ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

হেপাটাইটিসমুক্ত সমাজ গড়ার উপায়

আমানুর রহমান
হেপাটাইটিসমুক্ত সমাজ গড়ার উপায়

মানবদেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো লিভার বা যকৃত। একে শরীরের প্রধান রাসায়নিক গবেষণাগার বলা হয়, যা পাঁচ শতাধিক অত্যাবশ্যকীয় কাজ পরিচালনা করে।

খাদ্য পরিপাক থেকে শুরু করে শরীরের ক্ষতিকর বিষাক্ত উপাদান বা টক্সিন বের করে দেওয়া এবং শক্তি সঞ্চয় করে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন হয় এই অঙ্গটির মাধ্যমে। কিন্তু যখন বিভিন্ন ভাইরাস বা নানা কারণে এই লিভারে প্রদাহ বা সংক্রমণের তৈরি হয়, তখন তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘হেপাটাইটিস’ বলা হয়।

বর্তমান বিশ্বে এটি এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এই রোগের জটিলতায় প্রতি বছর বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হেপাটাইটিসে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষই জানেন না যে তারা এই ভাইরাসের বাহক। এই অজ্ঞতাই রোগটিকে ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, যা নীরবে জনস্বাস্থ্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাই একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে হেপাটাইটিস সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা ও গভীর সচেতনতা থাকা আবশ্যক। হেপাটাইটিস মূলত পাঁচ ধরনের ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়ায়- এ, বি, সি, ডি এবং ই। এদের সংক্রমণ পদ্ধতি এবং ভয়াবহতাও ভিন্ন ভিন্ন।

হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’ সাধারণত দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেখানে বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে এবং রাস্তার খোলা খাবারের জনপ্রিয়তা বেশি, সেখানে এই দুই ধরনের ভাইরাসের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে, হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’ অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এগুলো মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক, একই সুচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহার এবং আক্রান্ত মায়ের শরীর থেকে শিশুর দেহে ছড়ায়। এই ভাইরাসের সংক্রমণ পদ্ধতিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের সামান্য অসাবধানতাই এই প্রাণঘাতী রোগ বিস্তারের মূল কারণ। আধুনিক জীবনযাত্রায় পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপদ অভ্যাসের অভাবই হেপাটাইটিসকে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। হেপাটাইটিস রোগের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো এর উপসর্গহীনতা।

হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর প্রাথমিক অবস্থায় কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায় না। মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ধরে এই ভাইরাস লিভারের কোষগুলোকে ধ্বংস করতে থাকে। যখন রোগী জন্ডিস, পেটে পানি আসা, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা বমির মতো গুরুতর লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান, তখন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় লিভারের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। দীর্ঘমেয়াদি এই সংক্রমণ থেকে লিভার সিরোসিস এবং পরবর্তীকালে লিভার ক্যানসারের মতো মরণব্যাধি সৃষ্টি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, লিভার ক্যানসারের প্রায় ৮০ শতাংশ কারণ হলো হেপাটাইটিস ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাস।

সময়মতো পরীক্ষা না করার কারণে এবং লক্ষণ প্রকাশের অপেক্ষায় থাকার ফলে অসংখ্য মানুষ অকালমৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, যা জাতীয় পর্যায়ে এক বিশাল জনশক্তির অপচয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মৌলিক নীতি হলো- প্রতিরোধই প্রতিকারের চেয়ে উত্তম। হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচার জন্য এখন অত্যন্ত কার্যকর ও নিরাপদ ভ্যাকসিন বা টিকা সহজলভ্য। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে জন্মের পরপরই এই টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে। তবে বড়দের ক্ষেত্রেও রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাসমুক্ত কি না তা নিশ্চিত হয়ে এই টিকা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে, হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’ প্রতিরোধের জন্য ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

পানি ফুটিয়ে পান করা, খাওয়ার আগে হাত ধোয়া এবং রাস্তার অস্বাস্থ্যকর খাবার বর্জন করার মাধ্যমেই এই দুই ধরনের ভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এ ছাড়া সেলুনে শেভ করার সময় নতুন ব্লেড ব্যবহার, ইনজেকশনের ক্ষেত্রে ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ নিশ্চিত করা এবং অন্যের ব্যবহৃত টুথব্রাশ বা রেজারের মতো ব্যক্তিগত জিনিস ব্যবহার না করা হেপাটাইটিস প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার হতে পারে। সামাজিক সচেতনতা এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় ছাড়া এই নীরব ঘাতককে রুখে দেওয়া অসম্ভব। আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই হেপাটাইটিস বা জন্ডিস হলে মানুষ অবৈজ্ঞানিক ঝাড়ফুঁক বা কবিরাজি চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে, যা রোগীর অবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তোলে। এই কুসংস্কার দূর করতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে হবে।

প্রতিটি জেলায় স্ক্রিনিং বা রক্ত পরীক্ষার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ সহজেই জানতে পারে সে আক্রান্ত কি না। বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানে হেপাটাইটিস ‘সি’ এখন পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য এবং ‘বি’ ভাইরাসের জন্যও উন্নত ওষুধ রয়েছে যা দিয়ে রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তাই ভীতি নয়, বরং সঠিক সময়ে শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণই হতে পারে জীবন বাঁচানোর চাবিকাঠি।

হেপাটাইটিসমুক্ত একটি সমাজ গঠন করা খুব কঠিন কোনো কাজ নয়, যদি আমরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতন হই।

আমাদের ছোট ছোট সচেতন পদক্ষেপ- যেমন নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন নিশ্চিত করা, টিকার মাধ্যমে সুরক্ষা নেওয়া এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অনুসরণ করা- এই মরণব্যাধিকে পরাজিত করতে পারে। প্রতিটি নাগরিক যদি হেপাটাইটিসের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হন এবং অন্যকে সচেতন করেন, তবেই আমরা আগামীর একটি সুস্থ ও সুন্দর পৃথিবী বিনির্মাণ করতে পারব। নীরব ঘাতককে রুখে দেওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়। সচেতন হোন, সুরক্ষিত থাকুন।

আমানুর রহমান

কবি ও লেখক, চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত