ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নীরবতা কি সম্মতি, নাকি প্রতিবাদহীন সমাজের বিপদ

আরিফুল ইসলাম রাফি
নীরবতা কি সম্মতি, নাকি প্রতিবাদহীন সমাজের বিপদ

ইতিহাসে সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তগুলো সবসময়ই ঘটেছে তখন, যখন মানুষ অন্যায় দেখেও চুপ ছিল। এই নীরবতা কখনও নিরীহ নয়; বরং এটি ধীরে ধীরে অন্যায়কে শক্তিশালী করে তোলে, অন্যায়ের পক্ষে এক ধরনের অঘোষিত সমর্থনে রূপ নেয়। মানুষ যখন প্রতিবাদ করে না, তখন অন্যায় শুধু টিকে থাকে না, তা প্রতিষ্ঠিত হয়, বিস্তার লাভ করে এবং শেষ পর্যন্ত বৈধতা পায়। এই বাস্তবতা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, নীরবতা শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি সামাজিক অবস্থান, যার প্রভাব গভীর ও সুদূরপ্রসারী।

প্রথমেই বুঝতে হবে, কেন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে না। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ভয়। ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে কথা বললে শাস্তি হতে পারে, এই আশঙ্কা মানুষকে নীরব করে দেয়। অনেকেই ভাবে, ‘আমি একা কিছু বললে কী হবে?’ এই চিন্তাধারা ধীরে ধীরে একটি সম্মিলিত নীরবতার জন্ম দেয়। ফলে অন্যায়কারীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে, কারণ তারা জানে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। ভয় তাই শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো সমাজকেই অবশ করে ফেলে।

দ্বিতীয়ত, রয়েছে উদাসীনতা। অনেক মানুষ অন্যায়ের শিকার না হলে তা নিয়ে ভাবতেই চায় না। ‘আমার ক্ষতি হয়নি, তাই আমি কেন কথা বলব?’ এই মানসিকতা সমাজকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। কারণ অন্যায় কখনও নির্দিষ্ট একজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ধীরে ধীরে সবার জীবনে প্রভাব ফেলে। আজ যে অন্যায়ের শিকার নয়, কাল সে-ই হতে পারে। তবুও মানুষ এই সহজ সত্যটি উপলব্ধি করতে চায় না, এবং নীরবতা বেছে নেয়।

তৃতীয়ত, রয়েছে অসহায়ত্বের অনুভূতি। অনেকেই মনে করে, তার কণ্ঠস্বর কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না। এই চিন্তাধারা মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে তোলে। কিন্তু ইতিহাস বলে, বড় পরিবর্তনগুলো শুরু হয়েছে এক বা কয়েকজন মানুষের সাহসী কণ্ঠ থেকে। তবুও মানুষ যখন নিজেকে ছোট মনে করে, তখন সে নীরব হয়ে যায় এবং সেই নীরবতা অন্যায়ের পক্ষে কাজ করে।

এই নীরবতার ফল কী? সবচেয়ে বড় ফল হলো, অন্যায়ের স্বাভাবিকীকরণ। যখন একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলে না, তখন তা ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। মানুষ মনে করতে শুরু করে এটাই নিয়ম, এটাই বাস্তবতা। ফলে সমাজে একটি বিকৃত মূল্যবোধ তৈরি হয়, যেখানে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি একটি সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। আরেকটি বড় বিপদ হলো, ক্ষমতার অপব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়া। যখন ক্ষমতাবানরা দেখে যে কেউ তাদের প্রশ্ন করছে না, তখন তারা আরও বেশি করে ক্ষমতা অপব্যবহার করে। তারা বুঝে যায়, জবাবদিহির কোনো প্রয়োজন নেই। এই অবস্থায় আইন, ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্রসহ সবকিছুই দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ এই তিনটি ব্যবস্থার মূল শক্তি হলো জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও প্রশ্ন করার ক্ষমতা।

নীরব সমাজে সত্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। কেউ প্রশ্ন না করলে মিথ্যাই প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হয়। মিডিয়া, শিক্ষা এবং সামাজিক আলোচনায় যদি প্রতিবাদের জায়গা না থাকে, তাহলে একসময় মানুষ ভুল তথ্যকেই সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। এটি শুধু একটি তথ্যগত সমস্যা নয়; এটি একটি নৈতিক সংকট, যা একটি জাতির চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে। এছাড়াও নীরবতা সামাজিক সংবেদনশীলতাকে নষ্ট করে দেয়। যখন মানুষ বারবার অন্যায় দেখে কিন্তু প্রতিক্রিয়া জানায় না, তখন তারা ধীরে ধীরে সেই অন্যায়ের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে যায়। একসময় এমন অবস্থায় পৌঁছে, যেখানে অন্যায়ের খবর আর কাউকে নাড়া দেয় না। এই অবস্থাটি অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এটি মানবিকতার অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়। নীরবতার আরেকটি দিক হলো, এটি ভুক্তভোগীদের আরও দুর্বল করে তোলে। যখন কেউ অন্যায়ের শিকার হয় এবং দেখে যে কেউ তার পাশে দাঁড়াচ্ছে না, তখন সে নিজেকে একা এবং অসহায় মনে করে। এই অনুভূতি তার মানসিক শক্তিকে ভেঙে দেয় এবং তাকে আরও বেশি নির্যাতনের শিকার করে তোলে। ফলে অন্যায়কারীরা আরও সাহস পায়, কারণ তারা জানে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।

একটি প্রতিবাদহীন সমাজে ধীরে ধীরে একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়। মানুষ নিজের মতামত প্রকাশ করতে ভয় পায়, প্রশ্ন করতে ভয় পায়, এমনকি সত্য কথা বলতেও ভয় পায়। এই ভয় সমাজকে স্থবির করে দেয়। নতুন চিন্তা, নতুন ধারণা এবং পরিবর্তনের সম্ভাবনা সবকিছুই থেমে যায়। ফলে সমাজ এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে পিছিয়ে পড়ে। তবে প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার উপায় কী? প্রথমত, মানুষকে বুঝতে হবে যে নীরবতা কোনো সমাধান নয়। বরং এটি সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। দ্বিতীয়ত, ছোট ছোট প্রতিবাদও গুরুত্বপূর্ণ। সবাইকে একসঙ্গে বড় আন্দোলনে নামতে হবে এমন নয়; বরং নিজের অবস্থান থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলাই প্রথম পদক্ষেপ। তৃতীয়ত, শিক্ষা ও সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যত বেশি সচেতন হবে, তত বেশি তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে। এছাড়া, একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে মানুষ নিরাপদে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমসহ সব জায়গায় এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রশ্ন করা উৎসাহিত করা হবে, ভিন্নমতকে সম্মান করা হবে। এই ধরনের পরিবেশই একটি শক্তিশালী ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে পারে।

নীরবতা কখনও নিরপেক্ষ নয়। এটি হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে, নয় অন্যায়ের পক্ষে। যখন মানুষ চুপ থাকে, তখন তা অন্যায়ের পক্ষেই কাজ করে। তাই একটি সুস্থ সমাজ গড়তে হলে, নীরবতার এই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। মানুষকে কথা বলতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে। কারণ, এই কণ্ঠস্বরই একটি সমাজকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। তাই নীরবতা শুধু একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি সামাজিক দায়। আমরা যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা না বলি, তাহলে আমরা সেই অন্যায়ের অংশ হয়ে যাই। আর এই সত্যটি উপলব্ধি করাই হতে পারে একটি পরিবর্তনের সূচনা, যেখানে মানুষ আর চুপ থাকবে না, বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে।

আরিফুল ইসলাম রাফি

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত