ঢাকা শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

যত্রতত্র পশুর হাট এবং জিম্মি নগরবাসী এই ভোগান্তির শেষ কোথায়?

যত্রতত্র পশুর হাট এবং জিম্মি নগরবাসী এই ভোগান্তির শেষ কোথায়?

পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদ আমাদের ত্যাগ, আত্মশুদ্ধি এবং আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু প্রতি বছরই এই আনন্দের আবহের সমান্তরালে রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের জন্য নেমে আসে এক চরম ভোগান্তির অধ্যায়। এর অন্যতম প্রধান কারণ- রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক, অলিগলি এবং আবাসিক এলাকাগুলো বন্ধ করে যত্রতত্র কোরবানির পশুর হাট বসানো। নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে যেভাবে সড়ক দখল করে পশুর হাট বসানো হয়, তাতে মনে হয় যেন পুরো ঢাকা শহরই একটি বিশৃঙ্খল হাটে পরিণত হয়েছে, আর নাগরিকরা সেখানে জিম্মি।

দুই সিটি কর্পোরেশন প্রতি বছরই ঢাকা শহরের নির্দিষ্ট কিছু স্থানকে পশুর হাটের জন্য ইজারা দেয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইজারাদাররা তাদের জন্য নির্ধারিত সীমানা ছাড়িয়ে মূল সড়ক, ফুটপাত এমনকি মানুষের বাড়ির প্রবেশদ্বার পর্যন্ত হাটের পরিধি বাড়িয়ে নেয়। ফলে ঈদের চার-পাঁচ দিন আগে থেকেই রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। কর্মজীবী মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং জরুরি চিকিৎসাপ্রার্থী রোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হয়। একটি পশুর হাটের কারণে যদি পুরো শহরের গতি থমকে যায়, তবে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে আবাসিক এলাকাগুলোর ভেতরে। যেখানে মানুষের শান্তিতে বসবাসের কথা, সেখানে দিন-রাত পশুর ডাক, তীব্র দুর্গন্ধ এবং গোবরের স্তূপে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। বর্ষা মৌসুমে এই ভোগান্তি রূপ নেয় নরকে। সামান্য বৃষ্টিতেই পশুর বর্জ্য আর পানি মিশে যে একাকার অবস্থার সৃষ্টি হয়, তা কেবল চলাচলের অযোগ্যই নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। মশা-মাছির উপদ্রব এবং পানিবাহিত রোগের প্রকোপ এই সময়ে বহুগুণ বেড়ে যায়। একটি উৎসবের প্রস্তুতি কেন লাখ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হবে, সেই প্রশ্ন আজ এড়ানো অসম্ভব।

আইন অনুযায়ী, মূল সড়ক বা যাতায়াতের পথ বন্ধ করে কোনো হাট বসানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু প্রতি বছরই আমরা দেখি, একশ্রেণির প্রভাবশালী মহল এবং ইজারাদাররা স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তোয়াক্কা না করেই রাস্তা দখল করে পশুর খুঁটি গেড়ে বসে। সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে নামমাত্র উচ্ছেদ অভিযান বা জরিমানার কথা শোনা গেলেও, তা এই বিশাল অব্যবস্থাপনার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। তদারকি ও জবাবদিহিতার এই চরম ঘাটতিই ইজারাদারদের প্রতি বছর আরও বেশি বেপরোয়া করে তোলে।

ঢাকা এখন আর কোনো ছোট শহর নয়। প্রায় দুই কোটি মানুষের এই মেগাসিটিতে সনাতন পদ্ধতির এই যত্রতত্র হাট বসানোর সংস্কৃতি এবার বদলাতে হবে। শহরকে সচল রেখে উৎসব উদযাপনের জন্য আমাদের বিকল্প ভাবনায় যেতে হবে।

শহরের বাইরে স্থায়ী হাট : ঢাকার মূল সীমানার বাইরে, পূর্বাচল বা কেরানীগঞ্জের মতো উন্মুক্ত ও বড় স্থানে সুপরিকল্পিত স্থায়ী পশুর হাট স্থাপন করা যেতে পারে, যেখান থেকে ক্রেতারা অনায়াসে পশু কিনে নিতে পারবেন।

ডিজিটাল হাটের আধুনিকায়ন : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনলাইন বা ডিজিটাল হাটের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। একে আরও বেশি নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয় করে তুলতে হবে, যাতে যাতায়াতের ঝামেলা ছাড়াই মানুষ ঘরে বসে সুস্থ-সবল পশু কিনতে পারেন।

কোরবানির ঈদ উৎসবের, আনন্দের এবং ইবাদতের। কিন্তু অন্যকে কষ্ট দিয়ে, সাধারণ মানুষের চলাচলের অধিকার কেড়ে নিয়ে কোনো উৎসবই পূর্ণতা পেতে পারে না। আমরা চাই না পশুর হাটের এই ভোগান্তির কারণে মানুষের ঈদের আনন্দ বিষাদে পরিণত হোক।

সিটি কর্পোরেশন, পুলিশ প্রশাসন এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে আমাদের আকুল আবেদন- জনভোগান্তি সৃষ্টিকারী যেকোনো অবৈধ হাটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন। ঢাকাকে একটি আধুনিক ও সভ্যনগরী হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে রাস্তা বন্ধ করে পশুর হাট বসানোর এই আত্মঘাতী সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত