উন্নতিকে উন্নয়ন বলে প্রচার করে দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা
মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বিগত দেড় যুগ বা তার বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্য অন্যতম হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প বা মেঘা প্রজেক্ট। সেই উন্নয়নের প্রতি রন্দ্রে রন্দ্রে ছিল দুর্নীতি, দেশি বিদেশি ঋণের বোঝা, শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্ন ফাঁসের মহড়া, স্বাস্থ্য খাতে অরাজকতা, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি, অর্থনীতিতে স্থবিরতা, ব্যাংক ও শেয়ারবাজারে লুটপাট ও টাকা পাচারের মহোউৎসব। ঠিক সেই কঠিন মুহূর্তে দেশের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। ছাত্র আন্দোলনের মুখে হাসিনা সরকারের পতনের পর ইউনূস সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটে তীব্র লোডশেডিং উন্নয়নের বয়ানে আরও ব্যাপকভাবে ডালপালা গজিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে আরো ঘোলা করতে আদাজল খেয়ে নেমেছে হাসিনা সরকারের সুবিধাবাদী কিছু মানুষ। উন্নতিকে উন্নয়ন বলে চালিয়ে দেওয়া সমাজের সেই নিষিদ্ধঘোষিত বিচ্ছিন্ন লোকগুলো সারা বাংলাদেশে অস্থিরতা তৈরি অপচেষ্টাই লিপ্ত রয়েছে। সমাজ বাস্তবতায় তাদের সেই উন্নয়ন আর প্রকৃত উন্নয়নের মধ্য রয়েছে বিস্তর তফাৎ। উন্নতি আর উন্নয়নের মধ্য তফাৎ জানতে হলে আমাদের সর্বপ্রথম এর সংজ্ঞা জানতে হবে। উন্নতি (ওসঢ়ৎড়াবসবহঃ) হলো কোনো বিদ্যমান অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন বা আগের চেয়ে ভালো অবস্থা, যা সাধারণত দ্রুত ও পরিমাপযোগ্য। অন্যদিকে, উন্নয়ন (উবাবষড়ঢ়সবহঃ) হলো কাঠামোগত, গুণগত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন, যা সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। উন্নতি হলো ছোট পদক্ষেপ, আর উন্নয়ন হলো বড় প্রক্রিয়া। উন্নতি হলো নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রের অগ্রগতি (যেমন- রাস্তা মেরামত বা কাজের গতি বৃদ্ধি)। অন্যদিকে, উন্নয়ন হলো সামগ্রিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন (যেমন- শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর সার্বিক উন্নতি)। উন্নতি সাধারণত স্বল্পমেয়াদি বা তাৎক্ষণিক। উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদি এবং একটি চলমান প্রক্রিয়া। বেতন বৃদ্ধি হলো উন্নতি, কিন্তু জীবনযাত্রার মান ও দক্ষতা বৃদ্ধি হলো উন্নয়ন। একটি ব্রিজ তৈরি হলো উন্নতি, কিন্তু পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন হলো উন্নয়ন। সেই নিয়ম অনুযায়ী কয়েকটা ব্রিজ, সেতু, কালভার্ট, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করলেই তাকে উন্নয়ন বলা যাবে না। সর্বপ্রথম রাস্তার যানযট দূর করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ঢাকা মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে মূলত ঢাকা মহানগরী ও আশপাশের সীমাহীন যানজট নিরসনের উদ্দেশে নির্মাণ করা হলেও ঢাকার যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিদ্যমান যানজট সমস্যার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। যানজটের কারণে সৃষ্ট সমস্যায় প্রতিনিয়ত নগরবাসীকে হাঁসফাঁস করতে হচ্ছে।
দেশি-বিদেশি (২৮ লাখ কোটি) ঋণের উপর ডুবে থাকাকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলা যায় না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের অর্থ হচ্ছে, জাতীয় আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বিদেশি ঋণের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা এবং ঘাটতি ও ভর্তুকি দূর করা। অর্থাৎ, দেশের মধ্য বিদ্যমান (জ্বালানি, তারুল্য, রিজার্ভ) বিভিন্ন সংকট কমিয়ে অর্থনীতিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা। উন্নয়ন মানে বিদেশি ঋণের টাকায় আমদানি করে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা নয়। উন্নয়ন হচ্ছে দেশের মজুত তৈল-গ্যাস উত্তোলন করে জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা। উন্নয়ন মানে নতুন টাকা (৩,৩২,৩৩১ কোটি) চাপিয়ে অর্থনৈতিক সংকট ও তারুল্য সংকট মোকাবিলা করা নয়। উন্নয়নের অর্থ হচ্ছে জিডিপি ও জিএনপি বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকট দূর করা। উন্নয়ন মানে রিজার্ভ ভেঙে খরচ করে রিজার্ভের উপর চাপ সৃষ্টি করা নয়। উন্নয়ন হচ্ছে জাতীয় আয় বৃদ্ধি, আমদানি হ্রাস ও টাকা পাঁচার বন্ধ করে রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। ভুয়া মাথাপিছু আয় এবং রিজার্ভ অতিরিক্ত দেখিয়ে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করাকে উন্নয়ন বলা যায় না। উন্নয়ন মানে জিনিসপত্রের দাম কমাতে হবে এবং মানুষের আয় ও বেতন বৃদ্ধি করতে হবে। দেশের ৪০% টাকা ১০% মানুষের হাতে চলে গেলে এটাকে উন্নয়ন বলা যায় না। আগে ধনী গরীবের বৈষম্য কমাতে হবে। সিন্ডিকেট করে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে গরিবদের শোষণের রাস্তা বন্ধ করতে হবে। নতুন নতুন কলকারখানা স্থাপন করে বেকার তরুনদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে এত উন্নয়ন হলে তাহলে দেশে এত বেকারত্ব কেন?
উন্নয়ন মানে ব্যাংকের টাকা বড় বড় শিল্পপতি মাফিয়াদেরকে ঋণের নামে লুটপাটের সুযোগ করে দেওয়া নয়। উন্নয়ন হচ্ছে ব্যবসা বাণিজ্য প্রসার করা এবং ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের ঋণ সহায়তা দিয়ে ঠিকিয়ে রাখা। উন্নয়ন মানে মিল-কলকারখানা বন্ধ করে মানুষের পেটে লাথি মারা নয়। উন্নয়ন অর্থ হল, বন্ধ কলকারখানা চালু করে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। সরকারিভবে দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং দুর্নীতি বন্ধ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। এটাই হচ্ছে উন্নয়ন ও সফলতা। বেসরকারি খাতে গেলে লাভজনক, সরকারি খাতে গেলে লোকসান এটা কেমন উন্নয়ন। এই ধারা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভাষায় রপ্তানির তুলনায় আমদানির পরিমান বেশি হতে পারবে না। অথচ এদেশে একটা ছোট ইস্ক্রুপ থেকে শুরু করে বড় বড় মেশিন ও যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এতে রিজার্ভ খালি হচ্ছে এবং দেশের টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। উন্নয়ন মানে ব্রিটিশ নীল করদের মতো নিম্ন, মধ্যভিত্ত ও গরীব শ্রেণির উপর অতিরিক্ত কর-শুল্কের বোঝা বাড়িয়ে দেওয়া নয়। উন্নয়নের অর্থ হল ধনী শিল্পপতিদের কর শুল্ক ফাঁকি রোধ এবং কর মওকুফ বন্ধ করে রাজস্ব বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা। রাজস্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করা। উন্নয়নের মানে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকরা অবহেলিত ও মানবতার জীবন যাপন করছে। যে মজুরি পায় তা দিয়ে সংসার চলে না।
অনেক সময় দার দেনা পরিশোধ করতে সহায় সম্বল পরিশোধ করতে হচ্ছে। উন্নয়ন মানে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি বন্ধ করে কম মূল্যে পণ্যদ্রব্য জনগণের নিকট সরবরাহ করা। জনগণ যাতে ন্যায্যমূলে পণ্য ক্রয় করতে পারে সেজন্য সিন্ডিকেটের কারসাজি বন্ধ করা। উন্নয়নের অর্থ হল জিডিপি প্রবৃদ্ধি, জাতীয় আয় বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বেতন-মজুরি বৃদ্ধি, রিজার্ভ বৃদ্ধি, উৎপাদন বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি হ্রাস ইত্যাদি। বিগত হাসিনা সরকারের সময়ে অবকাঠামো উন্নয়নে কয়েকটা মেগা প্রকল্প নির্মাণ আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দৃশ্যমান ছিল। তাই এটাকে উন্নয়ন বলা যায়না। পতিত সরকারের সময়ের রাজনৈতিক সমস্যা মোকাবিলায় অবকাঠামো উন্নতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
