পারিবারিক সহিংসতা সবার আগে নিরাপদ করতে হবে নিজের ঘর
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে পারিবারিক সহিংসতা বাড়ছে, এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যেখানে পরিবারকে ভাবা হয় নিরাপদ আশ্রয়, সেখানেই স্বজনের হাতে স্বজন খুনের ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ভাবার কারণ নেই, পরিসংখ্যানেই বাস্তব পরিস্থিতির চিত্র পাওয়া যায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৪ মাসে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ১১৫ শিশু। তাদের মধ্যে পারিবারিক পরিমণ্ডলে নির্যাতনে মারা গেছে ২৫ শিশু। একই সময়ে শিশুদের ওপর ১৯৯টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে, যার বড় অংশ ঘটেছে পারিবারিক পরিমণ্ডলে। নারীর ওপর সহিংস ঘটনা ঘটেছে ১৪১টি, যেগুলোর মধ্যে ৫৬ জন নারী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তার স্বামীর দ্বারা; স্বামীর পরিবার দ্বারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৮ জন এবং নিজের পরিবারের দ্বারা ২১ জন। পরিসংখ্যান আরও দেওয়া যেতে পারে। তবে পারিবারিক সহিংসতার এটুকু তথ্যই শিউরে ওঠার মতো। মা-বাবার হাতে সন্তান, সন্তানের হাতে মা-বাবা, কিংবা স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা এখন প্রাত্যহিক সংবাদে পরিণত হয়েছে। যে মানুষটির ওপর সবচেয়ে বেশি ভরসা করার কথা, তার হাতেই যখন জীবন দিতে হয়, তখন সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতাই প্রকাশ পায়।
প্রশ্ন হলো, কেন ঘটছে পারিবারিক সহিংসতা; ভরসার মানুষও কেন হয়ে উঠছে ভয়ংকর? বস্তুত এ সহিংসতার মূলে রয়েছে নৈতিক মূল্যবোধের অভাব এবং চরম অসহিষ্ণুতা। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব মানুষের বিবেককে ভোঁতা করে দিচ্ছে। মাদকের ভয়াবহ বিস্তার এবং অনলাইনের অশ্লীল ও সহিংস উপাদানগুলো মানুষের চিন্তাজগৎকে বিষিয়ে দিচ্ছে। পারিবারিক অপরাধগুলোকে অনেক সময় ‘অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়’ মনে করে এড়িয়ে যাওয়া হয়। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীকে আরও বেপরোয়া করে তোলে। সবকিছু মিলিয়ে বাড়ছে পারিবারিক সহিংসতা।
এ ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। আইনের শাসন জোরদার করার পাশাপাশি প্রয়োজন একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন। প্রয়োজন পারিবারিক মূল্যবোধের পুনর্গঠন। শৈশব থেকেই শিশুকে সহনশীলতা, ধৈর্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা দিতে হবে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। পরিবারে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রতিবেশীর ওপর সহিংসতার বিষয়ে সমাজকে সচেতন হতে হবে। কোনো সহিংস ঘটনাকে অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় ভেবে নীরব থাকার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সন্তানের জন্য অভিভাবকদের সময় দিতে হবে; সন্তান কী করছে, কী শিখছে, কোথায় যাচ্ছে-এসব দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। মোট কথা, পারিবারিক বন্ধন যাতে শিথিল হয়ে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
একটি সুন্দর ও সুস্থ সমাজ গঠনের প্রথম ধাপ হলো- একটি নিরাপদ পরিবার। ঘর যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে বাইরে উন্নয়নের জোয়ার দিয়েও রাষ্ট্রের প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই সবার আগে নিরাপদ করতে হবে নিজের ঘরকে।
