শব্দে শব্দে বিদ্রোহ : সুকান্তের আগুনমাখা জীবন
রাকিবুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু কবির আবির্ভাব ঘটে, যাদের জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও তাদের উচ্চারণ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে। তারা শুধু নিজেদের সময়কে বর্ণনা করেন না, বরং সময়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা ক্ষত, ক্ষুধা, বৈষম্য ও মানুষের নীরব কান্নাকে ভাষা দেন। সুকান্ত ভট্টাচার্য সেই বিরল কবিদের একজন। মাত্র ২০ বছরের জীবনে তিনি যে কবিতার ভুবন নির্মাণ করেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, তীক্ষè এবং মানবিক।
সুকান্তকে ‘কিশোর কবি’ বলা হয়। কিন্তু এই পরিচয় তার সাহিত্যিক শক্তিকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না। বয়সে তিনি তরুণ ছিলেন; কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এক পরিণত সমাজসচেতন মানুষের। তার কবিতায় যেমন আছে দ্রোহ, তেমনি আছে গভীর মানবিকতা; যেমন আছে ক্ষুধার আর্তনাদ, তেমনি আছে মানুষের মুক্তির স্বপ্ন। তিনি প্রেমের চেয়ে বেশি লিখেছেন মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই নিয়ে, ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন সামষ্টিক বাস্তবতাকে। এ কারণেই সুকান্ত বাংলা কবিতায় শুধু একজন কবি নন, তিনি এক সময়ের বিবেক।
সুকান্ত ভট্টাচার্য জন্মেছিলেন ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট। কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলের ৪৩, মহিম হালদার স্ট্রিটে মাতামহের বাড়িতে তার জন্ম। তার পিতা নিবারণ ভট্টাচার্য এবং মাতা সুনীতি দেবী। পরিবারটি ছিল নিম্নবিত্ত। শৈশব থেকেই অভাবের বাস্তবতা, টানাপোড়েনের জীবন এবং চারপাশের সামাজিক বৈষম্য তার মননে দাগ কেটেছিল। জন্ম কলকাতায় হলেও তার পৈতৃক শেকড় বর্তমান বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার ঊনশিয়া গ্রামে।
জন্মের সময় ভারতবর্ষ ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তাপে উন্মুখ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঔপনিবেশিক শোষণ, জাতীয়তাবাদী চেতনার উত্থান সব মিলিয়ে উপমহাদেশ তখন এক রূপান্তরময় সময় অতিক্রম করছিল। এই পরিবর্তনশীল সময়ই পরবর্তী সময়ে সুকান্তের সাহিত্যচেতনার ভিত নির্মাণ করে।
শৈশবেই তিনি জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। অল্প বয়সে মাকে হারানোর অভিজ্ঞতা তার মনে গভীর প্রভাব ফেলে। ব্যক্তিগত শোক তাকে ভেঙে দেয়নি; বরং মানুষের দুঃখকে অনুভব করার ক্ষমতা আরও গভীর করেছে। যে শিশু খুব দ্রুত হারানোর বেদনা চিনে ফেলে, সে জীবনের নিষ্ঠুর দিকগুলোও দ্রুত বুঝতে শেখে। সুকান্তও বুঝেছিলেন জীবন সবসময় কোমল নয়; অনেক সময় তা নির্মম, বৈষম্যময় এবং ক্ষুধার্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ভারী। সুকান্ত ভট্টাচার্যের বেড়ে ওঠা কলকাতার বেলেঘাটা অঞ্চলে। সে সময়ের বেলেঘাটা ছিল মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের এক মিশ্র সমাজ যেখানে জীবন ছিল কঠিন, অথচ প্রতিদিনের লড়াই ছিল দৃশ্যমান। রাস্তায় রাজনৈতিক মিছিল, শ্রমিক আন্দোলনের উত্তাপ, অনিশ্চয়তায় জর্জরিত নগরজীবন এবং দুর্ভিক্ষের ছায়া সব মিলিয়ে কলকাতা তখন এক অস্থির সময়ের প্রতিচ্ছবি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে শহরের পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে ওঠে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, খাদ্যসংকট এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এই নগরের রাস্তায় দাঁড়িয়েই সুকান্ত দেখেছেন মানুষের ক্ষুধা, শ্রমিকের ক্লান্তি, বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। তার কবিতার বাস্তবতা তাই কল্পনা থেকে নয়, এসেছে এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে।
বিশেষ করে ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ তার মানসজগতে গভীর অভিঘাত সৃষ্টি করে। লাখ লাখ মানুষ অনাহারে মারা যায়, রাস্তায় পড়ে থাকে কঙ্কালসার দেহ, শহরের ফুটপাত যেন পরিণত হয় মৃত্যুর মিছিলে। ব্রিটিশ সরকারের যুদ্ধনীতি, খাদ্যসংকট, কালোবাজারি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ রূপ দেয়। সুকান্ত এই দুর্ভিক্ষকে দূর থেকে দেখেননি তিনি দেখেছেন সামনে থেকে, খুব কাছ থেকে। ক্ষুধার্ত মানুষের চোখে তিনি দেখেছিলেন সভ্যতার ব্যর্থতা। তাই তার কবিতায় ক্ষুধা কোনো রূপক নয়, কোনো সাহিত্যিক অলংকারও নয় ক্ষুধা তার কাছে ছিল নগ্ন বাস্তবতা, জীবনের নিষ্ঠুর সত্য। এই সময়েই তার কবিতার ভাষা হয়ে ওঠে আরও তীক্ষè, আরও আগুনমাখা। তিনি কলম ধরেছিলেন ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে এবং শোষণ-লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে। ফলে তার কবিতা আর শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ থাকেনি তা হয়ে উঠেছিল সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক প্রতিবাদী উচ্চারণ, এক যুগের প্রতিরোধ।
সুকান্তের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশও এই সময়ের মধ্য দিয়েই। তিনি প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং সমকালীন বামপন্থি সাংস্কৃতিক চর্চা দ্বারা প্রভাবিত হন। কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘দৈনিক স্বাধীনতা’-এর অধীনে প্রকাশিত ‘কিশোর সভা’ বিভাগ সম্পাদনা করতেন। এই দায়িত্বের মাধ্যমে তিনি কিশোর ও তরুণদের মধ্যে প্রগতিশীল চিন্তা, সামাজিক সচেতনতা এবং গণমানুষের অধিকারবোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। তার সম্পাদনার কাজ কেবল সাহিত্যচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটি অংশ।
১৯৪৪ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন সুকান্ত। একই বছর তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘আকাল’ নামে একটি সংকলন গ্রন্থ। দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলার বাস্তবতাকে সাহিত্যিক দলিল হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ‘আকাল’ শুধু বই নয়, যেন এক তীব্র সামাজিক প্রতিবাদের ভাষ্য। রাজনৈতিক কর্মযজ্ঞের পাশাপাশি তিনি সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, সংস্কৃতি মানুষের মন তৈরি করে, আর মন তৈরি না হলে সমাজ বদলায় না। সুকান্তের কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার প্রতীক নির্মাণ। তিনি খুব সাধারণ বিষয়কে অসাধারণ অর্থ দিয়েছেন। তার বিখ্যাত কবিতা ‘দেশলাই কাঠি’ তার বড় উদাহরণ। সেখানে একটি সামান্য দেশলাই কাঠি হয়ে ওঠে সম্ভাব্য বিস্ফোরণের প্রতীক। সমাজ যাদের তুচ্ছ মনে করে, তারাই একদিন পরিবর্তনের আগুন জ্বালাতে পারে এই বিশ্বাস কবিতাটিকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। ক্ষুদ্রতার ভেতর লুকিয়ে থাকা শক্তিকে তিনি অসাধারণ দক্ষতায় প্রকাশ করেছেন।
‘রানার’ কবিতায় তিনি নির্মাণ করেছেন এক ক্লান্ত অথচ অদম্য মানুষের প্রতিচ্ছবি। রানার প্রতিদিন মানুষের খবর পৌঁছে দেয়; কিন্তু তার নিজের খবর কেউ রাখে না। সে দৌড়ায়, ক্লান্ত হয়, তবু থামে না। এই চরিত্রটি আসলে শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি- যারা সমাজকে সচল রাখে, অথচ নিজেরাই অদৃশ্য থেকে যায়। রানারের এই যাত্রা শুধু দায়িত্বের নয়, এটি বঞ্চনারও প্রতীক। একইভাবে ‘সিঁড়ি’ কবিতায় তিনি শ্রেণিবৈষম্যের নির্মম চিত্র তুলে ধরেছেন। সমাজের একশ্রেণি অন্য শ্রেণির কাঁধে পা রেখে ওপরে ওঠে। শ্রমজীবী মানুষ সেখানে যেন একেকটি সিঁড়ি যাদের ব্যবহার করা হয়; কিন্তু যাদের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। কবিতাটি সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোর এক গভীর সমালোচনা। সুকান্তের কবিতায় প্রেমও এসেছে, তবে তা নিছক ব্যক্তিগত আবেগের জায়গা থেকে নয়। তার ‘প্রিয়তমাসু’ কবিতায় দেখা যায় যুদ্ধ, আদর্শ এবং ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন। ‘পরের জন্য যুদ্ধ করেছি অনেক’ এই স্বীকারোক্তির মধ্যে লুকিয়ে আছে এক বিপ্লবী জীবনের ক্লান্তি। এখানে কবি উপলব্ধি করেন, মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক বিজয় নয়; তার চেয়েও বড় প্রয়োজন ঘরে ফেরা, আপন জীবনে ফিরে আসা। যুদ্ধের গৌরবের আড়ালে যে ব্যক্তিগত শূন্যতা জন্ম নেয়, সুকান্ত তা গভীর সংবেদনশীলতায় তুলে ধরেছেন। সুকান্তের কবিতায় বারবার ফিরে আসে ক্ষুধার প্রসঙ্গ। তার বিখ্যাত উচ্চারণ ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ বাংলা কবিতার অন্যতম শক্তিশালী চিত্রকল্প। এখানে চাঁদের রোমান্টিক সৌন্দর্য ভেঙে গিয়ে ক্ষুধার বাস্তবতায় রূপান্তরিত হয়েছে। এটি শুধু কবিতার পঙ্?ক্তি নয়, বরং একটি সময়ের নির্মম দলিল। সুকান্ত দেখিয়েছেন, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে সৌন্দর্যের সংজ্ঞাও বদলে যায়।
তার সাহিত্যিক শক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়বোধ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সাহিত্য শুধু নান্দনিকতার চর্চা নয়; এটি সামাজিক দায়িত্বও। তাই তার কবিতায় শোষণ, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এত স্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন, কবির কাজ শুধু সৌন্দর্য নির্মাণ নয়, সত্য উচ্চারণও। দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক ব্যস্ততা এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং বিশ্রামের অভাব ধীরে ধীরে তার শরীরকে দুর্বল করে দেয়। প্রথমে তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। পরে আক্রান্ত হন দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে (টিউবারকিউলোসিস)। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯৪৭ সালের ১৩ মে মাত্র ২১ বছর বয়সে কলকাতায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মাত্র ২১ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে একজন কবি কতটুকু সৃষ্টি করতে পারেন এই প্রশ্নের উত্তর সুকান্ত ভট্টাচার্য নিজেই রেখে গেছেন তার জীবন ও সাহিত্যকর্মে। তার মৃত্যু ছিল অকাল, কিন্তু সাহিত্যিক অবস্থান আজও দৃঢ় ও অম্লান। মৃত্যুর পর তার রচনাগুলো বিভিন্ন সংকলনে প্রকাশিত হয়ে দ্রুত পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া জাগায়। বাংলা সাহিত্যে তিনি এমন এক কাব্যধারা নির্মাণ করেন, যেখানে কবিতা হয়ে ওঠে শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বর, ক্ষুধার বাস্তবতা এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। আজকের সময়েও সুকান্ত ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। সমাজে বৈষম্য, দারিদ্র্য, শ্রমের শোষণ সবই এখনও বিদ্যমান।
উন্নয়ন ও অগ্রগতির আলোচনার আড়ালেও বহু মানুষের জীবন আজও বঞ্চিত ও অনিশ্চিত। এই বাস্তবতা সুকান্তের কবিতাকে শুধু অতীতের দলিল না রেখে বর্তমানেরও আয়না করে তোলে। তার সাহিত্য মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পাশে না দাঁড়ালে সাহিত্য তার প্রকৃত অর্থ হারায়।
রাকিবুল ইসলাম
লেখক ও গবেষক
