কোরবানি হোক সুবিধাবঞ্চিতদের পুষ্টির উৎস

আমানুর রহমান

প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ মুসলিম উম্মাহর জন্য শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি আত্মত্যাগ ও সামাজিক সাম্যের এক অনন্য নিদর্শন। এই উৎসবের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো নিজের প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় উৎসর্গ করার মাধ্যমে সমাজের অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় প্রাণিজ আমিষের উপস্থিতি একেবারেই নগণ্য। এই বাস্তবতায়, কোরবানির মাংস শুধু একটি উৎসবের অনুষঙ্গ নয়, বরং এটি হতে পারে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দীর্ঘদিনের আমিষের চাহিদা পূরণের এক মোক্ষম উপায়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কোরবানির মাংসের তিন ভাগের এক ভাগ গরিব-দুঃখীদের হক, যা কোনো দয়া বা অনুকম্পা নয়, বরং তাদের ন্যায্য অধিকার।

পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন তার শরীরের প্রতি কিলোগ্রাম ওজনের বিপরীতে গড়ে ০.৮ থেকে ১ গ্রাম প্রোটিন বা আমিষের প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে একজন সাধারণ মানুষের দৈনিক অন্তত ৫০ থেকে ৬০ গ্রাম আমিষ গ্রহণ করা আবশ্যক, যার একটি বড় অংশ আসা উচিত প্রাণিজ উৎস থেকে। কিন্তু বর্তমান বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য এই ন্যূনতম চাহিদা মেটানোও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আমিষের এই দীর্ঘস্থায়ী অভাবের কারণে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রোটিনের অভাবে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিপজ্জনকভাবে কমে যাচ্ছে এবং মেধার বিকাশ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে পেশি ক্ষয়, রক্তশূন্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি তাদের দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। কোরবানির মাংস এসব অভাবী মানুষের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে অতিপ্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি মেটানোর একটি চমৎকার সুযোগ তৈরি করে দেয়।

কোরবানির মাংস বণ্টনের ক্ষেত্রে আমাদের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং আরও যৌক্তিক হওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ নিজেদের আত্মীয়স্বজন এবং পরিচিত মহলেই মাংসের বড় অংশ বিলিয়ে দেন, ফলে প্রকৃত অভাবী মানুষেরা তাদের প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত হন। অথচ ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী দরিদ্রদের জন্য নির্ধারিত মাংস তাদের কাছে সম্মানজনকভাবে পৌঁছে দেওয়া কোরবানিদাতার নৈতিক দায়িত্ব। এই বণ্টন প্রক্রিয়ায় যদি আমরা আরও সুপরিকল্পিত হই, তবে সমাজের কোনো স্তরের মানুষই এই আনন্দের দিনে অভুক্ত থাকবে না। একটি নির্দিষ্ট এলাকার সামর্থ্যবান মানুষেরা যদি সম্মিলিতভাবে মাংস বিতরণের উদ্যোগ নেন, তবে তা বিক্ষিপ্ত বিতরণের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ও ফলপ্রসূ হতে পারে, যার মাধ্যমে প্রকৃত অভাবীদের সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব।

সুবিধাবঞ্চিতদের আমিষের চাহিদা দীর্ঘমেয়াদে পূরণের জন্য শুধু একদিনের মাংস বিতরণই যথেষ্ট নয়, বরং এই মাংস সংরক্ষণের বিষয়েও প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন। দরিদ্র মানুষের ঘরে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফ্রিজ বা সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা থাকে না। বর্তমানে অনেক স্বেচ্ছাসেবী ও দাতব্য সংস্থা কোরবানির মাংস সংগ্রহ করে তা স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে হিমায়িত করে এবং সারা বছর ধরে এতিমখানা বা বস্তিবাসীর মধ্যে বিতরণ করে। এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে আমরা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পুষ্টিহীনতা দূর করার ক্ষেত্রে একটি টেকসই সমাধান পেতে পারি। পাশাপাশি, দরিদ্রদের ঐতিহ্যবাহী উপায়ে মাংস সংরক্ষণের কৌশল সম্পর্কে সচেতন করলেও তারা দীর্ঘদিন এই আমিষের জোগান নিশ্চিত করতে পারবেন।

কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা নিহিত রয়েছে ত্যাগের মহিমায় এবং অপরের প্রতি সহমর্মিতায়। পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই কোরবানিদাতার তাকওয়া বা পরহেজগারি আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। এই তাকওয়ার অন্যতম প্রমাণ হলো সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও অবহেলিত মানুষটির মুখে হাসি ফোটানো। আমাদের সামান্য একটু সচেতনতা ও সদিচ্ছা পারে একজন পুষ্টিহীন শিশুর থালায় এক টুকরো পুষ্টিকর মাংস তুলে দিতে। আসুন, এবারের কোরবানিতে আমরা শুধু নিজেদের ফ্রিজ ভর্তি করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হয়ে, প্রকৃত হকদারদের খুঁজে বের করি। আমাদের উৎসর্গীকৃত পশুর মাংস হোক সুবিধাবঞ্চিত হাজারও মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণের প্রধান হাতিয়ার, আর ঈদ হোক সবার জন্য সত্যিকার অর্থে আনন্দ ও পুষ্টির উৎসব।

আমানুর রহমান

কবি ও কলাম লেখক চাষাড়া, নারায়ণগঞ্জ