প্রবাসে বাবার সুখের সন্ধান স্বদেশে সন্তানের নরকবাস
ফয়সল আহমদ বাবুল
প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষ সভ্য হয়েছে, প্রযুক্তি এগিয়েছে, উন্নয়নের গল্প পৌঁছে গেছে আকাশচুম্বী উচ্চতায়। কিন্তু মানুষের ভেতরের অন্ধকার কি সত্যিই কমেছে? নাকি সভ্যতার চাকচিক্যের আড়ালে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে নিষ্ঠুরতা? সম্প্রতি ১০ বছরের শিশু হাফেজ তাহসিনকে ঘিরে প্রকাশ পাওয়া নির্যাতনের ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এটি শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি সমাজের বিবেকের ওপর নির্মম আঘাত। এটি পরিবার নামক নিরাপদ আশ্রয়ের ভেতরে জন্ম নেওয়া এক ভয়াবহ দানবীয় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
শিশুরা পৃথিবীতে আসে ভালোবাসা পাওয়ার জন্য। মায়ের কোল তাদের প্রথম আশ্রয়, পরিবার তাদের প্রথম বিদ্যালয়। কিন্তু সেই পরিবারই যখন নির্যাতনে কারাগারে পরিণত হয়, তখন সমাজের ভিত্তি কেঁপে ওঠে। তাহসিনের গল্প ঠিক তেমনই এক অন্ধকার কাহিনী। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে একটি শিশু নিজের ঘরের ভেতরে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তার কান্না চাপা পড়েছে দেয়ালের ভেতরে, তার আর্তনাদ হারিয়ে গেছে মানুষের ব্যস্ততায়। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই নির্যাতনের সহযোগী ছিলেন তার নিজের মা এবং দুই খালা। বাংলা সংস্কৃতিতে ‘মা’ শব্দটি সবচেয়ে পবিত্র অনুভূতির প্রতীক। মায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নিরাপত্তা, মমতা, আশ্রয় ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
সেই মায়ের হাতেই যখন শিশুর ক্ষতস্থানে লবণ ও মরিচ লাগানোর অভিযোগ ওঠে, তখন ভাষা হারিয়ে যায়। মানবতা লজ্জিত হয়। বিবেক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, শিশুটিকে হাত বেঁধে নির্যাতন করা হতো। কাঠ, রড ও ভারী বস্তু দিয়ে মারধর করা হতো। মুখ বেঁধে রাখা হতো যাতে চিৎকার বাইরে না যায়। এ যেন মধ্যযুগীয় কোনো নির্যাতন কক্ষ। অথচ ঘটনাটি ঘটেছে আধুনিক শহরের একটি বাসায়, মানুষের বসবাসের মাঝখানে। এই ঘটনা আমাদের সামনে কয়েকটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। পরিবার কি আজও নিরাপদ? সমাজ কি ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে? প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের দায়বদ্ধতা কোথায়? শহুরে জীবনে মানুষ এখন দেয়ালের ভেতরে বন্দি। এক ফ্ল্যাটের মানুষ অন্য ফ্ল্যাটের খবর জানে না। কেউ কারও কান্না শোনে না, কেউ কারও ব্যথা দেখতে চায় না। ‘আমার নয়’ সংস্কৃতি ধীরে ধীরে মানবিকতাকে হত্যা করছে। এই নীরবতাই অনেক সময় অপরাধীদের সাহসী করে তোলে। তবে সব অন্ধকারের মধ্যেও কিছু আলো থাকে। এই ঘটনাতেও ছিল। কয়েকজন তরুণ প্রতিবেশী সন্দেহ করেছিলেন।
তারা নীরব থাকেননি। খোঁজ নিয়েছেন, জরুরি সেবায় যোগাযোগ করেছেন। শেষ পর্যন্ত পুলিশ এসে শিশুটিকে উদ্ধার করেছে। এই তরুণদের মানবিক সাহস আমাদের আশাবাদী করে। সমাজ পুরোপুরি মৃত হয়নি। এখনও কিছু মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে জানে। এখনও কিছু তরুণ বিবেকের ডাক শুনে এগিয়ে আসে।
বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বলছে, প্রতি বছর অসংখ্য শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। অনেক ঘটনা প্রকাশই পায় না। অনেক শিশু ভয়, লজ্জা কিংবা পারিবারিক চাপে মুখ খুলতে পারে না। ফলে অপরাধীরা থেকে যায় আড়ালে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, পারিবারিক সহিংসতা শিশুর মনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত তৈরি করে। এতে শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, তারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। কিছু ক্ষেত্রে আত্মহত্যাপ্রবণতাও তৈরি হয়। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনাকে ঘিরে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। কেউ কেউ ঘটনার সত্যতা যাচাই না করেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেছেন। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এটি অত্যন্ত দায়িত্বহীন আচরণ। অপরাধের বিচার হওয়া উচিত সত্যের ভিত্তিতে, গুজবের ভিত্তিতে নয়। কোনো নির্দোষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে জড়িয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো সমাজকে আরও অস্থির করে তোলে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ এখন সময়ের দাবি। তাহসিনের প্রবাসী বাবার কথাও আমাদের ভাবায়। হাজারো প্রবাসীর মতো তিনিও পরিবারের সুখের জন্য দূরে শ্রম দিচ্ছিলেন।
কিন্তু নিজের সন্তানের জীবনে কী ভয়াবহ অন্ধকার নেমে এসেছে, তা তিনি জানতেন না। একজন বাবার এই অসহায়ত্ব সত্যিই হৃদয়বিদারক। এই ঘটনার বিচার শুধু আদালতের বিষয় নয়, এটি সমাজের আত্মসমালোচনারও বিষয়। আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধ কোথায় যাচ্ছে? কেন মানুষ এত নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে? কেন শিশুরা নিরাপদ নয়?
আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি।
মূল অপরাধী এবং সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অপরাধীর কোনো পরিচয় নেই। সে মা হোক, বাবা হোক কিংবা আত্মীয় হোক, শিশুর প্রতি নির্যাতনের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় চলতে পারে না। একই সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। প্রতিবেশীদের আরও মানবিক হতে হবে। শিশুর আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখলে খোঁজ নিতে হবে। পরিবার, স্কুল ও মাদ্রাসাকে শিশু সুরক্ষায় আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও কাজ করতে হবে। তাহসিন আজ শুধু একটি নাম নয়, সে আমাদের সমাজের আহত প্রতিচ্ছবি। তার শরীরের ক্ষত আমাদের সভ্যতার ব্যর্থতার সাক্ষী। তার নীরব কান্না আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করছে। আমরা কি সত্যিই মানুষ হতে পেরেছি, নাকি শুধু আধুনিকতার মুখোশ পরে আছি? তাহসিনের বিচার নিশ্চিত হোক, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক, মানবিকতা ফিরে আসুক মানুষের ভেতরে। কারণ একটি শিশুর কান্নার চেয়ে বড় আর কোনো বিচার নেই।
ফয়সল আহমদ বাবুল
শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক সিনিয়র শিক্ষক, সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদ্রাসা, সদর, সিলেট
