তরুণ প্রজন্ম ঝুঁকিতে ই-সিগারেট নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তের সংকট

জুবাইয়া বিন্তে কবির

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিক প্রযুক্তির ঝলমলে আবরণে আজ এক নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট বিশ্বজুড়ে ছায়া ফেলেছে ই-সিগারেট, ভেপ ও হিটেড টোব্যাকো তারই নতুন রূপ। ‘কম ক্ষতিকর’, ‘ফ্যাশনেবল’ কিংবা ‘স্মার্ট লাইফস্টাইল’ এর মোহময় প্রচারণায় বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে নিকোটিন আসক্তির দিকে অজান্তেই পা বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশেও ২০১০-এর দশকের শেষভাগ থেকে অনলাইন ও সীমিত আমদানির মাধ্যমে প্রবেশ করা এসব পণ্য দ্রুতই অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার লাভ করে, যা অভিভাবক, চিকিৎসক ও নীতিনির্ধারকদের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে এগুলো কোনোভাবেই নিরাপদ বিকল্প নয়; বরং নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিকোটিন নির্ভরতা ছড়িয়ে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত মাধ্যম। একজন মা হিসেবে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার যে উদ্বেগ, একজন গবেষক হিসেবে তথ্যের যে সতর্কতা, আর একজন নাগরিক হিসেবে দায়িত্ববোধ সব মিলিয়ে এই বাস্তবতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। কৈশোরের কৌতূহল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং আধুনিকতার ভ্রান্ত মোহ আজ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের এক নীরব বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইতিহাস একদিন সিগারেটকে আধুনিকতার প্রতীক ভেবেছিল, পরে বিশ্ব বুঝেছে সেটি ছিল ভয়াবহ প্রতারণা; আজ সেই একই বিপদ নতুন প্রযুক্তির মুখোশে ফিরে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে ই-সিগারেটের প্রবেশ, বিস্তার ও নীতিগত আলোচনার পাশাপাশি এর সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব বিশ্লেষণ এখন সময়ের দাবি।

ই-সিগারেট মূলত ব্যাটারিচালিত একটি ডিভাইস, যা তরল নিকোটিনকে গরম করে বাষ্পে পরিণত করে এবং ব্যবহারকারী সেই বাষ্প ফুসফুসে টেনে নেয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ভ্যাপিং’। ২০০৩ সালে চীনের ফার্মাসিস্ট হোন লিক প্রথম আধুনিক ই-সিগারেট তৈরি করেন। উদ্দেশ্য ছিল ধূমপায়ীদের জন্য অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর বিকল্প তৈরি করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ধূমপান ত্যাগের মাধ্যমের চেয়ে নতুন প্রজন্মের নেশায় পরিণত হয়েছে। শুরুতে এটি ছিল সীমিত বাজারের একটি পণ্য, কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো এটিকে বিশাল ব্যবসায় রূপ দেয়। নানা রঙ, ডিজাইন ও ফলের স্বাদযুক্ত ফ্লেভার যুক্ত করে এটিকে তরুণদের কাছে ‘ফ্যাশনেবল’ করে তোলা হয়। ফলাফল যারা কখনও ধূমপান করেনি, তারাও কৌতূহল থেকে ভ্যাপিং শুরু করেছে।

বাংলাদেশে ই-সিগারেট বা ভেপিং পণ্য ২০১০ সালের শেষভাগে অনলাইন ও সীমিত আমদানির মাধ্যমে বাজারে প্রবেশ করে, কিন্তু তখন কোনো পৃথক আইনগত কাঠামো না থাকায় এটি অনিয়ন্ত্রিতভাবে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। তরুণদের মধ্যে ‘নিরাপদ বিকল্প’ ধারণা ও আকর্ষণীয় বিপণনের কারণে ব্যবহার বাড়লেও, চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকেই এর নিকোটিন আসক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বিষয়ে সতর্ক করেন। পরবর্তীতে ২০২১ সালের পর সরকার এ খাতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে এবং ২০২২ সালে ই-সিগারেট, ভেপ ও অন্যান্য ইমার্জিং টোব্যাকো পণ্য নিষিদ্ধের প্রস্তাবের মাধ্যমে কঠোর নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করে, যার ফলে আমদানি, বিপণন ও বিক্রির ওপর কার্যত নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ই-সিগারেট নীতিতে নতুন করে আলোচনার সূচনা হয়েছে, যেখানে কিছু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পূর্বের কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ সামনে এসেছে। সংসদীয় ও প্রশাসনিক পর্যায়ে সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশের খসড়ায় পূর্বের নিষেধাজ্ঞা ধারা পুনর্গঠন বা পরিবর্তনের আলোচনা চলছে বলে জানা যায়। তবে এখনও পর্যন্ত এটি চূড়ান্ত আইন হিসেবে কার্যকর হয়নি; বরং এটি নীতিগত প্রক্রিয়া ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। ফলে একদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, অন্যদিকে নীতিগতভাবে বিষয়টি এখনও সিদ্ধান্তাধীন অবস্থায় রয়েছে যা ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

দেশে ই-সিগারেটের বেচাকেনার ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জনস্বাস্থ্যসচেতন মানুষকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। এমন এক সময়ে এই সিদ্ধান্ত এসেছে, যখন বিশ্বজুড়ে বহু দেশ ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণ কিংবা নিষিদ্ধ করার পথে হাঁটছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে আমরা কি জনস্বাস্থ্য রক্ষার পরিবর্তে কর্পোরেট মুনাফার কাছে নত হচ্ছি?

ই-সিগারেটকে প্রচলিত সিগারেটের ‘নিরাপদ বিকল্প’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নিকোটিনযুক্ত ই-সিগারেট আসক্তিকর এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি পুরোপুরি নির্ণীত না হলেও এতটুকু নিশ্চিত যে, এর ভেতরে থাকা রাসায়নিক উপাদান মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ই-সিগারেটের বিপণন কৌশল। আকর্ষণীয় রঙ, ফলের ফ্লেভার, চকচকে ডিজাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গোপন প্রচারণা সবকিছুই মূলত তরুণদের টার্গেট করে সাজানো। যারা কখনও ধূমপান করেনি, তারাও কৌতূহল থেকে ভ্যাপিং শুরু করছে। এ যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পরিকল্পিতভাবে নিকোটিনের আসক্তির দিকে ঠেলে দেওয়া।

ই-সিগারেটের জনপ্রিয়তার পেছনে মনস্তাত্ত্বিক ও বিপণন দুই ধরনের কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি সাধারণ সিগারেটের মতো দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে না। দ্বিতীয়ত, ফল, চকলেট, ভ্যানিলা, বাবলগাম কিংবা মিন্টের মতো ফ্লেভার তরুণদের কাছে এটিকে আকর্ষণীয় করে তোলে। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটিকে আধুনিক জীবনধারার অংশ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। অনেক তরুণ মনে করে, ভ্যাপিং স্মার্টনেস ও ‘কুল’ ব্যক্তিত্বের প্রতীক। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, ক্যাফে ও রেস্টুরেন্টে প্রকাশ্যে ব্যবহার করার প্রবণতা এটিকে আরও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। অথচ এই তথাকথিত আধুনিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ নিকোটিন আসক্তি। আজ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ই-সিগারেটের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। কৈশোর এমন একটি সময়, যখন কৌতূহল, বন্ধুদের প্রভাব এবং নিজেকে আলাদা করে উপস্থাপনের প্রবণতা বেশি থাকে। তামাক কোম্পানিগুলো ঠিক এই দুর্বল জায়গাটিকেই ব্যবহার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং, অনলাইন বিজ্ঞাপন এবং রঙিন প্যাকেজিং তরুণদের মনে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করছে যে এটি ক্ষতিকর নয়। অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার চাপ, মানসিক উদ্বেগ কিংবা সাময়িক প্রশান্তির আশায় ভ্যাপিং শুরু করে। কিন্তু খুব দ্রুত তারা নিকোটিনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো- ই-সিগারেট ব্যবহারকারী তরুণদের বড় একটি অংশ পরবর্তীকালে প্রচলিত সিগারেটেও আসক্ত হয়ে পড়ে।

নিকোটিন শুধু একটি রাসায়নিক নয়; এটি ধীরে ধীরে মানুষকে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য করে। ভ্যাপিংয়ের ফলে মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ে, যা সাময়িক প্রশান্তি দেয়। কিন্তু সেই প্রশান্তির আড়ালে তৈরি হয় গভীর নির্ভরতা। একসময় মানুষ বুঝতেই পারে না, কখন অভ্যাসটি আসক্তিতে পরিণত হয়েছে। কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্ক এখনও বিকাশমান থাকে। এই সময়ে নিকোটিন তাদের মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট