বিবেকের কাঠগড়ায় অভিভাবকত্ব
আমানুর রহমান
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
পৃথিবীতে সর্বাধিক পবিত্র, নিরাপদ ও মধুর আশ্রয়স্থলগুলোর অন্যতম হলো ‘বাবা-মা’। তবে বর্তমান সমাজব্যবস্থার দিকে গভীরভাবে তাকালে মনে হয়, সত্যিকারের বাবা-মা হওয়াটা যেন দিন দিন এক দুর্লভ ও দুঃসাধ্য বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। সন্তান জন্ম দেওয়া একটি সাধারণ জৈবিক প্রক্রিয়া হতে পারে, কিন্তু সেই সন্তানের শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক বিকাশের পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করাটাই হলো প্রকৃত মাতৃত্ব বা পিতৃত্ব। অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয় হলো, জন্ম দেওয়ার পর অনেক বাবা-মা সন্তানের ন্যূনতম অধিকার ও নিজেদের আজীবনের দায়িত্বের কথা বেমালুম ভুলে যান। তাদের সমস্ত পাপ, ভুল সিদ্ধান্ত এবং দায়িত্বহীনতার প্রায়শ্চিত্ত মূলত তাদের সন্তানদেরই করতে হয়। পিতা-মাতার ভুলের কষ্ট তাদের নিজেদের যতটা না ভোগ করতে হয়, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি সারা জীবন ভোগ করতে হয় সেই নিষ্পাপ প্রাণটিকে, যার কোনো অপরাধই ছিল না। এই নির্মম সত্যটি আজ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মর্মান্তিক রূপে দৃশ্যমান।
দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতি এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে অনেক পরিবারেই আজ অশান্তির তীব্র দাবানল জ্বলছে। কখনও কখনও বাবা বা মা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছেন এবং সাময়িক মোহের বশবর্তী হয়ে সম্পূর্ণ ভুলে যাচ্ছেন নিজেদের নাড়িছেঁড়া ধনের কথা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার দাম্পত্য কলহের বিষবাষ্প সরাসরি গিয়ে পড়ছে সন্তানের ওপর। বাবা-মায়ের মধ্যকার অহংকার, রাগ আর জেদ মেটানোর নির্দয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে অবুঝ শিশুরা। একটি শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য যে শান্ত ও ভালোবাসাপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ প্রয়োজন, তা আজ অনেকাংশেই অনুপস্থিত। এই বিষাক্ত পরিবেশ থেকে বাঁচতে গিয়ে কিংবা বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ও একাধিক বিয়ের ফলে অনেক সন্তানকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে দাদা-দাদি বা নানা-নানির বাড়িতে কিংবা কোনো দূরবর্তী আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। বাবা-মায়ের এই চরম অবহেলা এবং নিয়মিত খোঁজখবর না নেওয়ার সুযোগে এসব ঠিকানাহীন সন্তানরা খুব সহজেই ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। পারিবারিক উষ্ণতা ও স্নেহের অভাবে তারা যেমন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়, তেমনি তাদের আত্মবিশ্বাসও তলানিতে গিয়ে ঠেকে; যা তাদের সারা জীবনের জন্য মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়।
আর্থিক অসচেতনতা এবং অভিভাবকের দায়িত্বহীনতা শিশুদের জীবনকে আরও বেশি দুর্বিষহ করে তোলে। সমাজে এমন অনেক পিতা আছেন, যারা জুয়া, নেশা বা অন্যান্য ক্ষতিকর অভ্যাসে লিপ্ত হয়ে সংসারের সব অর্থ উড়িয়ে দেন, যার ফলে সন্তানের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অন্ধকারে নিপতিত হয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কোনো ধরনের আর্থিক নিরাপত্তা, সম্পদ বা সামর্থ্য তৈরি না করেই তারা অবিবেচকের মতো একাধিক সন্তান জন্ম দিচ্ছেন। এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা সন্তানেরা সুশিক্ষা, পুষ্টিকর খাবার এবং চিকিৎসার মতো ন্যূনতম মৌলিক অধিকারগুলো থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হয়। অন্যদিকে, এর ঠিক বিপরীত চিত্রও সমাজে প্রকট। অনেক বাবা-মা অন্ধের মতো টাকা উপার্জনের নেশায় এতটাই মত্ত থাকেন যে, সন্তানকে দেওয়ার মতো সামান্য সময়টুকুও তাদের হাতে থাকে না। পর্যাপ্ত সময়, মনোযোগ ও সঠিক নির্দেশনার অভাবে এই নিঃসঙ্গ ও স্নেহবঞ্চিত সন্তানেরা সহজেই বিপথগামী হচ্ছে, জড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের মতো নানা ভয়াবহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।
আধুনিক যুগের আরেকটি বড় সমস্যা হলো সন্তানদের প্রতি বাবা-মায়ের চরম অসচেতনতা এবং তাদের ওপর নিজেদের অহেতুক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা। নিজেদের ব্যস্ততা আড়াল করতে কিংবা সন্তানকে সহজেই শান্ত রাখতে অনেক বাবা-মা খুব অল্প বয়সেই তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন স্মার্টফোন ও প্রযুক্তির নানা ক্ষতিকর অনুষঙ্গ। এই অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির ব্যবহার যে সন্তানের মেধা ও মনন ধ্বংস করছে, সে বিষয়ে তারা একেবারেই উদাসীন। শুধু তা-ই নয়, পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে সন্তানের মানসিকতা, নিজস্ব আগ্রহ ও সক্ষমতা বিবেচনা না করেই নিজেদের অপূর্ণ স্বপ্ন বা সমাজের চাপানো সিদ্ধান্ত সন্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন।
এই তীব্র মানসিক চাপ ও প্রত্যাশার বোঝা সহ্য করতে না পেরে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ পথ বেছে নিচ্ছে। সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের চেয়ে যখন সামাজিক মর্যাদা ও পরীক্ষার নম্বর বাবা-মায়ের কাছে বেশি প্রাধান্য পায়, তখন সেই পরিবার সন্তানের জন্য নিরাপদ আশ্রয় না হয়ে বরং একটি শ্বাসরুদ্ধকর বন্দিশালায় পরিণত হয়। সন্তানের মনের ভাষা বুঝতে না পারাটা যে কত বড় অপরাধ, তা এই বেদনাদায়ক পরিণতিগুলোই প্রতিনিয়ত প্রমাণ করে চলেছে।
সমাজের একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে অন্ধকারের চোরাগলি পর্যন্ত বাবা-মায়ের দায়িত্বহীনতার আরও ভয়াবহ ও অমানবিক রূপ আমরা দেখতে পাই। অশিক্ষিত ও অসচেতন বাবা-মা অনেক সময়ই অজ্ঞতার বশবর্তী হয়ে কন্যাশিশুকে বাল্যবিবাহের মতো মারাত্মক পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, যা ওই শিশুটির জীবনকে চিরতরে বিপন্ন করে তুলছে। এর পাশাপাশি সমাজের সবচেয়ে নিষ্ঠুর বিষয়টি হলো, অবৈধ সম্পর্কের জেরে জন্ম নেওয়া নবজাতককে ডাস্টবিনে বা রাস্তার ধারে ফেলে যাওয়ার মতো পৈশাচিক ঘটনা। কখনো আবার সমাজের কিছু বিকৃত মানসিকতার মানুষ কোনো মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে অন্তঃসত্ত্বা করে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায় এবং পিতৃপরিচয়হীন এক চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয় একটি নিষ্পাপ শিশুকে।
আমানুর রহমান
কবি ও লেখক চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ
