জ্বালানি সংকটের ভারে অতিষ্ঠ জনজীবন
মো. সবুজ মিয়া
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি শুধু একটি পণ্য নয়; এটি ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিটি উত্তেজনা, কূটনৈতিক সংঘাত এবং সামরিক হস্তক্ষেপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে আঘাত হানে জ্বালানির বাজারে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরানকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আবারও বিশ্ব জ্বালানির বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। এই অস্থিরতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর উপর।
বযুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরান যুদ্ধের একপর্যায়ে হামলা পাল্টা হামলার জেরে একসময় ইরানের আইআরজিসি কর্তৃক নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালীতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ফলে অনেকটা অচল হয়ে পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম পথ হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ বা এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এটি পারস্য উপসাগরে যাওয়ার একমাত্র সামুদ্রিক প্রবেশপথ। যার এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। প্রণালীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে জ্বালানী সরবরাহ বিঘ্ন ঘটায় দেশের বাজারে জ্বালানী সংকট তীব্র হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশে প্রতিদিনের গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে স্থানীয় উৎপাদন ও এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ প্রায় ২৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। জ্বালানী তেলের দৈনিক চাহিদা ১২-১৩ হাজার মেট্রিক টন। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানির পুরোটা আসে হরমুজ প্রণালী হয়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এ ছাড়া দেশের গ্যাস চাহিদার ৩৫ শতাংশ পূরণ করে আমদানি করা এলএনজি, যার বেশির ভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের ভাষ্যমতে নিয়মিত তেল আসছে। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। সরকার জ্বালানী সংকটের কথা স্বীকার না করলেও তার হদিস মেলে পেট্রোল পাম্পগুলোতে। ভোর থেকে মাঝরাত পর্যন্ত পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারি লেগে থাকে একফোঁটা জ্বালানী তেলের জন্য। এই সুযোগে একদল অসাধু চক্র অবৈধ জ্বালানী তেল মজুত করে খোলা বাজারে চড়া দামে বিক্রি করে। জ্বালানী সরবরাহ সংকটে চট্টগ্রামে অবস্থিত দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ERL) বন্ধ হয়ে গেছে।
জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকার শপিং মল-মার্কেট সন্ধ্যার পর বন্ধ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু তাতেও সুরাহা মেলেনি। এই সপ্তাহে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানী তেলের দাম লিটার প্রতি ১৫-২০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০, অকটেন ১৪০ ও পেট্রোল ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরইমধ্যে জ্বালানী দাম বৃদ্ধির অজুহাতে বাস ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ১১ পয়সা করে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া গুণতে হচ্ছে।
জ্বালানী তেলের সংকটে কৃষিজ উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। ডিজেল তেলের অভাবে জমিতে কৃত্রিমভাবে পানি সেচ ব্যাহত হচ্ছে। অনেক জায়গায় পানির অভাবে ধান শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর বেড়েছে এলপিজির দাম। ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বেড়ে এখন ১৯৪০ টাকা হলেও বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২২০০/২৩০০ টাকায়। একই সঙ্গে বেড়েছে মিটারপ্রতি বিদ্যুতের দাম। জ্বালানি সংকটে দেশজুড়ে চলছে বিদ্যুতের লুকুচুরি খেলা। প্রতিদিন ৮-১০ ঘন্টা নিয়ম করে লোডশেডিং হচ্ছে। গ্রাম কখনও সখনো সেটা ১২-১৬ ঘন্টায়ও ছুঁয়ে ফেলছে। ফলে প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎবিহীন জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পখাতেও জ্বালানী সংকট ও লোডশেডিং এর ফলে উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জরুরী সেবায়ও এর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম। মূল্যস্ফীতির বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে দরিদ্র-নিম্ন মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের উপর।
চলমান জ্বালানী সংকট উত্তরণের লক্ষ্যে বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে হবে। একটি দেশ বা অঞ্চল নির্ভর না হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বাহিরে রাশিয়া, নাইজেরিয়া, মালেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা অন্য দেশে থেকে জ্বালানি আমদানি করার চেষ্টা করতে হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলার লক্ষ্যে দেশের সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি বা আইইএ-এর মতানুসারে, ন্যূনতম ৯০ দিনের তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা থাকাকে নিরাপদ মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে আমাদের মজুত মাত্র ৩৫ থেকে ৪৫ দিনের। ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে অবিলম্বে জ্বালানি মজুত ও সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
জ্বালানি তেল সংকট সমাধানে বাংলাদেশকে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, ও সুষম মূল্যনির্ধারণী নীতি গ্রহণ করতে হবে।
পুরোনো যেসব কূপের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে বা কমে গেছে, সেগুলো দ্রুত ওয়ার্কওভার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুনরায় চালু করতে হবে। একই সঙ্গে স্থল, পাহাড়ি অঞ্চল বা সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক। রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাপেক্সকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশীয় উত্তোলন সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে হবে। জ্বালানি তেলের বিকল্প হিসেবে কয়লা ব্যবহার করা যেতে পারে। সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রসার ঘটিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত মূল্য সমন্বয় এবং অবৈধ তেল মজুতকারী ও কালোবাজারি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহার এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (AC) ব্যবহার সীমিত করার অভ্যাস গড়তে হবে।
মো. সবুজ মিয়া
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
