আন্তর্জাতিক চা দিবস : বিশ্ব ও বাংলাদেশের চা শিল্পের ইতিহাস
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এক কাপ গরম চায়ে চুমুক না দিলে যেন আমাদের সকালটাই শুরু হতে চায় না। অবসাদ দূর করতে, বন্ধুদের আড্ডায় কিংবা বৃষ্টিভেজা বিকালে এক পেয়ালা চায়ের কোনো বিকল্প নেই। পানির পরে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পানীয় হলো চা। হাজার বছর ধরে চলে আসা এই সুগন্ধী পানীয়টির ইতিহাস যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি এর বিশ্বব্যাপী বিস্তৃতির গল্পও দারুণ চমকপ্রদ।
চায়ের এই দীর্ঘ যাত্রাপথের প্রথম বাঁকে আমাদের দৃষ্টি দিতে হয় এর নামের রহস্যের দিকে। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, ‘চা’ শব্দটির উৎপত্তি মূলত প্রাচীন চীন দেশ থেকে। চীনের মূল ম্যান্ডারিন ভাষায় একে বলা হতো ‘ছা’। তবে দক্ষিণ চীনের সমতল উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে ফুজিয়ান প্রদেশের স্থানীয় ‘মিন নান’ উপভাষায় এর উচ্চারণ ছিল ‘তে’ (Te)। এই দুটি উচ্চারণই পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে দুটি ভিন্নরূপ ধারণ করে বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, চায়ের আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক দারুণ কিংবদন্তি। খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩৭ অব্দে চীনের সম্রাট শেন নুং একদিন বাগানে বসে পানি ফুটাচ্ছিলেন। এমন সময় বাতাস এসে বুনো চা গাছের কয়েকটি পাতা তার ফুটন্ত পানির পাত্রে ফেলে দেয়। পানিটির রং বদলে যায় এবং সম্রাট সেই সুগন্ধী পানীয় পান করে এক অদ্ভুত সতেজতা অনুভব করেন। এভাবেই প্রথম মানবসভ্যতার সঙ্গে চায়ের পরিচয় ঘটে, যা প্রাথমিকভাবে ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চায়ের এই ঔষধি রূপটির এক বিশাল বিবর্তন ঘটে। সপ্তম শতাব্দীতে ট্যাং রাজবংশের আমলে চা চীনের জাতীয় পানীয়তে পরিণত হয়। এরপর বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মাধ্যমে এটি জাপানে পৌঁছায় এবং সেখানে আধ্যাত্মিক চায়ের আচারের রূপ নেয়। সপ্তদশ শতকে ডাচ ও ব্রিটিশ বণিকদের হাত ধরে চা ইউরোপে প্রবেশ করে এবং তা আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হয়। ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক আকাঙ্ক্ষার কারণেই পরবর্তীতে ভারত ও বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে চা চাষের সূচনা হয়। বিশ্বের সামগ্রিক চা শিল্পের কথা বলতে গেলে সবার আগে আসে বর্তমান পৃথিবীর শীর্ষ চা উৎপাদনকারী দেশ চীনের নাম। প্রায় ৩.৭৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন চা উৎপাদন করে চীন বর্তমানে বিশ্বের এক নম্বর চা উৎপাদনকারী পরাশক্তি। চীনের ফুজিয়ান, ইউনান এবং সিচুয়ান প্রদেশকে চায়ের মূল কেন্দ্র বলা চলে, যেখানে গ্রিন টি, ওলং টি এবং ব্ল্যাক টিসহ হাজারও জাতের চা উৎপাদিত হয়।
এই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। প্রায় ১.২৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন চা উৎপাদন করে ভারত বিশ্ববাজারে তার দাপট বজায় রেখেছে। আসামের বিশাল উপত্যকা এবং দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি ঢালে উৎপাদিত অনন্য স্বাদের চা সারা বিশ্বে সমাদৃত।
পূর্ব আফ্রিকার দেশ কেনিয়া বর্তমান বিশ্বে চা উৎপাদনের তালিকায় তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে। প্রতি বছর কেনিয়ায় প্রায় ৫,৭০,০০০ থেকে ৫,৯৮,৪৭০ মেট্রিক টন চা উৎপাদিত হয়।
চায়ের আদি রূপ ‘সিলন টি’ এর দেশ শ্রীলঙ্কা এই তালিকার চতুর্থ স্থানে রয়েছে। দেশটির বার্ষিক চা উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ২,৬২,১৬০ থেকে ২,৮০,০০০ মেট্রিক টন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি ভিয়েতনাম চা উৎপাদনে বিশ্বের পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে। ভিয়েতনাম প্রতি বছর প্রায় ২,১৪,০০০ থেকে ২,৬০,০০০ মেট্রিক টন চা উৎপাদন করে থাকে। ইউরেশিয়ার দেশ তুরস্ক এই তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে নিজের অবস্থান সুসংহত করেছে। কৃষ্ণ সাগরের উপকূলবর্তী রিজে (জরুব) অঞ্চলে প্রতি বছর প্রায় ২,১২,০০০ থেকে ২,৫০,০০০ মেট্রিক টন চা উৎপন্ন হয়।
হাজারো দ্বীপের দেশ ইন্দোনেশিয়া চা উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বে সপ্তম স্থানে রয়েছে। দেশটির বার্ষিক চা উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১,৪০,০০০ থেকে ১,৪৮,০০০ মেট্রিক টন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান চা উৎপাদনের তালিকায় অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে। কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী গিলান প্রদেশে প্রতি বছর প্রায় ৮৫,০০০ থেকে ১,৬০,০০০ মেট্রিক টন চা উৎপাদিত হয়। সূর্যোদয়ের দেশ জাপান চা উৎপাদনের বৈশ্বিক তালিকায় নবম স্থানে রয়েছে। বার্ষিক প্রায় ৭৪,০০০ থেকে ৮৯,০০০ মেট্রিক টন চা উৎপাদন করে তারা। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা এই তালিকার দশম স্থানটি দখল করে রেখেছে। প্রতি বছর আর্জেন্টিনা প্রায় ৮৫,৪০১ মেট্রিক টন চা উৎপাদন করে। বৈশ্বিক মানচিত্র থেকে এবার চোখ ফেরানো যাক আমাদের আপন আলয় দক্ষিণ এশিয়ার দিকে। ভূ-রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক কারণে দক্ষিণ এশিয়াকে চায়ের একটি উর্বর কেন্দ্রভূমি বলা চলে। দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ উৎপাদক ভারত তার বিশাল চা বাগান ও উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে এই অঞ্চলে একক আধিপত্য বজায় রেখেছে।
এই অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদক দেশ হলো শ্রীলঙ্কা। অর্থনৈতিক নানা সংকট সত্ত্বেও দেশটির ‘সিলন টি’ ব্র?্যান্ডের খ্যাতি এখনও আন্তর্জাতিক বাজারে অক্ষুণ্ণ রয়েছে। শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি মূলত এই চা রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। হিমালয়ের পাদদেশের দেশ নেপালও এখন চা শিল্পে বেশ দ্রুত উন্নতি করছে। নেপালের ইলাম ও ধঙ্কুটা অঞ্চলের চা দার্জিলিং চায়ের মতোই সুগন্ধযুক্ত ও সুস্বাদু হয়। দক্ষিণ এশিয়ার আরেক রাষ্ট্র পাকিস্তান চা উৎপাদনের চেয়ে চা আমদানিতে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। তবে সম্প্রতি তারা খাইবার পাখতুনখোয়া এবং আজাদ কাশ্মীরের পাহাড়ি অঞ্চলে চা চাষের পরীক্ষামূলক বিস্তার শুরু করেছে।
পাহাড়ি দেশ ভুটানও গ্রিন টি এবং অর্গানিক চা চাষের দিকে ঝুঁকছে। ভুটানের সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও রাসায়নিকমুক্ত পরিবেশে উৎপাদিত অর্গানিক চা আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।
এবার আমরা প্রবেশ করব আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের চায়ের সবুজ সাম্রাজ্যে। ১৮৪০ সালে চট্টগ্রাম ক্লাবের পাশে প্রথম চা গাছ রোপণ করা হলেও এ দেশে বাণিজ্যিক চায়ের ইতিহাস শুরু হয় ১৮৫৭ সালে সিলেটের ‘মালনীছড়া’ চা বাগানের মাধ্যমে। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ অবধি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই চা শিল্প। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান চা উৎপাদনকারী দেশ হলো আমাদের বাংলাদেশ। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বে চা উৎপাদনে নবম থেকে দশম স্থানে উঠানামা করছে এবং ২০২৩ সালে ১০২ মিলিয়ন কেজি উৎপাদনের রেকর্ড গড়ে ২০২৫ সালে ৯৪.৯১ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন করেছে। বাংলাদেশের চায়ের স্বাদ ও গুণগত মান অত্যন্ত উন্নত। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের চা বাগানগুলো মূলত পাহাড়ি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলাদেশের চা চাষে এক বৈপ্লবিক বিবর্তন ঘটে। সমতল ভূমিতে, বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে চা চাষের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়, যা দেশের সামগ্রিক উৎপাদনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের সর্বশেষ ২০২৫-২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ১৭১টি বাণিজ্যিক চা বাগান রয়েছে। বিভাগভিত্তিক হিসাব করলে দেখা যায়, দেশের সিংহভাগ চা বাগান সিলেট বিভাগে অবস্থিত। সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলায় রয়েছে ১৪০টিরও বেশি বাগান। চট্টগ্রাম বিভাগে রয়েছে ২২টি বাগান এবং অবশিষ্টাংশ উত্তরবঙ্গের রংপুর বিভাগে অবস্থিত। ২০২৫ সালের চূড়ান্ত হিসাবে বাংলাদেশে রেকর্ড পরিমাণ ৯৪.৯১ মিলিয়ন কেজি (৯ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার কেজি) চা উৎপাদিত হয়েছে, যা পূর্ববর্তী ২০২৪ সালের ৯৩.০৪ মিলিয়ন কেজি থেকে প্রায় ২.০১ শতাংশ বেশি। ২০২৬ সালের জন্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০৪ মিলিয়ন কেজি। বাংলাদেশের চা শিল্পের এক বড় সাফল্য হলো উত্তরবঙ্গের সমতল ভূমির চা চাষ। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, লালমনিরহাট এবং নীলফামারী জেলার সমতলে বর্তমানে ১১,৬০০ একরের বেশি জমিতে চা চাষ হচ্ছে। ২০২৫ মৌসুমে কেবল উত্তরবঙ্গের সমতল থেকেই ২.০২ কোটি কেজির বেশি উৎপাদিত চা দেশের সামগ্রিক উৎপাদনে প্রায় ২১ শতাংশ অবদান রেখেছে। সমতলের চাষীদের সুবিধার্থে ২০২৩ সালে পঞ্চগড়ে দেশের তৃতীয় চা নিলাম কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।
তবে এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের আড়ালে কিছু জলবায়ুগত চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও তীব্র খরার কারণে দেশের প্রধান চা উৎপাদনকারী অঞ্চল মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রামে উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়েছিল। এই বৈশ্বিক ও দেশীয় চা শিল্পকে সম্মান জানাতে এবং এর পেছনে থাকা লাখো শ্রমিকের অবদানকে স্মরণ করতে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ২১ মে ‘আন্তর্জাতিক চা দিবস’ পালিত হয়। পূর্বে চা উৎপাদনকারী দেশগুলো ১৫ ডিসেম্বর এই দিবসটি পালন করলেও ২০১৯ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার অনুমোদনের পর ২০২০ সাল থেকে ২১ মে আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। চলতি ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক চা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে- ‘ফস্টারিং গ্রোথ অ্যান্ড ইনক্লুশন’ (Fostering Growth and Inclusion), যার অর্থ ‘প্রবৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তির লালন’। এই প্রতিপাদ্যের মূল লক্ষ্য হলো চা শিল্পের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা, বিশেষ করে নারী চা শ্রমিক ও ক্ষুদ্র চাষিদের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সাধন এবং একটি পরিবেশবান্ধব, টেকসই চা সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলা।
পরিশেষে বলতে চাই, সবুজ পাতার দুটি কুঁড়ি আর একটি একটি করে হাত দিয়ে তোলা সেই পাতাগুলো যখন আমাদের কাপে এসে সুগন্ধী তরলে রূপ নেয়, তার পেছনে লুকিয়ে থাকে কোটি মানুষের শ্রম ও ভালোবাসা। চায়ের ইতিহাস শুধু একটি পানীয়ের ইতিহাস নয়, এটি মানুষের সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং সভ্যতার মেলবন্ধনের এক অনন্য উপাখ্যান। আন্তর্জাতিক চা দিবসের এই শুভক্ষণে আমাদের চায়ের প্রতি ভালোবাসা যেমন অক্ষুণ্ণ থাকবে, তেমনি চা শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রান্তিক মানুষগুলোর অধিকার ও শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে- এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রাবন্ধিক, কথা সাহিত্যিক ও প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল।
