বাজেট হোক বাস্তবতার রূপরেখায়

মুহিবুল হাসান রাফি

প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের আসন্ন বাজেটকে ঘিরে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা শুধু অর্থনীতিবিদদের টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই; এর অভিঘাত পৌঁছে গেছে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত। রাজধানীর নিম্ন-মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী আসাদুজ্জামানের সংসারের গল্প আজ দেশের লাখো পরিবারের প্রতিচ্ছবি। আয় স্থির, কিন্তু ব্যয় প্রতিদিন বেড়ে চলেছে। বাজারে ডিম, সবজি, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে গ্যাস, পরিবহন-সব কিছুর মূল্যবৃদ্ধি মানুষের জীবনকে ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এমন বাস্তবতায় রেকর্ড ঘাটতির বাজেট নিঃসন্দেহে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি বাজেট প্রণয়নের পথে হাঁটছে। এটি দেশের জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ। অর্থনীতির ভাষায় এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং এর অর্থ হলো সরকারকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিতে হবে। বিদেশি ঋণের পাশাপাশি দেশীয় ব্যাংক থেকেও বড় অঙ্কের ধার করতে হবে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত পড়ে সাধারণ মানুষের ওপরই। কারণ ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বাড়লে উন্নয়ন ব্যয় কমে যায়, আবার নতুন কর আরোপ বা ভর্তুকি কমানোর পথও খুলে যায়।

এমন এক সময়ে এই বাজেট আসছে, যখন দেশ টানা তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ভয়াবহভাবে ক্ষয় করেছে। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এক বছরের ব্যবধানে কিছু সবজির দাম ৮০ থেকে ১১৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ডিম, মুরগি, চাল, গ্যাস-সবখানেই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। অথচ মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি। ফলে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ভাঙছে, নিম্নবিত্ত ঋণে জর্জরিত হচ্ছে, আর দরিদ্র মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই নির্দেশনা- ‘নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করা যাবে না’ -অবশ্যই ইতিবাচক বার্তা। কিন্তু শুধু নির্দেশনা দিলেই হবে না; বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কীভাবে ঘাটতি সামাল দেবে, অথচ জনগণের ওপর বাড়তি চাপও সৃষ্টি করবে না? এখানেই বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ।

প্রথমত, বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন ঘাটতির চেয়ে বেশি দায়ী হচ্ছে সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি ও অস্বচ্ছ সরবরাহ ব্যবস্থা। কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না, আবার ভোক্তাকেও চড়া দাম গুনতে হয়-এ বৈপরীত্য দূর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে নীতিগত স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। কারণ জ্বালানির দাম বাড়লেই তার প্রভাব প্রতিটি পণ্যের ওপর পড়ে। তৃতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। যখন একজন সাধারণ চাকরিজীবী মনে করেন ‘জাতীয় বাজেটের ঘাটতি মানেই তার সংসারে নতুন চাপ’, তখন বুঝতে হবে অর্থনীতির সংকট শুধু সংখ্যার সংকট নয়; এটি আস্থার সংকটও। সরকারকে তাই এমন বাজেট দিতে হবে, যা শুধু উন্নয়নের কাগুজে প্রতিশ্রুতি নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার বাস্তব রূপরেখা তুলে ধরে। রাষ্ট্রের বাজেট বড় হতে পারে, ঘাটতিও বড় হতে পারে; কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে যদি স্বস্তির জায়গা ছোট হতে থাকে, তবে সেই বাজেট কখনই সফল বলা যাবে না। সর্বোপরি, বাজেট হোক বাস্তবতার রূপরেখায়।

মুহিবুল হাসান রাফি

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ