প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১১ মে, ২০২৬
আমরা মুখে বলি ‘মা’ শব্দের চেয়ে মধুর আর কিছু নেই, অথচ আমাদের বাস্তব আচরণ বড়ই নির্মম ও পরস্পরবিরোধী। আজকের এই আধুনিক পৃথিবীতে আমরা জন্মদাত্রী মাকে অবলীলায় শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করছি, তাকে তার ন্যূনতম মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করছি। এত চরম বঞ্চনা, অবহেলা ও আঘাতের পরও একজন মা যেন নির্বিকার এক ছায়াবৃক্ষ, যিনি অকাতরে তার সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে শুধু সন্তানের মঙ্গলই কামনা করে যান। কিন্তু আমরা কি ক্ষণিকের জন্যও ভেবে দেখেছি, আমাদের এই সীমাহীন অবহেলা ও নিষ্ঠুরতার জেরে যদি প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসরের মতো ‘মা’ সত্তাটিই পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায় ডাইনোসর হারিয়েছিল প্রকৃতির এক কঠিন বিপর্যয়ে, আর ‘মা’ যদি হারিয়ে যান আমাদের অমানবিকতার নির্মমতায়, তবে কেমন হবে সেই মা-হীন রুক্ষ পৃথিবী?
আমাদের চারপাশে একটু সচেতন দৃষ্টি দিলেই মায়ের প্রতি নিষ্ঠুরতার এক ভয়ংকর ও নির্দয় পরিসংখ্যান চোখে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মতে, বর্তমান বিশ্বে বয়স্ক নির্যাতনের হার উদ্বেগজনক, যার একটি বিশাল অংশই হলেন বয়োবৃদ্ধ মায়েরা। পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে সম্পত্তির অধিকার- সব জায়গা থেকেই মাকে সুকৌশলে বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যে মা নিজের অস্থিমজ্জা গলিয়ে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান, সেই মা-ই আজ নিজ গৃহে সবচেয়ে বেশি পরবাসী, উপেক্ষিতা ও অধিকারহীন। প্রতিনিয়ত আমরা একজন মানুষকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করছি, যা শুধু একটি আইনগত বা নৈতিক অপরাধ নয়, বরং সমাজ কাঠামোর জন্য এক চরম আত্মঘাতী পদক্ষেপ। মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে দুর্বলতা ভেবে আমরা যে অকৃতজ্ঞতার চর্চা করছি, তা আমাদের সভ্যতার শিকড়কেই অন্তঃসারশূন্য করে দিচ্ছে।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে মা-হীন পৃথিবীর ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, মায়ের স্পর্শ ও সান্নিধ্যে সন্তানের মস্তিষ্কে ‘অক্সিটোসিন’ বা ভালোবাসার হরমোন নিঃসৃত হয়, যা একজন মানুষকে মানসিকভাবে সুস্থ, সহানুভূতিশীল ও প্রকৃত অর্থে মানবিক করে গড়ে তোলে। মা-হীন পৃথিবীতে এই হরমোনের প্রাকৃতিক প্রবাহ যেন চিরতরে শুকিয়ে যাবে। একবার ভাবুন তো এমন এক যান্ত্রিক সমাজের কথা, যেখানে শিশুরা জন্ম নেবে ঠিকই, কিন্তু তাদের বেড়ে ওঠায় কোনো মমতাময়ী হাতের ছোঁয়া থাকবে না। সেই পৃথিবীতে অপরাধপ্রবণতা, বিষণ্ণতা এবং মানসিক বিকারগ্রস্ততার হার হবে অকল্পনীয়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর প্রাথমিক মানসিক বিকাশের মূলভিত্তিই হলো মায়ের শর্তহীন ভালোবাসা। এই নিরঙ্কুশ ভালোবাসা ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পরিণত হবে কেবল কিছু বুদ্ধিমান কিন্তু অনুভূতিহীন রোবটে। মা-হীন পৃথিবী হবে আক্ষরিক অর্থেই এক বিশাল, শীতল ও নিষ্প্রাণ এতিমখানা।
?অর্থনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও মায়ের অবদান বা ‘আনপেইড কেয়ার ওয়ার্ক’-এর কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প আজ পর্যন্ত পৃথিবী আবিষ্কার করতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফামের একটি বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বে নারীরা, বিশেষ করে মায়েরা, প্রতিদিন যে পরিমাণ অবৈতনিক সেবামূলক কাজ করেন, তার আর্থিক মূল্য বছরে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের সমান। এই নিঃস্বার্থ সেবাই বিশ্ব অর্থনীতির একটি বিশাল অদৃশ্য চালিকাশক্তি। মা যদি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যান, তবে এই বিশাল সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্বের শূন্যস্থান পূরণ করবে কে? একটি শিশুর জন্ম থেকে শুরু করে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের নিরবচ্ছিন্ন যত্ন নেওয়া- এই কাজগুলো কোনো কর্পোরেট বা পেশাদার প্রতিষ্ঠান দিয়ে করানো কখনোই সম্ভব নয়। মায়ের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা আমাদের পারিবারিক কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
বিবর্তনের ইতিহাসে ডাইনোসরদের বিলুপ্তি ঘটেছিল উল্কাপাতের মতো কোনো এক মহাজাগতিক বা প্রাকৃতিক কারণে, কিন্তু ‘মা’ নামক এই ঐশ্বরিক সত্তার বিলুপ্তি ঘটবে আমাদের নিজেদের তৈরি করা অমানবিকতা ও স্বার্থপরতার বিষবাষ্পে। আমরা যখন মাকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করি, তখন আমরা শুধু একজন অসহায় মানুষকে আঘাত করি না, বরং পৃথিবীর বুক থেকে একটু একটু করে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার শেষ চিহ্নটুকুকে মুছে ফেলি। একটি প্রজাতির বিলুপ্তির আগে যেমন প্রকৃতিতে নানা সতর্কবার্তা দেখা যায়, তেমনি বৃদ্ধাশ্রমের বাড়তে থাকা সংখ্যা, পারিবারিক সহিংসতা এবং মায়ের প্রতি সামগ্রিক অবহেলা হলো আমাদের আসন্ন ধ্বংসের অশনিসংকেত। যদি এই নৈতিক অবক্ষয় চলতেই থাকে, তবে খুব বেশি দেরি নেই যখন ‘মা’ শব্দটি কেবল রূপকথার বইয়ে বা জাদুঘরের ধুলোপড়া আর্কাইভে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
পৃথিবী নামক এই গ্রহটি আজও বাসযোগ্য রয়েছে কারণ এখানে অন্তত এমন একজন আছেন, যিনি নিজের সবটুকু বিলিয়ে দিয়ে অন্যের অস্তিত্বকে সযত্নে রক্ষা করেন।
মা-হীন পৃথিবী কোনোভাবেই মানুষের জন্য বাসযোগ্য হতে পারে না; সেটি হবে কেবল লোহা, কংক্রিট আর প্রযুক্তির এক মৃত ও অনুভূতিহীন গ্রহ। আমাদের এখনই সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের এই নিষ্ঠুরতার নির্মম হিসাব মেলানোর। মাকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান, ন্যায্য অধিকার এবং নিঃশর্ত ভালোবাসা ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে মূলত আমাদের নিজেদের অস্তিত্বকেই টিকিয়ে রাখতে হবে। কারণ, মা যদি ডাইনোসরের মতো কালের নিষ্ঠুর গর্ভে সত্যিই হারিয়ে যান, তবে এই পৃথিবীতে মানবজাতির টিকে থাকার আর কোনো যৌক্তিক বা মানবিক কারণই অবশিষ্ট থাকবে না।
আমানুর রহমান
শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ