ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর লাশের সারি

রাকিবুল ইসলাম
বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর লাশের সারি

একটি ফুল ফোটার আগেই যদি ঝরে যায়, তবে সেই বাগানের সৌন্দর্য যেমন ম্লান হয়, তেমনি একটি শিশুর অকাল মৃত্যুতে নিভে যায় একটি পরিবারের প্রদীপ, থমকে যায় একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। বর্তমানে বাংলাদেশে ‘হাম’ নামক যে ঘাতক থাবা বসিয়েছে, তা শুধু একটি রোগ নয় এটি যেন আমাদের আগামীর স্বপ্নের ওপর এক ভয়াবহ মরণকামড়।

বর্তমানে দেশের হাসপাতালগুলোর চিত্র কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে কম নয়। হাসপাতালের করিডোরগুলোতে কান পাতলেই শোনা যায় স্বজন হারানো মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ। কোথাও দেখা যাচ্ছে মৃত সন্তানের শীতল কপালে মাথা রেখে পাথর হয়ে বিলাপ করছেন এক মা, কোথাও বাবা তার নিশ্বাসহীন সন্তানকে কোলে নিয়ে পাগলের মতো ছুটছেন অলৌকিক কোনো আশার খোঁজে। কেউবা আদরের সন্তানকে হারিয়ে তার নিথর দেহের সামনে বসে অবাক চোখে অপলক তাকিয়ে আছেন; যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না কয়েক ঘণ্টা আগের হাসিখুশি মুখটি এখন শুধুই একটি প্রাণহীন দেহ।

আত্মীয়-স্বজনরা যখন মৃত্যুর খবর শুনে হাসপাতালে ছুটে আসছেন, তখন তাদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠছে আকাশ-বাতাস। এই করুণ দৃশ্যগুলো আজ বাংলাদেশে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এক বিভীষিকাময় নিত্যদিনের চিত্র। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন (৮ মে, ২০২৬) অনুযায়ী, গত ৫৪ দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৩ জনে। এর মধ্যে ৫৮টি শিশুর মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে এবং বাকি ২৮৫ জন মারা গেছে তীব্র উপসর্গ নিয়ে।

সরকারি নথিপত্রে যখন এই মৃত্যুর হিসাব উঠে আসে, তখন বিবেকবান মানুষের মনে একটি প্রশ্ন বারবার বিঁধতে থাকে বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যাটা আসলে কত? হাসপাতালের চার দেয়ালের বাইরে, অজপাড়াগাঁয়ের জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে কত শত মা তাদের সন্তানকে কোলে নিয়ে শেষ বিদায় জানিয়েছেন, তার প্রকৃত ভয়াবহতা ভাবলে গা শিউরে ওঠে।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি দেখা যায় চিকিৎসার শেষ চেষ্টাটুকু ব্যর্থ হওয়ার পর। যে শিশুটিকে নিয়ে কলকাকলিতে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, সেই শিশুটির নিথর দেহ নিয়ে যখন স্বজনরা অ্যাম্বুলেন্সে করে বাড়ির পথে রওনা হয়, তখন আসলে একটি প্রাণের নয়, বরং একটি হাসিখুশি পরিবারের সামগ্রিক স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে। একেকটি শিশুর প্রস্থান মানে শত শত পরিবারের সাজানো গোছানো সব হাসি-খুশির কবর রচিত হওয়া।

আজ হামের প্রকোপে যে শিশুটি ঝরে গেল, বড় হলে সে দেশের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখতে পারত। যে শিশুটি আজ চিকিৎসার অভাবে মারা গেল, সে-ই হয়তো বড় হয়ে হাজারো মুমূর্ষু মানুষের প্রাণ বাঁচাত। তার মেধা ও শ্রমে গড়ে উঠতে পারত ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’। একজন প্রকৌশলী হিসেবে তার উদ্ভাবনী চিন্তা দেশকে বিশ্বের কাছে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করত। একজন সফল উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী হয়ে সে হয়তো শত শত মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করত, শক্তিশালী করত জাতীয় অর্থনীতিকে। হয়তো সে ছিল আগামীর একজন দেশপ্রেমিক নেতা, যার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশে প্রতিষ্ঠিত হতো ন্যায়বিচার ও অন্ধকারমুক্ত সমাজ। যে হাতটি আজ নিথর হয়ে পড়ে আছে, সেই হাতটিই হয়তো একদিন পুরো দেশকে উন্নয়নের শিখরে নিয়ে যাওয়ার শক্তি রাখত।

সারাদেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৫,৪৯৮ জন শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। এই ধ্বংসলীলা থামাতে আমাদের এখনই জেগে উঠতে হবে- ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ **এমআর (গজ) টিকা নিশ্চিত করা। তীব্র জ্বর আর শরীরে লাল ফুসকুড়ি দেখা দিলেই দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত ভিটামিন-এ ক্যাপসুল নিশ্চিত করলে মৃত্যুঝুঁকি কমে যায়।

হাম কোনো অলৌকিক অভিশাপ নয়, এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। প্রশাসনের জোরালো ভূমিকা আর আমাদের সচেতনতাই পারে এই লাশের মিছিল থামাতে। আর কোনো বাবার কাঁধে যেন তার সন্তানের লাশের ভার উঠতে না হয়, আর কোনো মায়ের হাসি যেন চিরতরে কবরে চলে না যায় সেজন্য আমাদের এখনই সোচ্চার হতে হবে। আমাদের অবহেলায় যেন প্রতিনিয়ত ঝরে না যায় দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ আমাদের আগামীর কারিগররা।

রাকিবুল ইসলাম

লেখক ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত