নারী সাংবাদিকতা : অধিকার, নিরাপত্তা ও সমতার নতুন দিগন্তের সন্ধানে
এম সফিউল আজম চৌধুরী
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের গণমাধ্যম গত দুই দশকে এক বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর সংবাদ মাধ্যমের প্রসারের এই মিছিলে নারীরা শুধু দর্শক হয়ে থাকেনি, বরং সংবাদ ঘরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে। তবে এই অগ্রযাত্রার পথটি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। একদিকে যেমন সাফল্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, অন্যদিকে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং কাঠামোগত বৈষম্য নারী সাংবাদিকদের পথচলাকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। ১৯৪৭ সালে বেগম সুফিয়া কামালের ‘বেগম’ পত্রিকা থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বর্তমানে টেলিভিশন ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে নারীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে কয়েক হাজার নারী সক্রিয়ভাবে সাংবাদিকতায় যুক্ত থাকলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অর্থাৎ সম্পাদক বা বার্তা প্রধানের চেয়ারে নারীর উপস্থিতি এখনও ৫ শতাংশের নিচে, যা একটি গভীর কাঠামোগত অসমতারই প্রতিচ্ছবি। বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য সূচক (Gender Gap Index) অনুযায়ী, সংবাদমাধ্যমের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অনুপস্থিতি শুধু লৈঙ্গিক বৈষম্য নয়, বরং তথ্যের বহুত্ববাদকেও বাধাগ্রস্ত করছে।
সাংবাদিকতায় নারীর অগ্রযাত্রা ও বাস্তব বাধাগুলো নিয়ে ‘দি ডেইলি এক্সপ্রেস’ এর রিপোর্টার আলিমা আফরোজ লিমা অত্যন্ত জোরালো ও বাস্তবধর্মী চিত্র তুলে ধরেছেন। তার ভাষ্যে সাংবাদিকতায় নারীর প্রধান বাধাগুলো ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত- এই তিন স্তরে বিভক্ত। আলিমা আফরোজ লিমা জানান, ‘সাংবাদিকতায় নারীরা অনেক এগিয়ে গেলেও এখনও নানা ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হয়। মাঠ পর্যায়ে রিপোর্টিং করতে গিয়ে অনেক নারী সাংবাদিককে মৌখিক হয়রানি, অনলাইন ট্রল, কটূক্তি কিংবা শারীরিক নিরাপত্তার ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক বা অপরাধবিষয়ক রিপোর্টিংয়ে এই ঝুঁকি বেশি থাকে। অনেক কর্মক্ষেত্রে নারী সাংবাদিকদের পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিট বা দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্য দেখা যায়। ডিজিটাল যুগে নারী সাংবাদিকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ, ভুয়া তথ্য ছড়ানো বা অপমানজনক মন্তব্যের শিকার হতে হয়। সাংবাদিকতায় নির্দিষ্ট সময় নেই। রাতের ডিউটি, হঠাৎ অ্যাসাইনমেন্ট বা দূরে গিয়ে কাজ করার কারণে পরিবার ও পেশার মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া রাতের বেলায় কাজ করাটাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। এমনকি অনেক সময় প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্যও পাওয়া যায় না।’ এই বক্তব্যটি বর্তমান সময়ের নারী সাংবাদিকদের প্রতিদিনের সংগ্রামের এক প্রামাণ্য দলিল। লিমার পেশাগত জীবনে এমন এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা রয়েছে যা রাষ্ট্রের সুরক্ষা ব্যবস্থার রুগ্ন চিত্রকে উন্মোচিত করে। তিনি জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় রাত ২:৪৫ মিনিটে দায়িত্ব পালন শেষে নিরব সড়কে একা দাঁড়িয়ে তিনি সিএনজির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৩-৪ জন সদস্য দাঁড়িয়ে থাকলেও এবং আশপাশে ৪-৫টি কুকুরের ভয়ংকর উপস্থিতিতে লিমার ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থা দেখেও তারা কোনো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি। হাতের ভারী ব্যাগ আর চারপাশের প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে প্রশাসনের এই নির্লিপ্ততা প্রমাণ করে যে, নারী সাংবাদিকদের জন্য রাষ্ট্রের ‘প্রটেকশন মেকানিজম’ কতটা দুর্বল। লিমার আরেকটি অভিজ্ঞতা বলে যে, বড় কোনো সমাবেশে বা মাঠে রিপোর্ট করতে গেলে প্রায়ই তাদের শুনতে হয়, ‘কেন এখানে আসছেন? আপনাদের কি কোনো ছেলে রিপোর্টার নেই? তাকে পাঠাতো, আপনাকে কেন পাঠিয়েছে?’ এই জেন্ডার-বৈষম্যমূলক মানসিকতা শুধু সাধারণ মানুষের নয়, অনেক সময় পেশাদার পরিবেশেও দেখা যায়। সমাজে এখনও ধারণা বিদ্যমান যে সাংবাদিকতা নারীদের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ পেশা, যার ফলে পরিবার ও সমাজ থেকে তাদের প্রতিনিয়ত নিরুৎসাহিত করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো এবং নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে একটি আলাদা সুরক্ষা ব্যবস্থা সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের সংবিধান ও মানবাধিকারের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংবিধানের ২৭, ২৮(১) ও ২৯ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্য সমান অধিকার ও চাকরির সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে একজন নারী সাংবাদিক যখন গভীর রাতে দায়িত্ব পালনকালে নিরাপত্তা পান না, তখন তা সরাসরি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২-এ বর্ণিত ‘জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার’ লঙ্ঘনের শামিল। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা (UDHR) এবং সিডও (CEDAW) সনদে নারীর কাজের অধিকার ও বৈষম্যমুক্ত পরিবেশের যে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে তার পূর্ণ প্রতিফলন এখনও অনুপস্থিত। শ্রম আইন-২০০৬ এবং ২০০৯ সালে মহামান্য হাইকোর্ট প্রদত্ত যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নির্দেশিকা থাকলেও অধিকাংশ নিউজরুমে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নারীদের লড়াই আরও বহুমাত্রিক। সেখানে যাতায়াত সমস্যার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও সামাজিক রক্ষণশীলতা অনেক মেধাবী নারীকে পেশা ত্যাগ করতে বাধ্য করে।
এই বহুমুখী সংকট নিরসনে সরকারের ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা অনস্বীকার্য। সরকারের পক্ষ থেকে নারী সাংবাদিকদের জন্য একটি সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা এখন ঐতিহাসিক প্রয়োজন। আলিমা আফরোজ লিমার প্রস্তাবনা অনুযায়ী, প্রশাসনের মানসিকতা পরিবর্তন এবং সর্বক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারের উচিত প্রস্তাবিত ‘গণমাধ্যম কর্মী আইন’-এ নারী সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা স্কিম, ঝুঁকি ভাতা, সমকাজে সমমজুরি এবং বাধ্যতামূলক যাতায়াত ও ডে-কেয়ার সুবিধার আইনি নিশ্চয়তা প্রদান করা। সাইবার বুলিং ও ডিজিটাল ভায়োলেন্স রোধে সাইবার নিরাপত্তা আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো নারী সাংবাদিক তার কাজের জন্য অনলাইনে অপদস্থ হতে না হয়। এছাড়া তথ্য মন্ত্রণালয় ও সংবাদপত্রের মালিকপক্ষকে (NOAB) সম্মিলিতভাবে নিউজ ওম্যানদের জন্য নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর ফেলোশিপের ব্যবস্থা করতে হবে।
বলা যায়, বাংলাদেশের নারী সাংবাদিকতা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা যদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই, তবে সাংবাদিকতায় লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করা ছাড়া তা অসম্ভব।
আলিমা আফরোজ লিমার মতো অগণিত সাহসী নারী যখন সব বাধা ডিঙিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়ে সত্য প্রকাশে অবিচল থাকেন, তখন বুঝতে হবে সমাজ বদলাচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজকে তাদের পাশে শক্তিশালী ঢাল হিসেবে দাঁড়াতে হবে।
আইনি সুরক্ষা, সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত স্বীকৃতির মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন এবং নারী বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেই দেশে প্রকৃত মুক্ত গণমাধ্যম এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। সমতার এই সংগ্রাম শুধু নারীদের নয়, এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অপরিহার্য অংশ।
এম সফিউল আজম চৌধুরী
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, চট্টগ্রাম
