কোরবানির অর্থনীতি ও পশুর হাট সম্ভাবনা, সংকট ও বাস্তবতা

ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করে প্রতি বছর মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোরবানি আদায় করেন। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই ধর্মীয় আয়োজন এখন বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও রূপ নিয়েছে। কোরবানিকে কেন্দ্র করে দেশের পশুপালন খাত, গ্রামীণ উৎপাদনব্যবস্থা, পশুখাদ্য শিল্প, পরিবহন খাত, অস্থায়ী পশুর হাট, শ্রমবাজার, চামড়া শিল্প এবং ডিজিটাল বাণিজ্যে ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরি হয়। কয়েক দিনের এ আয়োজনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে লাখো মানুষ। ফলে কোরবানির অর্থনীতি এখন শুধু ধর্মীয় অনুভূতির বিষয় নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি খাত।

কোরবানির পশুতে দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতা : সরকারি হিসাবে ২০২৬ সালের ঈদুল আজহায় দেশে মোট কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার। সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় পশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর মধ্যে রয়েছে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু-মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল-ভেড়া এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রাণী। গত বছরও কোরবানি শেষে প্রায় ৩৩ লাখ ১০ হাজার পশু উদ্বৃত্ত ছিল। এসব তথ্য প্রমাণ করে, বাংলাদেশ এখন কোরবানির পশু উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছে। একসময় দেশের বাজার বিদেশি পশুর ওপর নির্ভরশীল থাকলেও বর্তমানে স্থানীয় খামারিরাই চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছেন। এটি দেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের বড় অর্জন।

গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে কোরবানি : বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে কোরবানির বাজারের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। দেশের হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি সারা বছর ধরে গরু, ছাগল ও ভেড়া লালন-পালন করেন মূলত কোরবানির বাজারকে সামনে রেখে। অনেক পরিবার নিজেদের বাড়িতে একটি বা দুটি গরু পালন করে অতিরিক্ত আয় করার সুযোগ পান। এই আয় দিয়ে তারা সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা, ঘর মেরামত কিংবা ঋণ পরিশোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। ফলে কোরবানির অর্থনীতি শুধু বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কোরবানির মৌসুমে গ্রামে অর্থের প্রবাহ বাড়ে, স্থানীয় বাজার সক্রিয় হয় এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হয়।

৭০ হাজার কোটি টাকার বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড : সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, দেশে কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার প্রায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। কয়েক দিনের একটি ধর্মীয় আয়োজনকে কেন্দ্র করে এত বড় অর্থনৈতিক প্রবাহ বিশ্বের অনেক দেশেই বিরল। পশুপালন, পশুখাদ্য, ভেটেরিনারি ওষুধ, পরিবহন, শ্রমবাজার, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন বেচাকেনা এবং চামড়া শিল্প- সব খাতেই এ সময় ব্যাপক লেনদেন হয়। কোরবানির পশু কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত থাকে ট্রাকচালক, হাটের শ্রমিক, কসাই, লবণ ব্যবসায়ী, চামড়া সংগ্রাহক ও অস্থায়ী কর্মচারীরা। ফলে এই অর্থনীতি সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব ফেলে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে একটি মৌসুমি গতি তৈরি করে।

পশুর হাট এখন বড় অর্থনৈতিক কেন্দ্র : এবার দেশে তালিকাভুক্ত প্রায় ৩ হাজার ৬০০টি পশুর হাট বসবে। রাজধানী ঢাকায় থাকবে ২৭টি হাট- এর মধ্যে উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ১৬টি এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ১১টি। তবে বাস্তবে তালিকার বাইরেও বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য অস্থায়ী হাট গড়ে ওঠে। এসব হাটে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। ফলে পশুর হাট এখন শুধু বেচাকেনার জায়গা নয়; এটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে। কোরবানির কয়েক দিন আগে এসব হাটে মানুষের ঢল নামে, যার প্রভাব আশপাশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়ে। খাবারের দোকান, পরিবহন, অস্থায়ী দোকান এবং ছোটখাটো ব্যবসাও এ সময় বাড়তি আয়ের সুযোগ পায়।

হাট ইজারা ও সিন্ডিকেটের প্রভাব : রাজধানীর পশুর হাট ইজারা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সিন্ডিকেট ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রভাবের কারণে হাট ইজারায় খোলা প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতার পরিবর্তে কিছু গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এবার সরকারি মূল্য কমানো এবং দরপত্রে প্রতিযোগিতা বাড়ার কারণে নতুন অংশগ্রহণ দেখা গেলেও বাস্তবতা পুরোপুরি বদলায়নি। একটি বড় পশুর হাটের ইজারা মানেই কোটি কোটি টাকার লেনদেন। ফলে এ খাতে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা বাড়ে। কিন্তু অতিরিক্ত ইজারা মূল্য ও চাঁদাবাজির চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ ক্রেতা ও খামারিদের ওপর।

সীমান্ত হাট বন্ধ ও দেশীয় খামারিদের সুরক্ষা : একসময় দেশের কোরবানির বাজার ভারতীয় গরুর ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পশু প্রবেশ করায় স্থানীয় খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। বর্তমানে দেশীয় খামারিরা উৎপাদন বাড়িয়েছেন এবং সরকার সীমান্ত নজরদারি জোরদার করেছে। এবার সীমান্তবর্তী পশুর হাট বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে বিদেশি পশুর অবৈধ প্রবেশ বন্ধ করা যায়। এটি স্থানীয় খামারিদের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ। কারণ বিদেশি পশু প্রবেশ করলে দেশীয় উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য পান না। তবে শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নয়, স্থানীয় খামারিদের জন্য সহজ ঋণ, উন্নত পশুখাদ্য ও চিকিৎসা সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।

ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ

কলাম লেখক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি