কর্মক্ষেত্রে নারীরা এখনও নানাবিধ বৈষম্যের শিকার

মুহিবুল হাসান রাফি

প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং টেকসই সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে নারীরা শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন, কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যাংকিং, গার্মেন্টসসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে নারীশ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কর্মক্ষেত্রে নারীরা এখনও নানাবিধ বৈষম্য, নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছেন। তাই নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে শুধু তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেই হবে না, বরং একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশে বর্তমানে মোট কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৪১ লাখ, যার মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তাদের অধিকাংশই নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। কর্মক্ষেত্রে নারীরা প্রায়ই মৌখিক, মানসিক, শারীরিক এবং যৌন হয়রানির শিকার হন। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, পোশাকশিল্পে কর্মরত প্রায় ৮৪.৭ শতাংশ নারীশ্রমিক কোনো না কোনো সময় মৌখিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৭১.৩ শতাংশ মানসিক নির্যাতন, ২০ শতাংশ শারীরিক নির্যাতন এবং ১২.৭ শতাংশ যৌন হয়রানির শিকার হন। এসব ঘটনা নারীদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করে। কর্মক্ষেত্রে নারীরা সবচেয়ে বেশি যে সমস্যার সম্মুখীন হন তা হলো মজুরি বৈষম্য। একই ধরনের কাজ করেও নারীশ্রমিকরা পুরুষদের তুলনায় কম মজুরি পান। সমাজে নারীর শ্রমকে এখনো যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, নারীশ্রমিকদের একটি বড় অংশ দৈনিক খুবই কম মজুরি পান। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীশ্রমিকরা অধিক মাত্রায় বৈষম্যের শিকার হন। একজন নারী গৃহকর্মী যেখানে মাসিক ৩৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা পারিশ্রমিক পান, সেখানে একই ধরনের কাজের জন্য একজন পুরুষ কেয়ারটেকার পান প্রায় দ্বিগুণ অর্থ। ফলে নারীরা আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়েন এবং তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ব্যাহত হয়। এই বৈষম্য নারীর ক্ষমতায়নের পথে একটি বড় অন্তরায়। বাংলাদেশের কৃষি খাতেও নারীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে নারীরা নীরবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। জমি প্রস্তুত করা, বীজ বপন, আগাছা পরিষ্কার, ফসল মাড়াই, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগি পালনসহ কৃষিকাজের প্রায় প্রতিটি ধাপে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৮১ শতাংশ নারী গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি কৃষিকাজে সরাসরি অবদান রাখেন। অথচ তাদের এই শ্রমকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রম হিসেবেই গণ্য করা হয় না। অনেক নারীই বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন, আবার অনেকে বাজারমূল্যের চেয়ে কম মজুরি পান। কৃষি খাতে একজন নারীশ্রমিক পুরুষের তুলনায় প্রায় ৪৩ শতাংশ কম মজুরি পান। এটি শুধু বৈষম্যই নয়, বরং নারীর মর্যাদা ও অধিকারের প্রতি অবহেলার বহিঃপ্রকাশ। উধষষু অফরহ

গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পের বড় অংশজুড়ে রয়েছেন নারী শ্রমিকরা। দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে এই খাত থেকে। কিন্তু এখানেও নারীশ্রমিকদের জীবন খুব সহজ নয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, স্বাস্থ্যঝুঁকি, মাতৃত্বকালীন সুবিধার অপ্রতুলতা এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের প্রতিনিয়ত কষ্ট দেয়। অনেক সময় তারা অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য হন; কিন্তু সেই অনুযায়ী পারিশ্রমিক পান না। সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে তারা বাধ্য হয়েই এসব অন্যায় মেনে নেন।

নারীদের শিক্ষার অভাবও তাদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। আমাদের দেশের শ্রমজীবী নারীদের একটি বড় অংশ স্বল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত। ফলে তারা দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন এবং ঝুঁকিপূর্ণ ও কম মজুরির কাজে নিয়োজিত থাকতে বাধ্য হন। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাবে তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কেও সচেতন হতে পারেন না। ফলে সহজেই তারা শোষণের শিকার হন। আধুনিক বিশ্বে দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান ছাড়া ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়া কঠিন। তাই নারীদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও নারীর অগ্রগতির পথে বড় বাধা। আমাদের সমাজ এখনো অনেকাংশে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় পরিচালিত। অনেকেই মনে করেন, নারীর প্রধান কাজ শুধুই সংসার সামলানো। ফলে অনেক নারী ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পরিবারের চাপে কর্মজীবন থেকে সরে যেতে বাধ্য হন। আবার কর্মজীবী নারীদের সংসারের সব দায়িত্বও পালন করতে হয়। অফিসে দীর্ঘ সময় কাজ করার পর ঘরে ফিরেও রান্না, সন্তান লালন-পালন, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের দেখাশোনা করতে হয়। কিন্তু এই গৃহস্থালি শ্রমের কোনো আর্থিক মূল্যায়ন করা হয় না। অথচ এটি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই নারীদের ঘরের কাজকেও শ্রম হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন কার্যকর আইন এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন। যৌন হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কঠোরব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। নারীরা যেন ভয়ের পরিবেশে নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে পারেন, সে পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

নারীদের নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নারী প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হন। গণপরিবহনে নিরাপত্তাহীনতা নারীদের কর্মজীবনে অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই বড় শহরগুলোতে নারীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা, গণপরিবহনে নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং সিসিটিভি ও নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। মজুরি বৈষম্যদূর করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই কাজের জন্য নারী ও পুরুষকে সমান মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের জন্য একটি সুষম মজুরি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নারীশ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুষত্ব কেন্দ্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব বৃদ্ধি করাও জরুরি। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে তাদের সমস্যা ও প্রয়োজনগুলো আরও গুরুত্ব পাবে। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য শিক্ষা সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তাই নারীদের আধুনিক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়াতে হবে। গ্রামীণ নারীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে যাতে তারা

আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারেন। তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কাজ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে নারীদের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও অত্যন্ত জরুরি। নারীদের কাজকে ছোট করে দেখার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে নারী-পুরুষ সমতার ধারণা গড়ে তুলতে হবে। নারীদের সম্মান করতে হবে এবং তাদের সক্ষমতার প্রতি আস্থা রাখতে হবে। একটি উন্নত সমাজ গঠনের জন্য নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পরিশেষে বলা যায়, নারীর নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন ছাড়া কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল করতে হলে কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য নিরাপদ, সম্মানজনক ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের শিক্ষা, দক্ষতা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়িত করতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবার-সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই নারীরা তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবেন। তখনই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

মুহিবুল হাসান রাফি

সাংবাদিক ও কলামিস্ট