প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২২ মে, ২০২৬
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ, প্রিয়জনের সঙ্গে যুক্ত থাকাসহ বিশ্বের যেকোন প্রান্তের মানুষ সঙ্গে যোগাযোগ করার অন্যতম মাধ্যম। মোটামুটি যেকোনো বয়সের মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের একটা অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন। একুশ শতকের এই যুগে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো প্রতিবাদের সোচ্চার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ করে ফলপ্রসূ সমাধান আসতেও দেখা যায়। ভালোদিকের মাঝে এর অনেক খারাপ দিকও রয়েছে। কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য শেয়ার করা যায় বলে বর্তমানে অন্যকে অপমান করার জন্যও এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই গুজব ছড়ানো, উস্কানিমূলক স্ট্যাটাস দেওয়া অহরহ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৫.৭৯ বিলিয়ন, যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭২ শতাংশ। ব্যবহারকারীরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ ঘণ্টা ২১ মিনিট এসব প্ল্যাটফর্মে ব্যয় করেন। এদের মধ্যে ফেসবুক ব্যবহারকারী ৩.০৭ বিলিয়নের বেশি, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী ২ বিলিয়নের কাছাকাছি, টিকটক ব্যবহারকারী ১.৫ বিলিয়নের বেশি। বাংলাদেশের মানুষের কাছেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ২৫ লাখ।
বিপুল সংখ্যক মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলেও এখানে পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে। একাউন্ট খুলতে পর্যাপ্ত তথ্য উপাত্তের যাচাই-বাছাই করা হয় না, তাই যেকেউ যেকোনো উদ্দেশ্যে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে। আর মিথ্যা, বানোয়াট, উস্কানিমূলক স্ট্যাটাস দিতে নেওয়া হয় না যাচাই-বাছাই। আবার মুহূর্তে মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে বলে কারো সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে একজন সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হয়, প্রাথমিকভাবে সত্যতা প্রমাণ হওয়ার আগেই একজন সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার তার মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটায়, সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। বাকস্বাধীনতা সকলের রয়েছে তাই বলে যা খুশি তাই করা যাবে না।
বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ দমন, সাইবার স্পেসের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য বর্তমানে কার্যকর রয়েছে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬। সাইবার সুরক্ষা আইনের উদ্দেশ্য সাইবার স্পেসের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ ও দমন।
এর মূল বৈশিষ্ট্য: সাইবার আক্রমণ, হ্যাকিং, ডিজিটাল জালিয়াতি এবং অনলাইন হয়রানি রোধে এই আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। অনলাইন ব্যবহার করে কেউ কোনো অপরাধ করলে সংক্ষুব্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থানায় অভিযোগ করতে পারেন। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে অথবা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং টিমের পর্যবেক্ষণে যদি অপরাধ হয়েছে বলে যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে তাহলে অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেবে।
সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করে মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করতে পারবেন। পুলিশ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) ছাড়াও গ্রেপ্তার করতে পারে।
এ অপরাধ কিন্তু জামিন-অযোগ্য। কোনো অপরাধী, ব্যক্তি বা সংগঠনের ফেসবুক, স্কাইপ, টুইটার বা ইন্টারনেটের যে কোনো মাধ্যমের অপরাধ-সংশ্লিষ্ট আলাপ-আলোচনা ও কথাবার্তা অথবা অপরাধ-সংশ্লিষ্ট স্থির ও ভিডিওচিত্র অপরাধের আলামত হিসেবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আদালতে উপস্থাপন করতে পারবেন এবং আদালতে আমলযোগ্য হবে। অর্থাৎ সাক্ষ্য আইনে যাই থাকুক না কেন, মামলার স্বার্থে তা আদালতের গ্রহণযোগ্য হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩)-এর ৫৭ (দুই) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে অপরাধ করলে তিনি শাস্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
আমরা অনেকেই এসব আইন ও শাস্তি সম্পর্কে না জেনে অ্যাকাউন্ট খুলে অনৈতিক কাজে যুক্ত হই এবং ভোক্তভোগিরা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে না। সচেতন নাগরিক হিসেবে সকলের উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা।
আর যাদের সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয় তাদের উচিত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা। রাষ্ট্রীয়ভাবে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা, সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো আর অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা, যেন কেউ সাইবার অপরাধে যুক্ত না হয়। সর্বোপরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সকলের জন্য নিরাপদ হবে- এটাই কাম্য।
নুসরাত সুলতানা
শিক্ষার্থী, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়