ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ভর্তুকির জালে বিদ্যুৎ খাত প্রয়োজন টেকসই সমাধান

ভর্তুকির জালে বিদ্যুৎ খাত প্রয়োজন টেকসই সমাধান

বিগত সরকারের অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাত আজ ‘সিন্দাবাদের ভূত’ হয়ে রাষ্ট্রের ঘাড়ে চেপে বসেছে। গত শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বেশি দামে কিনে কমে বিক্রির কারণে চলতি বছরেও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) লোকসান হবে ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা।

আগামী অর্থবছরে (২০২৬-২৭) যা দাঁড়াবে ৬৫ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এ খাতের লোকসান শুধুই বাড়ছে।

পরিতাপের বিষয়, বছরের পর বছর ধরে আমরা শুধুই সক্ষমতার কথা শুনে আসছি; কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সক্ষমতার বড় অংশই এখন অলস পড়ে থেকে রাষ্ট্রের কোষাগার খালি করছে। সম্প্রতি পিডিবির যে হিসাব সামনে এসেছে, তা এক কথায় ভুল পরিকল্পনা আর অদূরদর্শী নীতির এক করুণ দলিল। ১৩ টাকায় বিদ্যুৎ কিনে ৭ টাকায় বিক্রি করার যে গাণিতিক মরণকামড়, তার চূড়ান্ত দায়ভার শেষ পর্যন্ত জনগণের কাঁধে গিয়েই পড়ছে।

বলা বাহুল্য, আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি আর অসম সব বিদ্যুৎ চুক্তির ফলে নিজেদের গ্যাস অনুসন্ধানে আমরা বছরের পর বছর স্থবিরতা দেখিয়েছি। অথচ বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে ফার্নেস অয়েল, কয়লা আর এলএনজি আমদানিতে আমরা চরম উৎসাহ দেখিয়েছি।

স্বাভাবিকভাবেই ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে কয়লাভিত্তিক বড় কেন্দ্রগুলোর উচ্চ উৎপাদন ব্যয় আজ গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে দেশের সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট, সেখানে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না শুধু জ্বালানি সংকটের কারণে।

ফলে বিপুল অঙ্কের টাকা অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসাবে দিতে হচ্ছে। রাষ্ট্রের ধমনিতে প্রবাহিত এই অর্থের অপচয় কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ বিভাগ লোকসান সামাল দিতে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষের পকেট কেটে কি এই বিশাল গর্ত ভরাট করা সম্ভব? ইউনিটে এক-দেড় টাকা দাম বাড়ালে হয়তো ১০ হাজার কোটি টাকা আসবে; কিন্তু বাকি ৫০ হাজার কোটি টাকার সুরাহা কীভাবে হবে? উলটো বিদ্যুতের দাম বাড়লে কলকারখানার উৎপাদন খরচ বাড়বে, যার পরিণতিতে নিত্যপণ্যের দাম হবে আকাশচুম্বী।

অর্থাৎ, এক খাতের লোকসান ঢাকতে গিয়ে পুরো অর্থনীতিকে মূল্যস্ফীতির আগুনের মুখে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

এই অন্ধকার থেকে বের হতে হলে স্বাভাবিকভাবেই সরকারকে বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধান খুঁজতে হবে। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন জ্বালানি সার্বভৌমত্ব। বিদেশ থেকে তেল-গ্যাস আনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে নিজস্ব খনিজসম্পদ উত্তোলনে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে। সৌরশক্তির সম্ভাবনাকে শুধু পরিকল্পনার মধ্যে না রেখে দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে মূলধারার জ্বালানি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

একই সঙ্গে আদানিসহ যেসব কোম্পানির সঙ্গে অসম চুক্তি আছে, যেসব কেন্দ্র অলস বসে টাকা নিচ্ছে, সেগুলোর বিষয়ে জাতীয় স্বার্থে কঠোর ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সরকারকে মনে রাখতে হবে, সিস্টেম লস আর দুর্নীতির মাধ্যমে হওয়া অর্থের অপচয় রোধ করা না গেলে এই র্ভুকির চোরাবালি থেকে মুক্তি মিলবে না। সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত