পবিপ্রবিতে সহিংসতার ছায়া : ক্ষতিগ্রস্ত জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার ভবিষ্যৎ
জুবাইয়া বিন্তে কবির
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি জাতির সভ্যতা ও ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার শিক্ষাঙ্গনের নীরব প্রাঙ্গণে। যেখানে শিক্ষক শুধু পাঠদাতা নন, বরং একটি প্রজন্মের চিন্তা, নৈতিকতা ও মানবিকতার স্থপতি। কিন্তু যখন সেই শিক্ষকই নিজের কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীন, অপমানিত ও সহিংসতার শিকার হন, তখন শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয় পুরো জাতির বিবেকই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনা সেই ভয়াবহ বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি, যেখানে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এমনকি সাংবাদিকরাও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই সংকট শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; এটি আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক কাঠামোর গভীর ভাঙনের ইঙ্গিত দেয়। এই বাস্তবতার মধ্যেই ব্যক্তিগতভাবে আমি এক ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনযাপন করি। আমার স্বামী, যিনি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা, তিনি কর্মস্থলে গেলে আমি, আমার শাশুড়ি এবং আমার সন্তানরা এক অদৃশ্য আতঙ্কে থাকি। বারবার ফোন করে খোঁজ নিতে হয় তিনি নিরাপদে আছেন কি না, ক্যাম্পাসে কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে কি না। এই মানসিক চাপ শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি আজ অনেক শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল পরিবারের নীরব বাস্তবতা, যারা তাদের প্রিয়জনদের কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিনিয়ত উদ্বিগ্ন।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অচলাবস্থা, অবিশ্বাস ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ক্যাম্পাসে অস্থিরতা তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় রূপ নেয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা ছিল মুক্তচিন্তা, যুক্তি ও গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের নিরাপদ স্থান। শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন কর্মসূচিতে বহিরাগতদের হামলা প্রমাণ করেছে, শিক্ষাঙ্গন কতটা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। শিক্ষক, কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা শুধু নিন্দনীয় নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং জাতির ভবিষ্যৎ নিয়েও গভীর উদ্বেগের বহিরাগতরা এলো কীভাবে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- কীভাবে বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করল? কারা তাদের নিয়ে এলো? কেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হলো? একটি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো উন্মুক্ত সংঘর্ষক্ষেত্র নয়। সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভাঙন মানে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাওয়া। যখন শিক্ষকেরা নিজেদের ক্যাম্পাসেই নিরাপত্তাহীন বোধ করেন, তখন গবেষণা থেমে যায়, শ্রেণিকক্ষে ভয় প্রবেশ করে এবং ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কেও জন্ম নেয় অবিশ্বাস। বিশ্ববিদ্যালয় তখন আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকে না; ধীরে ধীরে তা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মঞ্চে পরিণত হয়।
কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট এক দিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘদিনের অদক্ষতা, জবাবদিহিতার অভাব, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা ধীরে ধীরে ক্ষোভের জন্ম দেয়। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতিও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। যখন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখন অস্থিরতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সংলাপের সংস্কৃতি, ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ।
দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্রমেই তার সহনশীলতার ভিত্তি হারাচ্ছে, যা আজ এক গভীর উদ্বেগের বাস্তবতা। একই রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যেও পদণ্ডপদবি ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ বিভাজন তৈরি হচ্ছে; পরস্পরকে ভিন্ন দলীয় ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে হেয় করা, মতভিন্নতাকে শত্রুতায় রূপ দেওয়া এবং প্রশাসনিক সংকটকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। এর ফলে শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক সৌহার্দ্য ও একাডেমিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাও এই বৃহত্তর সংকটেরই প্রতিফলন, যেখানে যুক্তি ও সংলাপের জায়গা দখল করেছে সংঘাত ও চাপের রাজনীতি। যখন শিক্ষাঙ্গনে আলোচনার পরিবর্তে শক্তি প্রদর্শন প্রবেশ করে, তখন জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায় এবং তার স্থলে প্রতিষ্ঠিত হয় ভয়, অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসের সংস্কৃতি। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর মুক্ত চিন্তার কেন্দ্র না থেকে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের অস্থির মঞ্চে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও বিএনপির কয়েকজন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। এটি রাজনৈতিক শিষ্টাচার, দলীয় শৃঙ্খলা এবং নৈতিক অবস্থানের প্রতি দলের সুস্পষ্ট অঙ্গীকারের প্রতিফলন, যা প্রমাণ করে শিক্ষাঙ্গনসহ সমাজের যেকোনো স্থানে সহিংসতা ও অনৈতিক আচরণের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। বিএনপির চেয়ারম্যান দেশনায়ক তারেক রহমান এর নেতৃত্বে শুরু থেকে ই দলটি শিক্ষাঙ্গন, প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তার নীতিগত অবস্থানকে রাজনৈতিক মহলে ‘জিরো টলারেন্স’ হিসেবে দেখা হয়, বিশেষ করে অনিয়ম, দুর্নীতি ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্রে। এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি সুস্পষ্ট বার্তা দেয় রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং আইন ও নৈতিকতা সর্বোচ্চ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে যখন ভয় প্রবেশ করে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। ক্লাসরুমে অনিশ্চয়তা, গবেষণায় স্থবিরতা এবং মানসিক চাপ শিক্ষার স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করে। তাই শিক্ষক সমাজের আন্দোলন বা কর্মসূচি গ্রহণের ক্ষেত্রে যেন শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতি ন্যূনতম থাকে, সে বিষয়ে বিকল্প ও দায়িত্বশীল পথ অনুসন্ধান করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গণমাধ্যমকর্মীরা সমাজের দর্পণ। তারা ঘটনাকে জনগণের সামনে তুলে ধরেন। শিক্ষাঙ্গনে সাংবাদিকদের ওপর হামলা মানে সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা। এটি কেবল সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়; বরং গণতান্ত্রিক চর্চার জন্যও বড় হুমকি। বিশ্ববিদ্যালয় যদি সত্য ও মতপ্রকাশের নিরাপদ স্থান না হয়, তাহলে সমাজের আর কোথাও মুক্তবুদ্ধির চর্চা টিকে থাকবে না।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের সহিংস ও অস্থির রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশ। এর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক লাঞ্ছনা, হুমকি ও অবরুদ্ধ করে রাখার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। বিশেষভাবে আলোচিত হয় একজন সিনিয়র প্রফেসরকে তার অফিসকক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা, যা শিক্ষক সমাজে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক-প্রশাসন দ্বন্দ্ব, শিক্ষার্থী সংগঠনের সহিংসতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনারই কার্যকর বিচার হয়নি।
ফলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং শিক্ষকদের নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে।
জুবাইয়া বিন্তে কবির
অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
