প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৩ মে, ২০২৬
একটি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন। আর সেই অর্থের জোগান আসে কর, শুল্ক, ভ্যাট বৃদ্ধির মাধ্যমে। রাষ্ট্রের মধ্য যখন অর্থের সংকট সৃষ্টি হয় তখন সরকার করহার বৃদ্ধির মাধ্যমে সেই চাহিদা পূরণ করে। প্রাচীনকাল থেকেই এই নিয়মে দেশ পরিচালিত হয়ে আসছে। আবার কর কাঠামোর ভেতরে যদি ফাঁকফোকর, অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতি থেকে যায়। সেক্ষেত্রে শুধু করহার বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব নয়। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় বৃদ্ধি পায়, পণ্যের দাম বাড়ে, জনজীবন সংকটে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। এ ধরনের সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। কারণ ব্যবসায়ী যখন বাড়তি কর দেন, তখন সেই করের বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই চাপানো হয়। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ সবকিছুর দাম বাড়ে। জনজীবনে মূল্যস্ফীতি বাড়লে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় এবং জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। সরকারের এ জাতীয় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না থাকলে কর বাড়ানো মানে হলো দুর্নীতির পরিমাণও বাড়ানো। কারণ করের হার যত বাড়বে, কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতাও তত বাড়বে। মানুষ তখন বৈধ পথে নয়, অবৈধ পথ খুঁজবে। ফলে কর প্রশাসনের ভেতরে ঘুষের পরিমাণও বৃদ্ধি পেতে পারে। এভাবে কর বাড়ানো একধরনের দুষ্টচক্র তৈরি করে। সরকারের যদি অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয় তবে ট্যাক্স না বাড়িয়েও রাজস্ব আদায় করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে সরকার যদি ঘুষ-দুর্নীতি হ্রাস করতে পারে তবে এমনিতেই রাজস্ব বৃদ্ধি পায়। দেশের সবগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির আখড়াই পরিণত হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও কর ফাঁকি বন্ধ করা গেলে দেশে রাজস্ব আয় তিনগুণ বৃদ্ধি পেত।
কর ফাঁকি ও অস্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার কারণে সরকার বছরে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব হারাচ্ছে। আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থায় একটি বড় সমস্যা হলো কর ফাঁকি ও প্রশাসনিক অনিয়ম। অতীতে বড় বড় শিল্পগ্রুপগুলো এমপি-মন্ত্রীদের ব্যবহার করে হাজার হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকি দিয়েছেন।
অনেক সময় দেখা যায়, নির্ধারিত করের তুলনায় কম দেখিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা হয়; আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর আদায়কারী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে প্রকৃত হিসাব গোপন রাখা হয়। এতে রাষ্ট্র তার প্রাপ্য আয় থেকে বঞ্চিত হয়। অর্থাৎ সমস্যা করের হারে নয়; সমস্যা কর আদায়ের প্রক্রিয়ায়। ঘুষ একটি অদৃশ্য করের মতো কাজ করে। এটি সরকারি কোষাগারে জমা হয় না, বরং ব্যক্তিগত পকেটে যায়। যখন একজন ব্যবসায়ী ঘুষ দিয়ে কম কর পরিশোধের সুযোগ পান, তখন রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার সৎ ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হন, কারণ তিনি নিয়ম মেনে কর দেন; কিন্তু অসৎ ব্যবসায়ী কম খরচে ব্যবসা চালিয়ে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যান। এতে বাজারব্যবস্থায় অসমতা সৃষ্টি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
দীর্ঘদিন যাবৎ প্রকৃত আয় কম দেখিয়ে ব্যক্তি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কর ফাঁকি দিচ্ছে। কর ফাঁকির মাধ্যম হিসেবে আয় গোপন করা, ভুয়া ভ্যাট চালান ব্যবহার করা এবং সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য গোপন করা, আন্ডার ও ওভার ইনভয়েস, নির্ধারিত কম দামি পণ্যের আড়ালে বেশি দামি পণ্য আমদানি করে কম শুল্ক প্রদান করা। বিগত সরকারের সময়ে কর ফাঁকিতে সবার ছেয়ে এগিয়ে ছিল শিল্পপতি ও রাজনীতিবিদরা। সংসদ সদস্যরা নির্বাচনি হলফনামায় যে সম্পদের তথ্য প্রদান করেন বাস্তবে দেখা যায় তার সম্পদ আর কয়েকগুণ বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমপি-মন্ত্রীদের ছেয়ে তাদের স্ত্রী-সন্তানদের সম্পদের পরিমাণ অতিরিক্ত বেশি। নির্বাচনি হলফনামা এবং এনবিআরের কাছে জবাবদিহিতার ভয়ে তারা নিজের নামে সম্পত্তি ক্রয় না করে তাদের স্ত্রী-সন্তানদের নামে অধিক সম্পত্তি ক্রয় করেন।
বাংলাদেশে রাজস্ব সংগ্রহে আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে বড় ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের কর অব্যহতি প্রদান। ব্যবসায়ীদের কর অব্যহতি প্রদানের কারণে মানুষ ক্রমেই হাড়িয়ে ফেলছে তার মনুষ্যত্বের গুণাবলী। সে ন্যায়-অন্যায়ের ধার ধারে না। প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় কর্তাদের বস করে কর-শুল্ক মাফ করে নিচ্ছে।
এতে করে রাষ্ট্র রাজস্ব আয় হতে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনে দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। গবেষণা সংস্থা সিপিডির মতে, কর ফাঁকি ছাড়াও প্রণোদনা ও কর ছাড়ের কারণে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণে রাজস্ব হারাচ্ছে। বিনিয়োগের কথা বলে বিভিন্ন খাতভিত্তিক কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত যে ব্যবসায়ীরা সরকারি প্রণোদনা পাওয়ার যোগ্য দুর্নীতি ও সরকারি নজরদারির অভাবে তারা তা পায় না। রাজনৈতিক দলের নেতারা অবৈধভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই সুবিধা লুফে নেয়। এগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করা উচিত। প্রণোদনা বা কর ছাড় বিনিয়োগের ভিত্তি হতে পারে না। বাংলাদেশের এনবিআর এর অধীন রাজস্ব আহরণের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালে দেখা যায় বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের মাধ্যমে কর কম আদায় করা হয়। দুর্নীতিতে জড়িয়ে অনৈতিক ফায়দার মাধ্যমে সরকারকে ফাঁকি দিয়ে নিজেরা কোটি টাকা আয় করছেন। কিন্তু এই ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ হলে এবং যথাযথ রাজস্ব আদায় হলে এমনিতেই সরকারের আয় বাড়বে। শুধু এসব দপ্তরই নয়, সরকারি যেকোনো দপ্তরেই কমবেশি ঘুষ বাণিজ্যের ফলে সরকারি অর্থ তছরুপ করার ঘটনা ঘটছে। ফলে দেশের অর্থনীতি আরও সচল করতে ট্যাক্স বৃদ্ধি নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সততা। সংশ্লিষ্টরা সৎ হলে অর্জিত রাজস্ব খরচ করে শেষ করাটাই কষ্টসাধ্য হবে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে করের পরিধি এখনও তুলনামূলক সীমিত। অনেক সম্ভাবনাময় খাত এখনও করের আওতার বাইরে। কিন্তু এই খাতগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিবর্তে যদি বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ দেওয়া হয়, তবে তা ন্যায্যতা হারায়। সুতরাং নতুন করে করহার বৃদ্ধি করলে স্বল্পমেয়াদে কিছু রাজস্ব বাড়তে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিকে দুর্বল করতে পারে। উচ্চ কর ব্যবসায় বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে, উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত করে। মূল্যস্ফীতির বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কর বাড়ালে পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ে। উৎপাদক সেই বাড়তি খরচ ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেন। ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে হিমশিম খায়। সামাজিক অসন্তোষ বাড়ে। সরকারের জনপ্রিয়তা কমে। রাজনৈতিক অস্থিরতাও তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ কর বৃদ্ধির প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে ধনী ও শিল্পপতিদের কর ফাঁকি এবং অন্যায্য কর মওকুফ বন্ধ করে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা বর্তমানে একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়।
বিগত সময়ে দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বার বার কর মওকুফ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে ৮৭ শতাংশের বেশি ধনী ও উচ্চবিত্ত কর ফাঁকি দিচ্ছে বলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমিতি (BEA) জানিয়েছে। ২০২৩ সালে সিপিপিডির (CPD) তথ্য অনুযায়ী, কর ফাঁকি ও অবহেলার কারণে সরকার বার্ষিক প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। এর মধ্যে করপোরেট কর ফাঁকির পরিমাণই অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১১ সালের পর থেকে দেশে কর ফাঁকি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ২০১২ সালে কর ফাঁকির পরিমাণ ছিল ৯৬ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা, ২০১৫ সালে যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকায়। সিপিডির গবেষণায় আরও বলা হয়, উচ্চ করহার, দুর্বল নজরদারি, জটিল আইন-কানুন ও কর ব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতি কর ফাঁকির মূল কারণ। দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষ করযোগ্য আয় করার পরও আয়কর দেন না। অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কর দেওয়ার যোগ্য হওয়ার পরও কর দেয় না। বিপুল পরিমাণ কর আওতার বাইরে থেকে যাওয়া কর জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি না হওয়ার বড় কারণ। কর ফাঁকি ছাড়াও প্রণোদনা ও কর ছাড়ের কারণে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণে রাজস্ব হারাচ্ছে। বিনিয়োগের কথা বলে বিভিন্ন খাতভিত্তিক কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করা উচিত। প্রণোদনা বা কর ছাড় বিনিয়োগের ভিত্তি হতে পারে না। বাংলাদেশের প্রণোদনা কাঠামো পরিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় তৈরি।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে যে, ব্যবসায়ী ও উৎপাদক শ্রেণি হচ্ছে অর্থনীতির মূলচালিকা শক্তি। সেই চালিকাশক্তিকে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে দিয়ে অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের সুশাসনের অভাবে এটি তৈরি হয়েছে। যদি সুষ্ঠু ধারার মাধ্যমে কর-শুল্ক আহরণ করা হয়, তাহলে অর্থনৈতিক সমীকরণ পাল্টে যাবে। অন্যান্য দেশের মতো এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।
যদি সরকার কর-শুল্ক ইস্যুতে শক্ত অবস্থান নিতে পারে, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি এবং রাজস্ব আয় বাড়বে বহুগুণে। এনবিআর রাজস্ব আদায় বাড়াতে কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধারে কাজ করতে হবে।
অতএব, নীতিনির্ধারকদের উচিত রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল পুনর্বিবেচনা করা। কর বাড়ানো নয়, বরং ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হতে পারে টেকসই সমাধান। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে কর ফাঁকির বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার হওয়া জরুরি।
মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট