দেশভাগ থেকে মুক্তিযুদ্ধ : পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ

এম মহাসিন মিয়া

প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ একটি গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাববাহী ঘটনা, যা শুধু ভৌগোলিক মানচিত্রকেই পুনর্গঠন করেনি, বরং মানুষের পরিচয়, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রচিন্তাকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের প্রাক্কালে ধর্মীয় ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান, এই দুই রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এই বিভাজনের সময় বিভিন্ন অঞ্চলকে ঘিরে জটিলতা ও বিতর্ক সৃষ্টি হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্তর্ভুক্তি একটি বিশেষ আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। কারণ, এই অঞ্চলটি তার ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক বৈশিষ্ট্যের কারণে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আলাদা ছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি পাহাড়ি অঞ্চল, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বনভূমি ও বৈচিত্র্যময় জাতিগোষ্ঠীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। এখানে বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, খিয়াং, বমসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস এই অঞ্চলের সামাজিক কাঠামোকে বহুবর্ণ ও বহুস্বরিক করে তুলেছে। তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় আচার ও জীবনধারা এক স্বাতন্ত্র্যিক উদাহরণে রুপ নিয়েছে।

ব্রিটিশ আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে পরিচালনা করা হতো। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন অনুযায়ী এই অঞ্চলকে ‘এক্সক্লুডেড এরিয়া’ ঘোষণা করা হয়, যার ফলে সাধারণ ব্রিটিশ আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো এখানে পুরোপুরি কার্যকর ছিল না। স্থানীয় প্রধানদের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হতো এবং বহিরাগতদের প্রবেশ ও ভূমি অধিগ্রহণের ওপর বিধিনিষেধ ছিল। এই বিশেষ ব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ভূমি অধিকার ও সামাজিক কাঠামোকে রক্ষা করা।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, এই অঞ্চলের একটি অংশ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে মতপ্রকাশ করেছিল। এর পেছনে ধর্মীয় পার্থক্য (অধিকাংশই ছিল অমুসলিম) এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ভৌগোলিক অবস্থান, প্রশাসনিক সংযোগ এবং তৎকালীন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই অন্তর্ভুক্তি অনেকের কাছে আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত মনে হলেও তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময়টি পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জের সময়। পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হিসেবে এই অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক কাঠামো ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। এই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ। ১৯৬০ এর দশকে নির্মিত এই বাঁধ দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও স্থানীয় জনগণের জন্য এটি ছিল এক গভীর সংকটের সূচনা।

কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে প্রায় কয়েক হাজার একর আবাদি জমি পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষ তাদের বসতভিটা হারায়। বিশেষ করে চাকমা ও অন্যান্য উপজাতি জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব ছিল মারাত্মক। বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে কিংবা প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। তাদের জীবিকা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক কাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই অভিজ্ঞতা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষোভ ও বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করে। যদিও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়েছিল। তবে পুর্নবাসন ও বণ্টন কার্যক্রম ও প্রকৃত তথ্যও স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি বা মহল কর্তৃক বিকৃত হয়েছে বলে জানা যায়।

এই সময়কালে ভূমি ব্যবস্থাপনা, বনজ সম্পদের ব্যবহার এবং অভ্যন্তরীণ জনসংখ্যা স্থানান্তরের মতো নীতিগুলোও স্থানীয় জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকার স্বীকৃতি পায়নি এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে তাদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। ফলে একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে সংঘাতের রূপ নেয়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত হয়। সীমান্তবর্তী ও দুর্গম হওয়ায় এই অঞ্চলটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং যোগাযোগের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের অংশগ্রহণ ছিল বৈচিত্র্যময়। কেউ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, কেউ নিরপেক্ষ থেকেছেন, আবার কেউ ভিন্ন পরিস্থিতির কারণে অন্য অবস্থান গ্রহণ করেছেন। এই বাস্তবতা যুদ্ধকালীন সময়ের জটিলতাকেই প্রতিফলিত করে। তথ্যের সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ মানুষের অবস্থান নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল।

স্বাধীনতার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়। রাষ্ট্রীয় সীমারেখা ও সংবিধান অনুযায়ী এই অঞ্চল বাংলাদেশের অন্তর্গত। তবে স্বাধীনতার পরও এই অঞ্চলে বিভিন্ন সমস্যা ও দাবি সামনে আসে। ভূমি অধিকার, স্বায়ত্তশাসন, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়। সরকার এবং পার্বত্য অঞ্চলের একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিনের সংঘাত নিরসন এবং একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা। চুক্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং ভূমি কমিশন গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

তবে এই চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ধারা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সমস্যাগুলো পুরোপুরি সমাধান হয়নি এবং আস্থার সংকট এখনও বিদ্যমান। তবুও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত, যা শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ নির্দেশ করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। এটি শুধুমাত্র একটি ভূখণ্ডগত প্রশ্ন নয়, বরং এটি বহু জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, সংগ্রাম এবং পরিচয়ের সমন্বয়ে গঠিত একটি জটিল বাস্তবতা। রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিকে গুরুত্ব না দিলে এই অঞ্চলকে সম্পূর্ণভাবে বোঝা সম্ভব নয়।

‘পার্বত্য চট্টগ্রাম কার অধীনে ছিল’- এই প্রশ্নের উত্তর যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘এই অঞ্চলের মানুষের জীবন কেমন ছিল’ এবং ‘তারা কী ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে’- এই বিষয়গুলো। ইতিহাসকে একমাত্রিকভাবে দেখলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়ালে থেকে যায়। তাই এই অঞ্চলের ইতিহাসকে বহুমাত্রিকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। সার্বিকভাবে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। এই ধারাবাহিকতা প্রশাসনিক, রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি বাস্তবতা। তবে ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতার পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন সংলাপ, সমতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। স্থানীয় জনগণের অধিকার ও সংস্কৃতিকে সম্মান জানিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে এই অঞ্চল দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।সবকিছু বিবেচনায় বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের একটি ভৌগোলিক অংশ নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, বৈচিত্র্য এবং রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। দেশভাগ থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এর যে ঐতিহাসিক যাত্রা, তা আজকের বাস্তবতাকে বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই ইতিহাসের সঠিক মূল্যায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গিই পারে পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি শান্তিপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

এম মহাসিন মিয়া

সাংবাদিক, লেখক ও আঞ্চলিক গবেষক, পার্বত্য চট্টগ্রাম