মানুষ ভয় নয়, আশা নিয়ে বাঁচবে
আবদুল হামিদ মাহবুব
প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কয়েকদিন ধরে দেশের বাইরে আছি, কিন্তু দেশের খবর থেকে দূরে নই। প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইউটিউব চ্যানেল আর অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঘেঁটে বাংলাদেশের রাজনীতি, সরকারের তৎপরতা বোঝার চেষ্টা করছি। একটি চমৎকার দৃশ্য আমাকে বিশেষভাবে ভাবিয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে মতবিনিময়ে গিয়েছিলেন। পুরো অনুষ্ঠানটি ছিল অনেকটা আনুষ্ঠানিকতার বাইরে, স্বাভাবিক এবং আন্তরিক এক আলাপচারিতা।
অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে বললেন, চলো না আমরা শুরু করি। কথাটা খুব সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ বাক্যের মধ্যেই ছিল দূরত্ব কমিয়ে আনার একটি প্রচেষ্টা। তারপর তিনি আরও সহজভাবে বললেন, আমি জানতে চাই আপনারা কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান? বাংলাদেশের জন্য আমরা কী করতে পারি? আর বাংলাদেশের জন্য আপনারা কী করতে পারেন? একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মুখে এই ধরনের প্রশ্ন শুনে আমার মনে হয়েছে, দেশের রাজনীতিতে হয়তো নতুন ধরনের এক ভাষা ফিরে আসছে; যেখানে নির্দেশের চেয়ে সংলাপ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আর ক্ষমতার চেয়ে অংশগ্রহণ বড়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা যে কথাগুলো বলেছে, তার ভেতরে ছিল দেশের বর্তমান বাস্তবতা, স্বপ্ন আর হতাশার মিশ্র প্রতিফলন। তারা বলেছে কর্মসংস্থানের কথা। তারা বলেছে শিক্ষার মান নিয়ে। তারা বলেছে এমন একটি বাংলাদেশের কথা, যেখানে মেধার মূল্য থাকবে, দুর্নীতি কমবে, প্রশাসন মানুষের জন্য কাজ করবে, আর রাজনৈতিক ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখা হবে না।
অনেক শিক্ষার্থী বলেছে, তারা এমন বাংলাদেশ চায়, যেখানে চাকরির জন্য বিদেশে পালাতে হবে না। তারা দেশে থেকেই নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে কাজ করতে চায়। কেউ কেউ বলেছে, তারা এমন রাষ্ট্র চায় যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেওয়ার জায়গা হবে না; বরং চিন্তা, গবেষণা আর নতুন উদ্ভাবনের কেন্দ্র হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তরুণরা শুধু সরকারের কাছে দাবি জানায়নি; তারা নিজেদের দায়িত্বের কথাও বলেছে। তারা বলেছে, দেশ গড়ার কাজ শুধু সরকারের নয়।
নাগরিক হিসেবেও তাদের ভূমিকা আছে। সততা, মানবিকতা আর সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে তারা একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে চায়। প্রধানমন্ত্রীও ছাত্র-ছাত্রীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন; তরুণদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং তরুণ নেতৃত্ব তৈরির বিষয়ে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে তরুণ সমাজকে রাখা হবে।
আমি বলি এমন প্রতিশ্রুতি আমরা অতীতেও অনেক শুনেছি। তাইতো বলছি প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না। মানুষ এখন বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান, ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক সহনশীলতা কিংবা প্রশাসনিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি সমাধান হয়নি। এখানেই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মানুষ আসলে কেমন দেশ চায়? আমার মনে হয়, এ দেশের মানুষ খুব বেশি কিছু চায় না। তারা চায় নিরাপদে বাঁচতে। সন্তানদের ভালো শিক্ষা দিতে।
চিকিৎসা পেতে। সৎভাবে কাজ করে সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে। তারা চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে আইনের চোখে সবাই সমান হবে। যেখানে ক্ষমতাবান আর সাধারণ মানুষের জন্য আলাদা বিচার থাকবে না। মানুষ এমন বাংলাদেশ চায়, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু শত্রুতা থাকবে না। যেখানে নির্বাচন নিয়ে ভয় থাকবে না। যেখানে সাংবাদিক সত্য কথা বলতে পারবে। যেখানে একজন কৃষক তার ন্যায্য মূল্য পাবে, একজন শ্রমিক তার প্রাপ্য মজুরি পাবে, আর একজন শিক্ষার্থী তার স্বপ্ন দেখার অধিকার হারাবে না।
যারা দেশের বাইরে আছেন, তারাও বাংলাদেশের পরিবর্তন চাস। কারণ পৃথিবীর যেখানেই তারা থাকেন না কেনো, বাংলাদেশের পরিচয়ই তাদের পরিচয়। দেশের ভালো খবর শুনলে গর্ব হয়, খারাপ খবর শুনলে কষ্ট পাস।
তাই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের এমন খোলামেলা আলোচনা তাদেরও আশাবাদী করেছে। তারেক রহমান সতের বছর দেশের বাইরে ছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই প্রবাসীদের মনোভাব বুঝতে পারবেন। তাই আমার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে এ পর্যন্ত যাদের দেখা ও কথা হয়েছে তাদের আশাবাদের কথা জানিয়েছেন। তবে এই দেশের ও দেশের বাইনের মানুষের আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে, শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। দরকার বিশ্বাসযোগ্য উদ্যোগ, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তরুণদের শুধু বক্তৃতার মঞ্চে ডাকলেই হবে না; রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়াতেও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
আজকের পৃথিবীতে যে দেশ তার তরুণদের শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে, সেই দেশই এগিয়ে যায়। বাংলাদেশও পারে।
আমাদের আছে মেধাবী তরুণ সমাজ, আছে অদম্য সম্ভাবনা। দরকার শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই আলাপচারিতা তাই শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি হতে পারে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের একটি প্রতীক। যেখানে সরকার শুনবে, তরুণরা বলবে, আর সবাই মিলে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখবে। আমরা সেই বাংলাদেশই দেখতে চাই। যে বাংলাদেশে মানুষ ভয় নয়, আশা নিয়ে বাঁচবে।
আবদুল হামিদ মাহবুব
সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক, সাবেক সভাপতি : মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব
