অর্থনীতির সংকট উত্তরণে চাই কঠোর ও সাহসী সংস্কার
প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বব্যাংক ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি জরুরি সতর্কবার্তাও। গত মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে প্রকাশ- টানা ৩ বছর মন্থর প্রবৃদ্ধি, অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি, ভঙ্গুর ব্যাংক খাত এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ভয়াবহ স্থবিরতা- এই চার ঘূর্ণিপাকে পড়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি আজ সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয়- ৩৫ বছরের মধ্যে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আজ সর্বনিম্ন পর্যায়ে। শিল্প ও কৃষি-অর্থনীতির এ দুটি মূল স্তম্ভের প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাওয়ায় কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা জেঁকে বসছে, যার সরাসরি আঘাত এসে পড়ছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ওপর। উচ্চ মূল্যস্ফীতির বিপরীতে মজুরি না বাড়ায় মানুষের প্রকৃত আয় এখন ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে; যার অর্থ নতুন করে আরও ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, রেমিট্যান্সের সম্ভাব্য পতন এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি এই সংকটকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আমরা মনে করি, অর্থনীতির এ ঝুঁকি সামাল দিতে হলে বিগত সরকারের মতো জোড়াতালির সংস্কার কিংবা চর্বিতচর্বণ নীতি গ্রহণ করে কোনো সুফল মিলবে না। বরং সংকট উত্তরণে নিতে হবে কিছু কঠিন ও অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত। এজন্য প্রথমেই দরকার ব্যাংক খাতে বড় ধরনের সংস্কার। জরুরিভিত্তিতে মূলধন জোগান দেওয়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা এবং সুশাসন ফিরিয়ে আনা ছাড়া আর্থিক খাতের এ রক্তক্ষরণ বন্ধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এছাড়া রাজস্ব আহরণেও আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। কর ফাঁকি ও দুর্নীতি রোধে কর প্রশাসনকে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করতে হবে, যেন সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকারের ব্যয় বাড়ানোর সক্ষমতা তৈরি হয়।
পাশাপাশি শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নয়, দরকার সরবরাহব্যবস্থায় চাঁদাবাজি রোধ, দুর্নীতি এবং বাজার সিন্ডিকেট দমনের মতো কঠোর পদক্ষেপ। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের বাজারকে সুশৃঙ্খল করতে হবে। বেসরকারি বিনিয়োগ সচল করতে আমলাতান্ত্রিক হয়রানি বন্ধ করে ব্যবসায়ীদের মনে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। অর্থনীতির এই ক্রান্তিলগ্নে সরকার অবিলম্বে কঠোর অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হবে- এটাই প্রত্যাশা।
