জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে হামে মৃত্যু থামছেই না
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে আশঙ্কাজনক হারে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে, যা শুধু উদ্বেগজনকই নয় বরং জনস্বাস্থ্যের চরম ব্যর্থতার এক নিদারুণ দলিল। হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও কেন আমাদের শিশুদের অকালে প্রাণ হারাতে হচ্ছে, সেই প্রশ্ন আজ প্রতিটি বিবেকবান নাগরিককে বিদ্ধ করছে। পরিস্থিতি এখন আর সাধারণ সতর্কবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি একটি জাতীয় জরুরি অবস্থায় পরিণত হয়েছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। টিকা দেওয়ার মাধ্যমে এই রোগকে প্রায় নির্মূল করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের কোনো ফাঁক রয়ে গেছে। করোনাকালীন সময়ে সাধারণ টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়া এবং অনেক এলাকায় সচেতনতার অভাবে শিশুদের ‘ড্রপ আউট’ হওয়ার হার বেড়েছে। বিশেষ করে দুর্গম অঞ্চল, চরাঞ্চল এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের মধ্যে টিকার কভারেজ এখনও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে। এই রোগ প্রতিরোধে হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের জন্য অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা জরুরি, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হামে মৃত্যুর একটি বড় কারণ শিশুদের তীব্র পুষ্টিহীনতা।
ভিটামিন ‘এ’-র অভাব থাকলে হামের জটিলতা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। দেখা যাচ্ছে, আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশই নিম্নবিত্ত পরিবারের, যারা পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পায় না। এর ওপর যোগ হয়েছে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা। প্রাথমিক পর্যায়ে হাম শনাক্ত না হওয়া এবং নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ার মতো জটিলতা তৈরি হওয়ার পর হাসপাতালে নিতে দেরি হওয়া মৃত্যুর হারকে ত্বরান্বিত করছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই শিশুটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
হাম নিয়ে আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ এখনও সেকেলে কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। অনেকেই একে ‘মায়ের দয়া’ বা অলৌকিক কিছু মনে করে কবিরাজি চিকিৎসা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করেন। এই দীর্ঘসূত্রতা শিশুর জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে সঠিক বার্তার অভাব এবং গুজব অনেক সময় বাবা-মাকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করছে। অথচ বিজ্ঞানের এই যুগে এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন। বর্তমান সংকট উত্তরণে শুধু রুটিন মাফিক কাজের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। যুদ্ধের গতিতে আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে।
যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে বিশেষ ‘হামণ্ডরুবেলা ক্যাম্পেইন’ বা ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। প্রতিটি শিশুকে খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনতে হবে। আক্রান্ত এলাকায় শিশুদের উচ্চ মাত্রার ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যা মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। স্থানীয় প্রশাসন, ধর্মীয় নেতা এবং জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। হাম যে কোনো অভিশাপ নয় বরং একটি নিরাময়যোগ্য রোগ, এই বার্তাটি ঘরে ঘরে পৌঁছাতে হবে। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামের রোগীদের জন্য আলাদা ইউনিট এবং জরুরি অক্সিজেনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। জটিল রোগীদের দ্রুত বড় হাসপাতালে স্থানান্তরের জন্য অ্যাম্বুলেন্স সেবা সার্বক্ষণিক রাখতে হবে। হামে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা গোপন না করে সঠিক পরিসংখ্যান সামনে আনা প্রয়োজন। এতে পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে প্রয়োজনীয় সম্পদ বরাদ্দ করা সহজ হবে। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের সুস্বাস্থ্যের ওপর। হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে যদি একটি শিশুও মারা যায়, তবে তার দায় রাষ্ট্র ও সমাজ এড়াতে পারে না। আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগের উদাসীনতা বা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাজে শিথিলতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। মনে রাখতে হবে, সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়। আজ যদি আমরা কঠোর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হই, তবে এই সংক্রমণ মহামারি আকার ধারণ করে আমাদের আগামীর প্রজন্মকে পঙ্গু করে দেবে। মৃত্যুর মিছিল থামাতে হবে এখনই। সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী- সবাইকে সম্মিলিতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। আমরা আর একটি শিশুরও প্রাণহানি দেখতে চাই না। হামমুক্ত দেশ গড়া কোনো বিলাসিতা নয়, এটি আমাদের শিশুদের মৌলিক অধিকার।
