ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আবাসিক ভবনে সৌরবিদ্যুৎ ও আমাদের করণীয়

আবাসিক ভবনে সৌরবিদ্যুৎ ও আমাদের করণীয়

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সরকারের একটি সাহসী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ হলো রাজধানী ঢাকার আবাসিক ভবনগুলোকে সোলারের আওতায় আনা। সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঢাকা শহরের বাড়ির ছাদগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্রে রূপান্তর করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এটি শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উপায় নয়, বরং ঢাকাকে একটি ‘সবুজ নগরী’ বা ‘গ্রিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার পথে এক বিশাল পদক্ষেপ। ঢাকা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর। এখানে কয়েক লক্ষ আবাসিক ভবন রয়েছে। বর্তমানে আমাদের জাতীয় গ্রিডের ওপর যে চাপ, তা প্রশমনে সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে তুরুপের তাস। গ্রীষ্মকালে এসি এবং ফ্যানের অতিরিক্ত চাহিদার কারণে লোডশেডিংয়ের যে ভোগান্তি আমাদের পোহাতে হয়, প্রতিটি বাড়িতে সোলার প্যানেল থাকলে সেই সংকট অনেকাংশে কমে আসবে। এছাড়া, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কার্বন নিঃসরণ কমানো এখন সময়ের দাবি। সরকারের এই পরিকল্পনার একটি অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো ‘নেট মিটারিং’ ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে একজন বাড়ির মালিক তার ছাদে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করার পর অতিরিক্ত অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবেন। মাস শেষে বিলের সময় ওই সরবরাহকৃত বিদ্যুতের দাম মূল বিল থেকে সমন্বয় করা হবে। অর্থাৎ, সোলার প্যানেল স্থাপন করলে শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ই হবে না, বরং বিদ্যুৎ বিল শূন্যে নামিয়ে আনা এমনকি আয়ের পথ তৈরি করাও সম্ভব। যেকোনো বড় উদ্যোগের মতো এখানেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, সোলার প্যানেল স্থাপনের প্রাথমিক খরচ বা বিনিয়োগ সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ির মালিকদের জন্য কিছুটা ব্যয়বহুল হতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার যদি সহজ শর্তে ঋণ বা ভর্তুকির ব্যবস্থা করে, তবে সাধারণ মানুষ এতে উৎসাহিত হবে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের শহরের অনেক ভবনের ছাদ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয় বা অনেক জায়গায় উঁচু ভবনের ছায়ায় ছোট ভবনগুলো ঢাকা পড়ে থাকে। এসব প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানে দক্ষ প্রকৌশলী ও সঠিক নগর পরিকল্পনার সমন্বয় প্রয়োজন। এছাড়া, বাজারে মানসম্মত সোলার প্যানেল ও ইনভার্টারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ প্রতারিত না হয়।

এই উদ্যোগকে সফল করতে হলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর (ডেসকো বা ডিপিডিসি) মধ্যে নিবিড় সমন্বয় প্রয়োজন। নতুন ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে সোলার প্যানেল স্থাপনকে বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি বিদ্যমান ভবনগুলোতে এটি স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। যেমন- যেসব বাড়িতে সোলার থাকবে, তাদের হোল্ডিং ট্যাক্সে বিশেষ ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

সবশেষে, যেকোনো সরকারি পরিকল্পনা সফল হয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে। সোলার প্যানেল মানেই দুর্বল আলো বা শুধু ফ্যান চলবে- এমন ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আধুনিক সোলার সিস্টেম দিয়ে এখন এসি, ফ্রিজসহ সব ধরনের ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম চালানো সম্ভব। পরিবেশ রক্ষায় এবং নিজের পকেটের সাশ্রয়ে সৌরবিদ্যুৎ যে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ, এই বার্তাটি প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আমদানিকৃত কয়লা বা গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। সূর্যের আলো আমাদের একটি অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। ঢাকার আবাসিক ভবনগুলোতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তা কেবল লোডশেডিংই কমাবে না, বরং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে একটি রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করবে। আমরা আশা করি, সরকার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত একটি স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করবে এবং জনগণের জন্য সোলার প্রযুক্তিকে সহজলভ্য করে তুলবে। বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে সূর্যের শক্তিকে কাজে লাগানোর এখনই সময়।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত