ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শিশুর টিফিন, জাতির ভবিষ্যৎ : নিরাপদ খাদ্যের নীরব সংকট

জুবাইয়া বিন্তে কবির
শিশুর টিফিন, জাতির ভবিষ্যৎ : নিরাপদ খাদ্যের নীরব সংকট

প্রতিদিন সকালে বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারের মতো আমার ঘরেও শুরু হয় এক ব্যস্ত অথচ মমতায় ভরা সকাল। স্কুল ইউনিফর্ম পরা আমার এক পুত্র ও দুই কন্যাসন্তান যখন বইভর্তি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বরিশাল শহরের তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পথে বেরিয়ে পড়ে, তখন একজন মা হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় ভাবনা হয়ে ওঠে তাদের টিফিন বক্স। সেখানে আমি শুধু খাবার গুছিয়ে দিই না; তুলে দিই ভালোবাসা, যত্ন আর তাদের সুস্থ ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

প্রতিদিন চেষ্টা করি ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবার দিতে- কখনও ডিম ও সবজির স্যান্ডউইচ, কখনও ফল, খিচুড়ি কিংবা ছোট্ট কোনো ঘরোয়া আয়োজন। কারণ আমি জানি, শিশুর টিফিন শুধু ক্ষুধা নিবারণের বিষয় নয়; এটি তার শারীরিক বৃদ্ধি, মানসিক বিকাশ ও সুস্থ জীবনের ভিত্তি। কিন্তু এই যত্নের মাঝেও এক অদৃশ্য আতঙ্ক আমাকে নাড়া দেয়- আমরা বাজার থেকে যে খাবার কিনছি, তা কতটা নিরাপদ? চকচকে ফল, প্যাকেটজাত খাবার আর বাহারি ফাস্টফুডের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিষাক্ত বাস্তবতা আজ প্রতিটি সচেতন অভিভাবকের হৃদয়ে গভীর উদ্বেগের নাম। তাই ‘সন্তানের টিফিন বক্সে আমরা কী দিচ্ছি?’ এটি শুধু একজন মায়ের প্রশ্ন নয়; এটি একটি প্রজন্মের সুস্থ ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন।

একসময় স্কুলের টিফিন মানেই ছিল মায়ের হাতে বানানো রুটি, ভাজি, ডিম কিংবা মৌসুমি ফল। এখন সেই জায়গা দখল করেছে প্রসেসড খাবার, প্যাকেটজাত চিপস, কৃত্রিম রঙে ভরা পানীয় ও রাসায়নিক মেশানো বেকারি পণ্য। নগরজীবনের ব্যস্ততা, সময় সংকট এবং বাজারকেন্দ্রিক খাদ্যসংস্কৃতি আমাদের ধীরে ধীরে ঘরের রান্না থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ফলে শিশুদের টিফিন আজ জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের স্থূলতা, ডায়াবেটিস, লিভারের সমস্যা ও পুষ্টিহীনতার পেছনে অনিরাপদ খাদ্যাভ্যাস বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিশুরা রঙিন খাবারের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হয়। স্কুলের গেটের সামনে সাজানো থাকে উজ্জ্বল রঙের চিপস, চকোলেট, জেলি, কোমল পানীয় কিংবা ফাস্টফুড। বাহ্যিক চাকচিক্যে আকর্ষণীয় হলেও এসব খাবারের অধিকাংশেই থাকে অতিরিক্ত লবণ, চিনি, ট্রান্সফ্যাট, কৃত্রিম ফ্লেভার ও ক্ষতিকর প্রিজার্ভেটিভ। শিশুরা না বুঝে এসব খাচ্ছে, আর অভিভাবকরা ভাবছেন ‘একদিন খেলে কী হবে?’ অথচ এই ‘একদিন’ই ধীরে ধীরে প্রতিদিনে রূপ নেয়। ক্ষতিকর খাদ্যাভ্যাস কখনও একদিনে শরীর নষ্ট করে না; বরং নীরবে, ধীরে ধীরে ভবিষ্যৎকে দুর্বল করে দেয়। বাংলাদেশে একসময় অপুষ্টি বলতে বোঝানো হতো খাবারের অভাব। এখন অপুষ্টির নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে অতিরিক্ত ক্যালরি কিন্তু প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব। শিশুরা হয়তো পেট ভরে খাচ্ছে; কিন্তু শরীর পাচ্ছে না প্রয়োজনীয় ভিটামিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম বা প্রোটিন। ফলে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, মনোযোগ কমে যাচ্ছে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে। স্কুলপড়ুয়া শিশুদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা, স্থূলতা ও হরমোনজনিত সমস্যাও বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে।

খাদ্যে ভেজাল এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সংকট। ফল পাকাতে কার্বাইড, মাছ ও মাংসে ফরমালিন, সবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক, দুধে ইউরিয়া, বেকারি পণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক সব মিলিয়ে বাজারের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে ভয়াবহ বাস্তবতা। শিশুদের জন্য কেনা খাবার কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্ন এখন প্রতিটি সচেতন অভিভাবকের মনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন রাসায়নিকযুক্ত খাবার খেলে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অতিরিক্ত কৃত্রিম রং ও প্রিজার্ভেটিভ শিশুদের আচরণগত সমস্যাও বাড়াতে পারে। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার শিশুদের মনোযোগ কমিয়ে দেয় এবং শেখার সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমরা সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করাচ্ছি, কোচিং করাচ্ছি, প্রযুক্তি শেখাচ্ছি; অথচ তার প্রতিদিনের খাবার নিয়ে যথেষ্ট সচেতন হচ্ছি না। এটি এক ভয়ংকর বৈপরীত্য। একটি আদর্শ টিফিনে শর্করা, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের ভারসাম্য থাকা জরুরি। শুধু বিস্কুট বা শুধু নুডলস দিয়ে টিফিন পূর্ণ হয় না। একটি ডিম, কিছু ফল, সামান্য সবজি, ঘরে তৈরি স্যান্ডউইচ বা খিচুড়ি এসব শিশুর শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি দিতে পারে। টিফিনের পরিমাণ অল্প হলেও তার গুণগত মান হতে হবে উচ্চমানের।

ঘরে তৈরি খাবারের বিকল্প নেই। কারণ এতে অন্তত পরিবার জানে কী উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। বাইরে কেনা খাবারে কোন তেল ব্যবহৃত হয়েছে, কতদিন আগের উপাদান, কতটা স্বাস্থ্যসম্মত এসব জানা যায় না। অথচ একটি সাধারণ ঘরোয়া খাবার- রুটি ও ডিম, সবজি খিচুড়ি কিংবা ফলের সালাদ একটি শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও পুষ্টিকর টিফিন হতে পারে। শিশুরা প্রতিদিন একই খাবার পছন্দ করে না। তাই টিফিনে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। একদিন স্যান্ডউইচ, অন্যদিন নুডলস, আবার অন্যদিন ফল ও কেক এভাবে মেন্যু বদলালে শিশুর আগ্রহ বাড়ে। খাবার সুন্দরভাবে সাজিয়ে দিলে শিশুর খেতে আগ্রহও বৃদ্ধি পায়। টিফিন যেন শিশুর কাছে আনন্দের বিষয় হয়, বাধ্যবাধকতা নয়।

প্লাস্টিকের টিফিন বক্স কতটা নিরাপদ? অনেক পরিবার এখনও নিম্নমানের প্লাস্টিকের টিফিন বক্স ব্যবহার করে। গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে রাখলে ক্ষতিকর রাসায়নিক খাবারের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা তাই স্টিল, কাঁচ বা ফুড-গ্রেড নিরাপদ কনটেইনার ব্যবহারের পরামর্শ দেন। শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিফিন বক্স নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক শিশু টিফিনে কোমল পানীয় বা প্যাকেটজাত জুস নিয়ে যায়। এসব পানীয়তে অতিরিক্ত চিনি ও কৃত্রিম উপাদান থাকে। এর পরিবর্তে বিশুদ্ধ পানি, লেবুর শরবত, ডাবের পানি কিংবা ঘরে তৈরি ফলের রস দেওয়া যেতে পারে। শিশুদের পর্যাপ্ত পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি।

ফাস্টফুডের প্রতি আসক্তি কেন বাড়ছে? বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে ফাস্টফুডের প্রতি প্রবল আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বন্ধুদের প্রভাব এবং পরিবারের অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। শিশুরা যা দেখে, তাই শিখে। পরিবার যদি নিয়মিত বাইরের খাবারে অভ্যস্ত হয়, তবে শিশুও সেই অভ্যাস গড়ে তোলে। তাই খাদ্যসংস্কৃতির পরিবর্তন শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই। একজন সচেতন মা-বাবা চাইলে অনেক পরিবর্তন আনতে পারেন। বাজার থেকে খাবার কেনার আগে উৎপাদনের তারিখ, উপাদান, মেয়াদ ও মান যাচাই করা প্রয়োজন। শিশুরা কেন কোনো খাবার খেতে চায়, সেটিও বোঝা জরুরি। সন্তানকে বকাঝকা না করে খাবারের উপকারিতা বোঝাতে হবে। শিশুদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক গড়ে তুললে তারা স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আগ্রহী হয়। শুধু পরিবার নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও এ বিষয়ে দায়িত্ব নিতে হবে। স্কুল ক্যানটিনে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করা, ক্ষতিকর জাঙ্কফুড বিক্রি বন্ধ করা এবং শিশুদের খাদ্য সচেতনতা শেখানো জরুরি। অভিভাবক সভাগুলোতেও নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হওয়া উচিত। আইন আছে, প্রয়োগ কোথায়? বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল রোধে নানা আইন রয়েছে। কিন্তু আইনের কার্যকর প্রয়োগ না থাকলে সেই আইন কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। ভেজালবিরোধী অভিযান মাঝেমধ্যে দেখা গেলেও তা ধারাবাহিক নয়। অসাধু ব্যবসায়ীরা জানে, শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে কঠোর নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জরুরি।

অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করেন দ্রুত ফলন ও বেশি লাভের আশায়। ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, বাজারের প্রতিযোগিতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের চাপে তারা অনেক সময় অনিরাপদ পদ্ধতি বেছে নেন। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কৃষকদেরও প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রয়োজন। শহুরে জীবনে এখন ছাদবাগান আর শখের বিষয় নয়; এটি নিরাপদ খাদ্যের বিকল্প উৎস হয়ে উঠছে। অল্প জায়গায় টমেটো, লাউ, মরিচ, পুঁইশাক কিংবা ধনেপাতা চাষ করা সম্ভব। শিশুদের এসব চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত করলে তারা প্রকৃতি ও স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আগ্রহী হয়। শুধু পুষ্টি নয়, টিফিনে শিশুর আবেগও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর পছন্দণ্ডঅপছন্দকে সম্মান করতে হবে। জোর করে খাবার চাপিয়ে দিলে তারা খাবারের প্রতি বিরূপ হয়ে উঠতে পারে। টিফিনের খাবার এমন হওয়া উচিত, যা শিশুকে আনন্দ দেয়, তৃপ্তি দেয় এবং একই সঙ্গে পুষ্টিও নিশ্চিত করে। আজকের শিশুরাই আগামী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু যদি তাদের প্রতিদিনের খাবারই অনিরাপদ হয়, তবে আমরা কেমন ভবিষ্যৎ তৈরি করছি? ক্যান্সার, কিডনি রোগ, হরমোনজনিত সমস্যা কিংবা মানসিক বিকাশের প্রতিবন্ধকতা এসব শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়; এটি একটি জাতীয় সংকট। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা মানে একটি সুস্থ জাতি গড়ে তোলা।

পরিশেষে, দিনের শেষে যখন আমার তিনটি সন্তান স্কুল থেকে ফিরে টিফিন বক্স খুলে দেখায় কখনো খালি, কখনও অর্ধেক ভরা তখন আমি শুধু একজন মা হিসেবে তাদের খাওয়ার পরিমাণ দেখি না; আমি দেখতে চেষ্টা করি তাদের সুস্থ ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। আমরা হয়তো সন্তানদের জন্য ভালো পোশাক, ভালো স্কুল, আধুনিক প্রযুক্তি ও সুন্দর জীবন নিশ্চিত করতে চাই; কিন্তু যদি তাদের প্রতিদিনের খাবারই নিরাপদ না হয়, তাহলে আমাদের সব আয়োজনই একসময় অর্থহীন হয়ে পড়বে। খাদ্যে ভেজাল, কৃত্রিমতা ও অনিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা আজ নিঃশব্দে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শুধু সরকারের আইন বা অভিযানের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, কৃষক ও ভোক্তা সবাইকে একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে। বিশেষ করে মা-বাবাদের আরও সচেতন হতে হবে সন্তানের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে। কারণ শিশুর সুস্থতা শুরু হয় ঘরের রান্নাঘর থেকেই।

আমি বিশ্বাস করি, সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং সামান্য যত্নই পারে একটি প্রজন্মকে নিরাপদ রাখতে। আমাদের সন্তানদের টিফিন বক্সে শুধু খাবার নয়, নিরাপদ ভবিষ্যৎ, সুস্থ জীবন এবং ভালোবাসাভরা একটি আগামী তুলে দিতে হবে। কারণ আজকের শিশুরাই আগামী বাংলাদেশের স্বপ্ন, শক্তি ও সম্ভাবনা। তাদের সুস্থ রাখার দায় আমাদের সবার।

জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত