সড়ক এখন মৃত্যুর মহাসড়ক : থামবে কবে এই রক্তস্রোত
মোহাম্মদ আলী সুমন
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের সড়ক এখন একটি নিরন্তর মৃত্যুক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ৫২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫১০ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৬৮ জন আহত হয়েছেন বলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে- অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১৭ জনের বেশি মানুষ সড়কে প্রাণ দিচ্ছেন, যা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য সহনীয় নয়। একই মাসে ১৩৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৪২ জন নিহত এবং ১২৪ জন আহত হয়েছেন, যা মোট দুর্ঘটনার ২৬.৩৭ শতাংশ, নিহতের ২৭.৮৪ শতাংশ এবং আহতের ৯.৭৭ শতাংশ। শুধু সড়কেই নয়, এপ্রিলে রেলপথে ৫৪টি দুর্ঘটনায় ৪৯ জন নিহত ও ১১ জন আহত এবং নৌপথে ৫টি দুর্ঘটনায় আরও ৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে এপ্রিল মাসে সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৫৮৬টি দুর্ঘটনায় ৫৬৩ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৭৯ জন আহত হয়েছেন।
তবে একই মাসে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পৃথক পরিসংখ্যানে সড়কে ৪৬৩টি দুর্ঘটনায় ৪০৪ জন নিহত এবং ৭০৯ জন আহত হয়েছেন; এই সময়ে ৭টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৪ জন নিহত ও ১১ জন আহত এবং ৩৪টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত ও ১৭ জন আহত হয়েছেন। দুই সংস্থার পরিসংখ্যানের ব্যবধান প্রমাণ করে, প্রকৃত দুর্ঘটনার চিত্র সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যানে যা উঠে আসছে তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ। বিভাগওয়ারি তথ্যে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে-১৩৫টি দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন নিহত ও ২৬৩ জন আহত; আর সবচেয়ে কম ময়মনসিংহ বিভাগে-১৭টি দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত ও ৬৪ জন আহত। নিহতদের মধ্যে ৯৯ জন চালক, ৮২ জন পথচারী, ৫৬ জন শিক্ষার্থী, ৫২ জন নারী, ৪৭ জন শিশু, ২৫ জন পরিবহন শ্রমিকের পাশাপাশি ৫ জন শিক্ষক, ৩ জন চিকিৎসক, ১ জন সাংবাদিক, ১ জন আইনজীবী এবং ৮ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী রয়েছেন- যা প্রমাণ করে সড়ক দুর্ঘটনায় সমাজের কোনো স্তরই নিরাপদ নয়। দুর্ঘটনার ৩৮.৫১ শতাংশ ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে, ৩১.৪৯ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ২২.৯৬ শতাংশ ফিডার রোডে।
শুধু এপ্রিলের চিত্র নয়, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই পরিস্থিতি ভয়াবহ।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫৫৯টি, নিহত হয়েছেন ৪৮৭ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ১৯৪ জন। যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যে ফেব্রুয়ারি মাসে ৪৪৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৪৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ১৮১ জন আহত হয়েছেন; সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে ঐ মাসে ৪৮৮টি দুর্ঘটনায় ৪৭৭ জনের প্রাণহানি এবং ১ হাজার ১৯৭ জন আহত হয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত দুর্ঘটনার ৪১.৭৪ শতাংশ ছিল গাড়িচাপার ঘটনা এবং ৩৩.২৫ শতাংশ ছিল মুখোমুখি সংঘর্ষ; দুর্ঘটনার ৪২.৬৩ শতাংশ ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে এবং ২৫.৪৪ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পৃথক হিসেবে মার্চ মাসে দেশে ৫৭৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৩২ জন নিহত এবং ২ হাজার ২২১ জন আহত হয়েছেন; নিহতদের মধ্যে নারী ৬৬ জন এবং শিশু ৯৮ জন; মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২০৪ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর ৩৮.৩৪ শতাংশ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন গড়ে ১৫.৪২ জন নিহত হয়েছিলেন, যা মার্চে বেড়ে ১৭.১৬ জনে দাঁড়িয়েছে- প্রাণহানি বেড়েছে ১১.২৮ শতাংশ। এরপর ঈদুল ফিতরের যাত্রায় অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের ঈদযাত্রা ও ফিরতি যাত্রার ১৫ দিনে সারাদেশে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত এবং ১ হাজার ৪৬ জন আহত হয়েছেন; গত বছরের তুলনায় এবার প্রাণহানি ৮.২৬ শতাংশ এবং দুর্ঘটনা ৮.৯৫ শতাংশ বেড়েছে। সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে ঈদযাত্রায় মোট ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৮৮ জন আহত হয়েছেন; এর মধ্যে রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত ও ২২৩ জন আহত এবং নৌপথে ৮টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত ও ১৯ জন আহত হয়েছেন। ঈদযাত্রায় রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের আগে ও পরের ১০ দিনে ২৭৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং পুলিশ সদর দপ্তরের গবেষণায় উঠে এসেছে প্রায় ৪২ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো। যাত্রী কল্যাণ সমিতি মন্তব্য করেছে, চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ১৫ দিনের হতাহতের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের সড়ক, নৌ ও রেল দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি- এই তুলনাটি নিছক পরিসংখ্যানগত নয়, এটি একটি জাতির বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো উপলব্ধি।
বার্ষিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই রক্তস্রোত প্রতিবছর শুধু ঘন হচ্ছে। ২০২৫ সালে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন; এছাড়া রেলপথে ৫১৩টি দুর্ঘটনায় ৪৮৫ জন নিহত ও ১৪৫ জন আহত এবং নৌপথে দুর্ঘটনায় আরও ১৫৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৬.৯৪ শতাংশ, নিহতের সংখ্যা বেড়েছে ৫.৭৯ শতাংশ এবং আহত বেড়েছে ১৪.৮৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে শুধু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই ঘটেছে ২ হাজার ৪৯৩টি, নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৯৮৩ জন ও আহত হয়েছেন ২ হাজার ২১৯ জন-অর্থাৎ মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৭.০৪ শতাংশ এবং মোট নিহতের ৩৮.৪৬ শতাংশই মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক। একই বছর রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭২ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৯.৯৩ শতাংশ এবং মোট মৃত্যুর ৩৬.২৯ শতাংশ; কর্মক্ষম বয়সী ১৮ থেকে ৬৫ বছরের ৫ হাজার ৭২৩ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৮ শতাংশ। এর আগে ২০২৩ সালে ৬ হাজার ২৬১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯০২ জন নিহত ও ১০ হাজার ৩৭২ জন আহত হয়েছিলেন এবং ২০২২ সালে ৬ হাজার ৭৪৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ৯ হাজার ৯৫১ জন। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১১ বছরে দেশে ৬০ হাজার ৯৮০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ৫ হাজার ৩৩৮ জন নিহত এবং ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮৪৭ জন আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য মিলিয়ে দেখলে ভয়াবহতার মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন নিহত হন- যা দেশের মোট মৃত্যুর ১ শতাংশ এবং সরকারি পরিসংখ্যানের প্রায় ছয় গুণ বেশি।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের রোড সেফটি প্রকল্পের সমন্বয়কারী শারমিন রহমান সম্প্রতি এক মতবিনিময় সভায় জানিয়েছেন, এশিয়ান ট্রান্সপোর্ট অবজারভেটরির ২০২৫ সালের রোড সেফটি প্রোফাইল অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রতি ১ হাজার কিলোমিটার সড়কে প্রায় ৬৭ জন মানুষ নিহত হন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি আরও জানান, ডাব্লিউএইচও-এর গ্লোবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং এর ৯২ শতাংশ মৃত্যু ঘটেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে; বিশ্বজুড়ে ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শিশু ও তরুণদের মৃত্যুর প্রধান কারণ এখন সড়ক দুর্ঘটনা। বাংলাদেশে পরিচালিত সর্বশেষ জাতীয় স্বাস্থ্য ইনজুরি জরিপে (সিআইপিআরবি ও ডাব্লিউএইচও-এর কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত) দেখা গেছে, বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা ২৪ হাজার ২৩৩ জন- যা সরকারি হিসেবের চেয়ে চার গুণ বেশি, তবে ডাব্লিউএইচও-এর ৩১ হাজারের অনুমানের চেয়ে কম। ডাব্লিউএইচও-এর গ্লোবাল রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২৪ হাজার ৯৫৪টি মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে এবং নিহতদের প্রায় ৬৭ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে- অর্থাৎ মূলত কর্মক্ষম মানুষ।
এই দুর্ঘটনাগুলো বাংলাদেশের জিডিপির ৫.৩ শতাংশ ক্ষতির কারণ হচ্ছে বলেও ডাব্লিউএইচও জানিয়েছে। এসব বিপর্যয়ের পেছনের কারণগুলো দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত, কিন্তু সমাধান অধরাই থেকে গেছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশন উভয়ই বারবার যে কারণগুলো চিহ্নিত করেছে সেগুলো হলো- বেপরোয়া গতি ও বিপজ্জনক ওভারটেকিং, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক, মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার, ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ, মহাসড়কে রোড সাইন ও পর্যাপ্ত আলোকসজ্জার অভাব এবং পরিবহন খাতে সামগ্রিক সুশাসনের অনুপস্থিতি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এআই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দেশের মোট যানবাহনের ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল এবং এর একটি বড় অংশ চালায় কিশোর-তরুণরা, যারা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালায়; বিআরটিএ, বিআরটিসি, ডিটিসিএ, পুলিশ, সিটি কর্পোরেশনসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় সম্পৃক্ত থাকলেও তাদের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত দুর্বল এবং জবাবদিহিতা প্রায় অনুপস্থিত। ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের রোড সেফটি প্রকল্পের পক্ষ থেকে সড়ক নিরাপত্তা আইন দ্রুত প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী সরাসরি বলেছেন, পরিবহন সেক্টর পরিচালনার পদ্ধতি আপাদমস্তক সংস্কার জরুরি এবং আমলাতন্ত্রের পরিবর্তে দেশি-বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞদের নিয়ন্ত্রণে পরিবহন সেক্টর পরিচালনা করা গেলে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব হবে। পরিস্থিতি উত্তরণে একাধিক সংগঠন যেসব সুপারিশ করেছে তার মধ্যে রয়েছে- সড়ক নিরাপত্তায় বাজেট বৃদ্ধি, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে আলাদা নিরাপত্তা উইং চালু, বাধ্যতামূলক ৬০ ঘণ্টার ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ছাড়া লাইসেন্স না দেওয়া, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশার নতুন নিবন্ধন বন্ধ, যানবাহনে বাধ্যতামূলকভাবে স্পিড গভর্নর স্থাপন, জাতীয় মহাসড়কে রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, ডিজিটাল পদ্ধতিতে যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি পরিবহন খাতের প্রতিটি সিদ্ধান্তে ভুক্তভোগী যাত্রীদের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা।
মোহাম্মদ আলী সুমন
সাংবাদিক ও সংগঠক
