বাংলাদেশের উন্নয়নে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল

প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিসংখ্যান দিয়ে কখনও পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন নাগরিকরা ন্যায্য সেবা পান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয় এবং সমাজে ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের কঠোর বাস্তবতায় এই লক্ষ্য অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্নীতি। এটি এখন শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামো, অর্থনীতি ও সামাজিক মূল্যবোধের গভীরে প্রোথিত এক ভয়াবহ সমস্যা।

আন্তর্জাতিক সংস্থা Transparency International -এর দুর্নীতি ধারণা সূচক মতে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিকভাবে দুর্নীতির উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে। সাম্প্রতিক সূচকে দেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৪, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক নিচে। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি দেশের শাসনব্যবস্থা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জনসেবার বাস্তব চিত্রকেই সামনে আনে। দুর্নীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান সরকারি সেবাখাতে। ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিস, ট্রাফিক বিভাগ, ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রায়ই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হতে হয়। ফলে রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায় এবং এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক ঘুষনির্ভর সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যা সাধারণ নাগরিকের ভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশেও দুর্নীতি একটি বড় বাধা। দেশের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান Centre for Policy Dialogue -এর গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার ক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক জটিলতা অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধক। অনেক উদ্যোক্তার ধারণা, নিয়ম মেনে কাজ করার চেয়ে অনানুষ্ঠানিক উপায়ে কাজ সম্পন্ন করলে সময় কম লাগে এবং ব্যক্তিগত লাভও বেশি হয়। এর ফলে নতুন উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হন এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আস্থা হারান।

দুর্নীতির আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো অবৈধ অর্থ পাচার। Global Financial Integrity এবং Transparency International Bangladesh -এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়। এই অর্থ দেশে বিনিয়োগ করা গেলে কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারত। কিন্তু দুর্নীতি সেই সম্ভাবনাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে। দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোকেও ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে। শিক্ষা খাতে ভর্তি বাণিজ্য, নিয়োগে অনিয়ম এবং অতীতে প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কিছুটা শক্তিশালী হলেও এসব ঘটনার প্রভাব সমাজে এখনো রয়ে গেছে। ফলে অনেক তরুণ মনে করে, যোগ্যতার চেয়ে ‘প্রভাব’ বা ‘সংযোগ (লিংক)’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ- যা একটি জাতির জন্য পরিতাপের বিষয়। বেসরকারি সংস্থা Bangladesh Youth Leadership Center (BYLC) Ges BRAC University -এর Center for Peace and Justice (CPJ)-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৮৯ শতাংশ তরুণ মনে করেন, দুর্নীতি বাংলাদেশের উন্নয়ন, শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। এই ফলাফল ইঙ্গিত করে যে তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রীয় সুশাসন ও ন্যায়বিচার নিয়ে গভীরভাবে সচেতন এবং তারা পরিবর্তন প্রত্যাশা করেন। স্বাস্থ্য খাতেও দুর্নীতির প্রভাব সরাসরি মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। সরকারি হাসপাতালে সেবা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, নিম্নমানের চিকিৎসা সরঞ্জাম, প্রতারক চক্রের বিড়ম্বনা এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। এতে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ তাদের বিকল্প সুযোগ সীমিত। উন্নয়ন প্রকল্পেও দুর্নীতির চিত্র স্পষ্ট। সড়ক, সেতু, ভবন বা অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে নিম্নমানের কাজ এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ প্রায়ই উঠে আসে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই এসব প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জনগণের করের টাকা অপচয় হয়। এতে রাষ্ট্রীয় বাজেটে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয় এবং উন্নয়নের গতি মন্থর হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সংস্থা World Bank -এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিতা এবং সুশাসন। কিন্তু দুর্নীতি এই তিনটি ভিত্তিকেই দুর্বল করে , যার ফলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

দুর্নীতির সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ে নৈতিক মূল্যবোধের ওপর। যখন মানুষ দেখে অসৎ উপায়ে দ্রুত সফল হওয়া সম্ভব, তখন সততা ও পরিশ্রমের প্রতি আস্থা কমে যায়। তরুণদের একটি অংশ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে যোগ্যতার চেয়ে অনৈতিক উপায়ই বেশি কার্যকর। এই মানসিকতা একটি জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত ক্ষতিকর। তবে দুর্নীতি মোটেই অদম্য বাস্তবতা নয়। প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ প্রশাসন, ডিজিটাল সেবা, শক্তিশালী জবাবদিহিতা ব্যবস্থা, মনিটরিং, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে দুর্নীতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসন ও সততাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দুর্নীতি শুধু অর্থ চুরি করে না- এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ, ন্যায়বিচার এবং পারস্পরিক আস্থাকেও ধ্বংস করে দেয়। ঋষি মনুর বচনে আছে- ‘রাজ্ঞো হি রক্ষাধিকৃতা : পরস্বাদায়িন : শঠা :/ভূতা ভবন্তি প্রায়েণ তেভ্যো রক্ষেদিমা : প্রজা :’ অর্থাৎ, রাজার পক্ষ থেকে প্রজাদের রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরা অনেক সময় পরধনলোভী ও প্রতারক হয়ে ওঠে; তাই শাসকের কর্তব্য হলো তাদের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষা করা।

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল

শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ