোব্যাকো পণ্য নিষিদ্ধের প্রস্তাবের মাধ্যমে কঠোর নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করে, যার ফলে আমদানি, বিপণন ও বিক্রির ওপর কার্যত নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি তৈরি হয়।

বর্তমান অবস্থা ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার উদ্যোগ : সাম্প্রতিক সময়ে ই-সিগারেট নীতিতে নতুন করে আলোচনার সূচনা হয়েছে, যেখানে কিছু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পূর্বের কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ সামনে এসেছে। সংসদীয় ও প্রশাসনিক পর্যায়ে সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশের খসড়ায় পূর্বের নিষেধাজ্ঞা ধারা পুনর্গঠন বা পরিবর্তনের আলোচনা চলছে বলে জানা যায়। তবে এখনও পর্যন্ত এটি চূড়ান্ত আইন হিসেবে কার্যকর হয়নি; বরং এটি নীতিগত প্রক্রিয়া ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। ফলে একদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, অন্যদিকে নীতিগতভাবে বিষয়টি এখনও সিদ্ধান্তাধীন অবস্থায় রয়েছে যা ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কেন উদ্বেগের : দেশে ই-সিগারেটের বেচাকেনার ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জনস্বাস্থ্যসচেতন মানুষকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। এমন এক সময়ে এই সিদ্ধান্ত এসেছে, যখন বিশ্বজুড়ে বহু দেশ ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণ কিংবা নিষিদ্ধ করার পথে হাঁটছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে আমরা কি জনস্বাস্থ্য রক্ষার পরিবর্তে কর্পোরেট মুনাফার কাছে নত হচ্ছি?

‘নিরাপদ বিকল্প’ সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি : ই-সিগারেটকে প্রচলিত সিগারেটের ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নিকোটিনযুক্ত ই-সিগারেট আসক্তিকর এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি পুরোপুরি নির্ণীত না হলেও এতটুকু নিশ্চিত যে, এর ভেতরে থাকা রাসায়নিক উপাদান মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

তরুণদের লক্ষ্য করে কৌশলী বাজারজাতকরণ : সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ই-সিগারেটের বিপণন কৌশল। আকর্ষণীয় রঙ, ফলের ফ্লেভার, চকচকে ডিজাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গোপন প্রচারণা সবকিছুই মূলত তরুণদের টার্গেট করে সাজানো। যারা কখনও ধূমপান করেনি, তারাও কৌতূহল থেকে ভ্যাপিং শুরু করছে। এ যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পরিকল্পিতভাবে নিকোটিনের আসক্তির দিকে ঠেলে দেওয়া।

কেন তরুণদের কাছে এত জনপ্রিয় : ই-সিগারেটের জনপ্রিয়তার পেছনে মনস্তাত্ত্বিক ও বিপণন দুই ধরনের কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি সাধারণ সিগারেটের মতো দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে না। দ্বিতীয়ত, ফল, চকলেট, ভ্যানিলা, বাবলগাম কিংবা মিন্টের মতো ফ্লেভার তরুণদের কাছে এটিকে আকর্ষণীয় করে তোলে। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটিকে আধুনিক জীবনধারার অংশ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। অনেক তরুণ মনে করে, ভ্যাপিং স্মার্টনেস ও ‘কুল’ ব্যক্তিত্বের প্রতীক। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, ক্যাফে ও রেস্টুরেন্টে প্রকাশ্যে ব্যবহার করার প্রবণতা এটিকে আরও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। অথচ এই তথাকথিত আধুনিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ নিকোটিন আসক্তি।

স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন ঝুঁকছে : আজ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ই-সিগারেটের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। কৈশোর এমন একটি সময়, যখন কৌতূহল, বন্ধুদের প্রভাব এবং নিজেকে আলাদা করে উপস্থাপনের প্রবণতা বেশি থাকে। তামাক কোম্পানিগুলো ঠিক এই দুর্বল জায়গাটিকেই ব্যবহার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং, অনলাইন বিজ্ঞাপন এবং রঙিন প্যাকেজিং তরুণদের মনে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করছে যে এটি ক্ষতিকর নয়। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার চাপ, মানসিক উদ্বেগ কিংবা সাময়িক প্রশান্তির আশায় ভ্যাপিং শুরু করে। কিন্তু খুব দ্রুত তারা নিকোটিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো- ই-সিগারেট ব্যবহারকারী তরুণদের বড় একটি অংশ পরবর্তীকালে প্রচলিত সিগারেটেও আসক্ত হয়ে পড়ে।

নিকোটিন: নিঃশব্দ শৃঙ্খল : নিকোটিন শুধু একটি রাসায়নিক নয়; এটি ধীরে ধীরে মানুষকে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য করে। ভ্যাপিংয়ের ফলে মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ে, যা সাময়িক প্রশান্তি দেয়। কিন্তু সেই প্রশান্তির আড়ালে তৈরি হয় গভীর নির্ভরতা। একসময় মানুষ বুঝতেই পারে না, কখন অভ্যাসটি আসক্তিতে পরিণত হয়েছে।

মস্তিষ্কের বিকাশে ভয়াবহ প্রভাব : কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্ক এখনও বিকাশমান থাকে। এই সময়ে নিকোটিন তাদের মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে ই-সিগারেট শুধু একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক সক্ষমতার ওপরও এক অদৃশ্য আঘাত।

ফুসফুসে জমে ওঠা বিষ : ই-সিগারেটের তরল পদার্থ গরম হয়ে যে অ্যারোসল তৈরি করে, তাতে থাকে ফরমালডিহাইডসহ নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক। এই সূক্ষ্ম কণাগুলো সরাসরি ফুসফুসে প্রবেশ করে কোষের ক্ষতি করে। দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসকষ্ট, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, ফুসফুসের প্রদাহ এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ে।

হৃদ্?রোগের নীরব হুমকি : অনেকে মনে করেন ভ্যাপিং শুধু ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর। বাস্তবে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত। গবেষণায় দেখা গেছে, ই-সিগারেট ব্যবহারকারীদের স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক ও আকস্মিক হৃদ্?মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। দ্বৈতভাবে ই-সিগারেট ও প্রচলিত সিগারেট ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও ভয়াবহ।

‘নিকোটিন-মুক্ত’ দাবির আড়ালের প্রতারণা : বাজারে অনেক পণ্যকে ‘নিকোটিন-মুক্ত’ বলা হলেও সেগুলোর ভেতরেও ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে। ফ্লেভার তৈরিতে ব্যবহৃত কিছু উপাদান শ্বাসনালির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অর্থাৎ ‘নিকোটিন নেই’ বললেই তা নিরাপদ হয়ে যায় না।

ভেপিং ও ক্যানসারের আশঙ্কা : ই-সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা ফ্রি র‍্যাডিক্যাল ও রাসায়নিক যৌগ কোষে বিষক্রিয়া তৈরি করে। কিছু গবেষণায় এগুলোকে ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলা হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ব্যবহারে কোষের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।

অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদের ঝুঁকি : ই-সিগারেটের নিকোটিন অন্তঃসত্ত্বা নারীর ভ্রূণের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। গর্ভপাত, জন্মগত ত্রুটি কিংবা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশজনিত জটিলতাও তৈরি হতে পারে। এমনকি আশপাশের মানুষও এর নির্গত বাষ্পের কারণে ঝুঁকির বাইরে থাকেন না।

বিস্ফোরণের ঝুঁকি : ই-সিগারেট শুধু রাসায়নিক ঝুঁকিই তৈরি করে না; এর ব্যাটারিও বিপজ্জনক। বিভিন্ন দেশে ব্যাটারি বিস্ফোরণে মারাত্মক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। অর্থাৎ এটি শুধু অভ্যাস নয়, অনেক সময় সরাসরি প্রাণঘাতী প্রযুক্তিতেও পরিণত হতে পারে।

ধূমপান ছাড়ার দাবি কতটা সত্য : ই-সিগারেট ধূমপান ছাড়তে সহায়তা করে এমন দাবি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। কিন্তু বহু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এ দাবির পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং অনেকে প্রচলিত সিগারেটের পাশাপাশি ই-সিগারেটেও আসক্ত হয়ে পড়ছেন।

‘গেটওয়ে’ আসক্তির বিপদ : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যারা ই-সিগারেট ব্যবহার করেন, পরবর্তীতে তাদের প্রচলিত সিগারেট ব্যবহারের সম্ভাবনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ ই-সিগারেট নতুন প্রজন্মকে নেশার জগতে প্রবেশের একটি ‘গেটওয়ে’ হিসেবে কাজ করছে।

তামাক কোম্পানির নতুন কৌশল : প্রচলিত সিগারেটবিরোধী জনসচেতনতা বাড়ায় তামাক কোম্পানিগুলো এখন নতুন বাজার খুঁজছে। সেই বাজার হলো তরুণ সমাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্রচারণা ও তথাকথিত ‘লাইফস্টাইল’ মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে তারা ভ্যাপিংকে আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছে।

অর্থনীতি বনাম জনস্বাস্থ্য : কিছু মানুষ হয়তো যুক্তি দেবেন- নিষেধাজ্ঞা অর্থনৈতিক কার্যক্রম সীমিত করবে। কিন্তু তামাকজনিত রোগে প্রতিবছর লাখো মানুষের চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং অকালমৃত্যুর ক্ষতি কি কোনো অর্থনৈতিক লাভ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব? জনস্বাস্থ্য ধ্বংস করে কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না।

শিক্ষক ও অভিভাবকদের করণীয় : এই সংকট মোকাবিলায় আমাদের পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের প্রথম দায়িত্ব হলো সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা, যাতে তারা ভয় বা সংকোচ ছাড়াই নিজেদের অভ্যাস ও মানসিক চাপের কথা বলতে পারে। শুধুমাত্র শাসন নয়, সচেতনতা ও মানসিক সহায়তাই এখানে বেশি কার্যকর। শিক্ষকদেরও দায়িত্ব রয়েছে শ্রেণিকক্ষে তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করা। স্কুল ও কলেজে কাউন্সেলিং সেশন, সচেতনতামূলক কর্মশালা এবং তামাকবিরোধী ক্লাব গড়ে তোলা যেতে পারে। কারণ তরুণদের রক্ষা করার লড়াই শুধু আইনের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এটি সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্বও।

বিশ্বের যেসব দেশ ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করেছে : বিশ্বের বহু দেশ এরইমধ্যে ই-সিগারেটের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। ভারত ২০১৯ সালে জরুরি অধ্যাদেশ জারি করে ই-সিগারেট উৎপাদন, আমদানি, বিক্রি ও বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করে। থাইল্যান্ড শুধু বিক্রি নয়, ব্যবহার ও বহনের ক্ষেত্রেও কঠোর আইন প্রয়োগ করছে। শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো ও নেপালসহ অন্তত ৩৯টি দেশ সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে ১২০টিরও বেশি দেশ। এসব দেশের সরকার কঠোর জরিমানা, জেল, অনলাইন বিপণন নিয়ন্ত্রণ এবং তরুণদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ তারা বুঝেছে- এটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই। বাংলাদেশও যদি এখনই কঠোর না হয়, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

বাংলাদেশের বাস্তবতা আরও ভয়াবহ : বাংলাদেশে তামাকজনিত রোগে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ ত্রিশ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। ক্যান্সার, হৃদ্?রোগ, স্ট্রোক ও শ্বাসতন্ত্রের রোগে বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় নতুন করে ই-সিগারেটের বিস্তার আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো- অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তরুণদের লক্ষ্য করে ভ্যাপিংয়ের গোপন প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নানা প্রচারণা, তথাকথিত ‘লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডিং’ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৌশলী বিপণন নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করছে। এটি শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; এটি একটি নৈতিক ও সামাজিক সংকট।

পরিশেষে বলতে চাই, ই-সিগারেট, ভেপ ও হিটেড টোব্যাকো পণ্যকে আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এগুলো এক নীরব সামাজিক বিপর্যয়ের নাম। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যেকোনো আসক্তিকর পণ্য শুরুতে ‘নিরাপদ’, ‘ফ্যাশনেবল’ কিংবা ‘সময়ের দাবি’ হিসেবে প্রচারিত হলেও শেষ পর্যন্ত তার নির্মম মূল্য দিতে হয় মানুষকেই। আজ আমাদের তরুণ সমাজকে লক্ষ্য করে যেভাবে রঙিন ফ্লেভার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণার মাধ্যমে নিকোটিনের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে জনস্বাস্থ্য, নৈতিকতা এবং জাতির ভবিষ্যতের জন্য গভীর হুমকি। একজন মা হিসেবে আমি চাই, আমার সন্তানরা এমন এক বাংলাদেশে বড় হোক যেখানে স্বপ্ন থাকবে, সৃজনশীলতা থাকবে, সুস্থতা থাকবে কিন্তু নিকোটিনের বিষাক্ত আসক্তি থাকবে না। একজন গবেষক হিসেবে আমি জানি, আজকের এই নীরব অবহেলা আগামী দিনের ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। আর একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র কখনোই তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কর্পোরেট মুনাফার কাছে ছেড়ে দিতে পারে না। এই মুহূর্তে দেশের কোটি কোটি অভিভাবকের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের দিকে।

জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত