ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, বাড়ছে খুনখারাবি আমরা কোন গন্তব্যের দিকে যাচ্ছি

ওসমান গনি
আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, বাড়ছে খুনখারাবি আমরা কোন গন্তব্যের দিকে যাচ্ছি

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো- তার নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের যে সামাজিক চুক্তি থাকে, তার মূল ভিত্তিই হলো রাষ্ট্র ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেবে, আর বিনিময়ে ব্যক্তি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের পাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললে যে হাহাকার আর বীভৎসতার চিত্র ফুটে ওঠে, তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে সেই চুক্তির দেয়ালগুলোতে বড় বড় ফাটল ধরেছে। প্রতিদিনের প্রভাতী আলো আমাদের সামনে নিয়ে আসে হত্যা, গুম, আর রাহাজানির এমন সব পৈশাচিক আখ্যান, যা কেবল একটি সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনকই নয়, বরং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য এক অশনিসংকেত। স্বাধীন দেশের মানুষ কখনও এমন নিরাপত্তাহীনতার চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেনি।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অপরাধের যে উর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা শুধু সংখ্যার হিসেবে নয়, বরং অপরাধের নৃশংসতার দিক থেকেও নজিরবিহীন। গত কয়েক মাসের পরিসংখ্যান এবং সংবাদপত্রের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে এক শিউরে ওঠার মতো চিত্র ফুটে ওঠে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে অপরাধী চক্রগুলো দেশজুড়ে যে তাণ্ডব চালাচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের জনজীবন আজ চরম সংকটাপন্ন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতি শুধু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, শুধু এপ্রিল মাসেই রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ছয়জন। মব সহিংসতায় নিহত ২২ জন এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ২৯৪ জন নারী ও শিশু। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৩৬ জন এবং মব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৯ জন। একই সময়ে অন্তত ৯ নারী ও শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তিন মাসে শুধু রাজধানীতেই ৫৭টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশে প্রায় ৭৫০ থেকে ৭৭০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৫০টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একই বছরের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কিশোর গ্যাং সংঘর্ষ, জমিজমা বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্তত ৮৪০ জন নিহত হয়। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসেও হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়ে গেছে। এসব ঘটনার পেছনে পরিকল্পিত হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

সম্প্রতি সব সময়ে বাংলাদেশের কুমিল্লার হোমনা উপজেলায় স্বামীর সামনে থেকে স্ত্রীকে উঠাইয়া নিয়ে ধর্ষণ, কুমিল্লার চান্দিনায় স্বামীর সামনে থেকে স্ত্রীকে উঠাইয়া নিয়ে ভুট্টা ক্ষেতে ধর্ষণ, গত ৮ মে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় বাবা কর্তৃক ৫ জনকে জবাই করে হত্যা, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আন্দালিব সাদমান রাফি (৯) নামের এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, অনলাইন জুয়ার টাকা নিয়ে শিশুটির বাবার সঙ্গে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। শনিবার (৯ মে) দুপুরে অভিযুক্ত নূর মুহাম্মদ খোকনের বাড়ির স্যানেটারি ল্যাট্রিনের রিং স্ল্যাবের ভেতর থেকে বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়। চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় হাসান রাজু নামে এক যুবককে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয় ১১ বছর বয়সী এক শিশু, যার মাথায় গুলি বিদ্ধ হয়। শিশুটি এখন হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে তালাবদ্ধ ঘর থেকে বর্ষা আক্তার (২০) নামে এক গার্মেন্টস কর্মীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে তার স্বামী পলাতক রয়েছেন।

অন্যদিকে, দেশের মহাসড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি পর্যন্ত সর্বত্র রাহাজানি ও ডাকাতির এক মহোৎসব চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রবাসী বা ব্যবসায়ীদের গাড়ি থামিয়ে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার খবর নিয়মিত শিরোনাম হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের মার্চ মাসের শুরুতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। গত ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি যাত্রীবাহী বাসে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে, যেখানে ডাকাতদের হামলায় দুজন যাত্রী নিহত হন এবং স্বর্ণালঙ্কারসহ বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ লুট হয়। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর ১৯ মার্চ রাজধানীর উত্তরা এলাকায় এক ব্যবসায়ীর গাড়ি থামিয়ে অস্ত্রের মুখে কয়েক কোটি টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সাহসী ও বেপরোয়া। তারা এখন আর অন্ধকার রাতের অপেক্ষা করে না, বরং দিনের আলোতেই প্রশাসনের নাকের ডগায় তাণ্ডব চালাচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই চরম অবনতির পেছনে বেশ কিছু গভীর ও কাঠামোগত কারণ বিদ্যমান। প্রথমত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের অভাব। যখন পুলিশ বা অন্যান্য সংস্থাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তখন অপরাধ দমনের চেয়ে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনই তাদের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়। গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় পুলিশের বড় একটি অংশকে দলীয় ক্যাডারের মতো ব্যবহার করায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বেড়েছে। এর ফলে পেশাদার অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নিজেদের আড়াল করার সুযোগ পায়। দ্বিতীয়ত, বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। একটি মামলার রায় হতে যদি বছরের পর বছর লেগে যায়, তবে ভুক্তভোগী বিচার পাওয়ার আশা হারিয়ে ফেলে এবং অপরাধী নতুন করে অপরাধ করতে উৎসাহিত হয়। ‘আইনের শাসন’ শব্দটি তখন শুধু সংবিধানেই সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না।

সামাজিক অবক্ষয় ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাও এই পরিস্থিতির জন্য কম দায়ী নয়। ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ অপরাধের অন্ধকার জগতে পা বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার। কিশোর গ্যাং কালচার আজ শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও এক বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই কিশোররা যেভাবে খুনাখুনিতে লিপ্ত হচ্ছে, তা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নৈতিক স্খলনের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে মাত্র তিন দিনে চারটি খুনের ঘটনা ঘটেছে, যা আঁতকে ওঠার মতো।

একটি স্বাধীন দেশের মানুষ আশা করে, তারা শান্তিতে ঘুমাতে পারবে এবং নির্ভয়ে কর্মক্ষেত্রে যাতায়াত করতে পারবে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই মৌলিক অধিকারটুকুও আজ বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র যখন অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তখন নাগরিকরা এক ধরনের নৈরাজ্যিক পরিস্থিতির মধ্যে পতিত হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই বেসামাল অবস্থা শুধু মানুষের জীবন হরণ করছে না, বরং দেশের অর্থনীতি ও বিদেশি বিনিয়োগের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কোনো সুস্থ বিনিয়োগকারী এমন একটি দেশে অর্থলগ্নি করতে চায় না যেখানে জানমালের নিরাপত্তা নেই। বিশেষ করে ২০২৫ সালে বেশ কয়েকজন বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী বাংলাদেশে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।

এই পরিস্থিতির উত্তরণ শুধু লিপ সার্ভিস বা কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আমূল সংস্কার। পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি জনবান্ধব ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিটি অপরাধের দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সমাজে এই বার্তা যায় যে অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। একই সঙ্গে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।

ওসমান গনি

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত