সরকারি হাসপাতালই রোগশয্যায় উত্তরণে কঠোর পদক্ষেপ জরুরি
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোর বর্তমান চিত্র যে ভালো নয়, তা কমবেশি সবাই জানেন। তবে গত শনিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে যা উঠে এসেছে, তা অব্যবস্থাপনা আর প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক বীভৎস চিত্র। ঢাকা মেডিকেল থেকে মুগদা-রাজধানীর চারটি প্রধান হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা দেশের স্বাস্থ্য খাতের ধমনিতে ধরা দীর্ঘদিনের পচনকেই নির্দেশ করে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার রোগীর জন্য কার্যকর কোনো চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থা আদতে গড়ে তোলা হয়নি। কর্তৃপক্ষ মুখে সীমাবদ্ধতার দোহাই দিচ্ছে; কিন্তু তা উত্তরণে কোনো ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়।
এটি অসহায় মানুষের সঙ্গে তামাশা ছাড়া আর কী হতে পারে? যদি কোনো গুরুতর রোগীকে আইসিইউর জন্য ১০ দিন অপেক্ষা করতে হয়, এর মানে দাঁড়ায়- সেই রোগীকে স্রেফ মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। অথচ এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়েই হাসপাতালের আনাচে-কানাচে গজিয়ে উঠেছে দালালদের ‘বেসরকারি চিকিৎসা’ বাণিজ্য। তাছাড়া সরকারি হাসপাতালের মূল ফটকে যখন দখলদারদের পসরায় ‘নিত্যপণ্যের হাট’ বসে এবং মুমূর্ষু রোগীর অ্যাম্বুলেন্স তাদের কারণে আটকে থাকে, তখন এ ব্যবস্থাকে আর যা-ই হোক, সেবা বলা চলে না। বলতে হয়, চিকিৎসার নামে রোগীকে জিম্মি করে সংঘবদ্ধ ও সুসংগঠিত ডাকাতি বাণিজ্য।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই পচনশীল দশা থেকে উত্তরণে আর কতদিন কাগুজে প্রকল্পের বাহানা আমরা দেখব? জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তো বটেই, আমরাও মনে করি, রাষ্ট্রের ধমনিতে প্রবাহিত জনস্বাস্থ্যের এ সংকট নিরসনে এখনই কিছু কঠোর ও অপ্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। রাজধানীর ওপর রোগীদের চাপ কমাতে যেমন- জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে প্রকৃত অর্থেই কার্যকর করতে হবে, তেমনি প্রাথমিক বা সাধারণ সমস্যার রোগীকে কেন ঢাকা অভিমুখে আসতে হচ্ছে, এর কারণ উদ্ঘাটন করে স্থানীয় পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিশ্চিতেও কাজ করতে হবে। অন্যথায় রাজধানীর ওপর এই মানবস্রোত কমানো সম্ভব হবে না। এছাড়া হাসপাতালগুলোয় জনগণের অর্থে কেনা কোটি কোটি টাকার যন্ত্র অকেজো হওয়ার অজুহাতে কারা অসহায় রোগীকে বাইরে চারগুণ টাকা খরচ করাতে বাধ্য করছে- সে রহস্যের জবাব খোঁজাও প্রয়োজন। এই অশুভ যোগসাজশ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মেরামতের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত তো আছেই, প্রতিটি নষ্ট যন্ত্রের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধানকে সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
হাসপাতালের ফটক ও আঙিনাকে দালাল ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার পাশাপাশি যেসব অসাধু ব্যক্তি সিন্ডিকেট বাণিজ্য করছে, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনিক এই সংস্কারগুলো ছাড়া শুধু ভবন বড় করে বা শয্যা বাড়িয়ে স্বাস্থ্য খাতের শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়।
ভুলে গেলে চলবে না, স্বাস্থ্য খাত কোনো মুনাফার ক্ষেত্র নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার। স্বাস্থ্য খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অব্যবস্থাপনা বাসা বেঁধেছে, আজ সময় এসেছে তা শিকড়সহ উপড়ে ফেলার। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা প্রয়োজন-রাষ্ট্রের ধমনিতে যেমন- শৃঙ্খলা দরকার, তেমনই জনগণের জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো উন্নয়নই সার্থক হবে না। সরকার স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে- এটাই প্রত্যাশা।
