ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সাংবাদিক, লেখক ও আঞ্চলিক গবেষক, পার্বত্য চট্টগ্রাম

তৌসিফ রেজা আশরাফী
সাংবাদিক, লেখক ও আঞ্চলিক গবেষক, পার্বত্য চট্টগ্রাম

বিকালের সময় মাঠটি শান্ত ও নীরব। নেই কোনো হাঁকডাক, নেই দৌড়ঝাঁপের শব্দ। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও যে মাঠে বিকাল হলেই বিভিন্ন বয়সী শিশুদের সমাগম হতো, আজ সেখানে নীরবতা বিরাজ করছে। একসময় শৈশব মানেই ছিল খোলা মাঠ, বিকালের রোদ, পাড়ার বন্ধুদের ডাকাডাকি আর খেলাধুলায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘরে ফেরা। সেই শৈশবের আনন্দ ছিল সহজ, নির্মল এবং প্রাণবন্ত। আজ সময় বদলেছে, বদলেছে শৈশবের চেহারাও। বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের হাতে খেলনার বদলে স্মার্টফোন, মাঠের বদলে স্ক্রিন। ফলে শৈশব আছে বটে, কিন্তু নেই শৈশবের স্বাদ।

প্রযুক্তির যুগে স্মার্টফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। শিক্ষা, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহে এর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এই প্রযুক্তির ব্যবহার সীমা ছাড়িয়ে যায়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীন স্মার্টফোন ব্যবহার তাদের স্বাভাবিক শৈশবকে নীরবে গ্রাস করছে।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী বিপুল সংখ্যক শিশু দিনে কয়েক ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে কাটাচ্ছে, যা তাদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একইভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে জানিয়েছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম তাদের ঘুম, শারীরিক বিকাশ ও আচরণগত স্বাভাবিকতায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, ছোট শিশুদের দৈনিক স্ক্রিন ব্যবহারের নির্দিষ্ট সীমা থাকা প্রয়োজন, অথচ বাস্তবে সেই সীমা অনেক ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কমন সেন্স মিডিয়ার এক জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে অনেক শিশু ও কিশোর প্রতিদিন গড়ে ৭ ঘণ্টারও বেশি সময় স্ক্রিনভিত্তিক বিনোদনে ব্যয় করছে। অন্যদিকে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, অধিকাংশ অভিভাবকই মনে করেন অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার শিশুদের সামাজিক আচরণ ও মনোযোগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শহরাঞ্চলের শিশুদের বড় একটি অংশ অবসর সময়ের বেশিরভাগই কাটাচ্ছে মোবাইল ফোনে। খেলাধুলা, বই পড়া ও সামাজিক মেলামেশা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা ভবিষ্যতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। সামাজিক সমীকরণে পরিবর্তন আজ স্পষ্ট। একসময় শিশুরা দলবদ্ধভাবে খেলাধুলা করত, একে অন্যের সঙ্গে কথা বলত, ঝগড়া করত, আবার মিলেও যেত। সেই সামাজিক চর্চা থেকেই তারা শিখত সহমর্মিতা, নেতৃত্ব ও বন্ধুত্বের মূল্য। অথচ এখন শিশুর সামাজিক জগত সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে ভার্চুয়াল পরিসরে। বাস্তব বন্ধুত্বের জায়গা দখল করছে অনলাইন গেমস ও ডিজিটাল চরিত্র। যুক্তরাষ্ট্রের শিশু চিকিৎসাবিষয়ক সংগঠন আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস জানিয়েছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ও সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। পারিবারিক সমীকরণেও স্মার্টফোন বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। কর্মব্যস্ত বাবা-মা অনেক সময় সন্তানকে সময় দিতে না পেরে স্মার্টফোনকেই বিকল্প হিসেবে তুলে দিচ্ছেন। শিশুটি শান্ত থাকছে, এটাই যেন স্বস্তি। অথচ এই সাময়িক স্বস্তি ভবিষ্যতে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। পরিবারে গল্প, আড্ডা ও আন্তরিক সম্পর্কের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। গবেষকরা বলছেন, যেসব পরিবারে একসঙ্গে সময় কাটানোর প্রবণতা কমে যায়, সেসব পরিবারের শিশুদের মধ্যে একাকিত্ব ও মানসিক চাপ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

শিক্ষাগত দিক থেকেও স্মার্টফোন দ্বিমুখী ভূমিকা পালন করছে। একদিকে অনলাইন শিক্ষা, তথ্য ভান্ডার ও শেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত গেমস, ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তির কারণে শিশুদের মনোযোগ কমছে। বই পড়ার আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে, ধৈর্য ধরে শেখার ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত ডিজিটাল নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও গভীরভাবে শেখার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। মানসিক সমীকরণ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। শিশু মন খুবই সংবেদনশীল। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে ডুবে থাকলে তাদের মধ্যে একাকিত্ব, বিরক্তি ও অস্থিরতা বাড়ে। বাস্তব জীবনের ছোট ছোট আনন্দ তাদের কাছে মূল্যহীন হয়ে ওঠে। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের হতাশা, উদ্বেগ ও আগ্রাসী আচরণের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শিশু ভবিষ্যতে আত্মকেন্দ্রিক ও আবেগহীন হয়ে উঠতে পারে।

শারীরিক দিকটিও উপেক্ষণীয় নয়। মাঠে খেলাধুলা কমে যাওয়ায় শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘুমের ব্যাঘাত এখন অতি পরিচিত সমস্যা। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে শিশুদের চোখের চাপ বাড়ছে এবং কম বয়সেই দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে শরীরচর্চার অভাবে স্থূলতা ও অলসতার প্রবণতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই সংকটের দায় শুধু শিশুদের নয়। সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্র সবাই কোনো না কোনোভাবে দায়ী। প্রযুক্তি এসেছে মানুষের কল্যাণের জন্য, শৈশব ধ্বংসের জন্য নয়। তাই প্রয়োজন সচেতনতা ও দায়িত্বশীল ব্যবহার। শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে স্মার্টফোন ব্যবহার সীমিত করা, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। শিশুর হাতে শুধু ফোন তুলে দিলে দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং প্রয়োজন তাদের হাতে বই তুলে দেওয়া, মাঠে নিয়ে যাওয়া, সময় দেওয়া এবং ভালোবাসা দেওয়া।

শৈশব আর কখনও ফিরে আসে না। এই সময়টাই মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। আজ যদি আমরা শিশুদের শৈশবকে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বন্দি করি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো প্রযুক্তিতে দক্ষ হবে, কিন্তু মানবিকতায় পিছিয়ে পড়বে। তখন হয়তো আধুনিক শহর থাকবে, উন্নত প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু থাকবে না প্রাণভরা শৈশবের হাসি। তাই এখনই সময় শৈশবকে তার প্রকৃত রঙে ফিরিয়ে দেওয়ার, মাঠে আবার শিশুদের কোলাহল ফিরিয়ে আনার, এবং শৈশবকে আবার শৈশবের মতো করে বাঁচতে দেওয়ার।

তৌসিফ রেজা আশরাফী

লেখক ও কলামিস্ট, সৈয়দপুর, নীলফামারী

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত