ঈদ ও নিত্যপণ্যের বাজার সিন্ডিকেটের কারসাজি আর কতকাল সইবে সাধারণ মানুষ?

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পবিত্র ঈদুল ফিতর কিংবা ঈদুল আজহা- যেকোনো উৎসবের আগমনী বার্তা যখনই আসে, এ দেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের মনে আনন্দের চেয়ে এক তীব্র উৎকণ্ঠা ভর করে। এই উৎকণ্ঠা উৎসবের প্রস্তুতির নয়, বরং নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামের। প্রতিটি উৎসবকে সামনে রেখে দেশের কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে মুদিবাজার পর্যন্ত সর্বত্রই শুরু হয় দাম বাড়ানোর এক উৎসব। দুঃখজনকভাবে, ২০২৬ সালেও এসে এই চেনা চিত্র বিন্দুমাত্র বদলায়নি। রমজান এবং আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে চাল, ডাল, তেল, চিনি, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে মাংসের দাম যেভাবে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে, তা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং চরম অমানবিক।

একটি উৎসবের মূল আনন্দ হলো সবার সঙ্গে মিলেমিশে খুশি ভাগ করে নেওয়া। কিন্তু বর্তমান বাজারের যে চিত্র, তাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকাই যেখানে কঠিন, সেখানে ঈদের আনন্দ উদযাপিত হবে কীভাবে? বাজারে গেলেই দেখা যায়, সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ব্রয়লার মুরগি, গরুর মাংস কিংবা মসলার বাজার যেন সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা। বিক্রেতাদের অজুহাতের কোনো শেষ নেই- কখনও সরবরাহ সংকট, কখনো আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পকেট কাটা হচ্ছে সাধারণ ভোক্তার।

সরকার প্রায়শই বাজার স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন পণ্য আমদানির অনুমতি দেয় এবং শুল্ক হ্রাস করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সুবিধার সুফল কার পকেটে যাচ্ছে? শুল্ক কমানোর পরও বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে না বললেই চলে। আমদানিকৃত পণ্য যখন খুচরা বাজারে আসে, ততক্ষণে তা সিন্ডিকেটের হাত ঘুরে সাধারণ মানুষের জন্য মহার্ঘ্য হয়ে ওঠে। পাইকারি ও খুচরা বাজারের এই বিশাল ব্যবধান প্রমাণ করে যে, দেশের বাজার ব্যবস্থা কোনো স্বাভাবিক নিয়মে চলছে না, একে নিয়ন্ত্রণ করছে একশ্রেণির অতিমুনাফালোভী চক্র।

বাজার নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা মাঝে মাঝে অভিযান চালায়, জরিমানা করে। কিন্তু এই লোক দেখানো ও সাময়িক অভিযান যে কোনো স্থায়ী সমাধান নিয়ে আসছে না, তা প্রতিদিনের বাজার দরই বলে দেয়। ম্যাজিস্ট্রেট বাজার থেকে চলে যাওয়ার পরপরই পরিস্থিতি আবার আগের রূপ নেয়। শুধু খুচরা বিক্রেতাদের জরিমানা করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; যতক্ষণ না পর্যন্ত আড়তদার ও বড় কর্পোরেট সিন্ডিকেটের মূল উপড়ে ফেলা যাচ্ছে, ততক্ষণ বাজার নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।

বছরের পর বছর ধরে চলা এই নৈরাজ্য আর কতদিন চলবে? উৎসবের মৌসুমে বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে আমাদের প্রথাগত তদারকির বাইরে এসে কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে-

সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ চেইন সচল রাখা : উৎপাদক থেকে শুরু করে ভোক্তার হাত পর্যন্ত পণ্য পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে মধ্যস্বত্বভোগী মুক্ত করতে হবে।

টিসিবির পরিধি বাড়ানো : শুধু কার্ডধারী নয়, ওএমএস এবং টিসিবির মাধ্যমে সাধারণ মধ্যবিত্তের জন্যও সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।

কঠোর আইন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি : যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মজুদদারি করছে, তাদের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।

ঈদ মানুষের জীবনে স্বস্তি ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু বাজারের এই ঊর্ধ্বগতি মানুষের সেই স্বস্তিকে কেড়ে নিচ্ছে। দেশের সিংহভাগ মানুষকে বাজারের আগুনে পুড়িয়ে গুটি কয়েক অসাধু ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকা লুটে নেবে- একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রে তা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা আশা করি, সরকার এবার শুধু আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ না থেকে, কঠোর হাতে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেবে। আসন্ন ঈদে সাধারণ মানুষের থালায় যেন অন্তত একমুঠো স্বস্তির খাবার জোটে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই। এই ভোগান্তির অবসান হোক, উৎসব হোক সবার জন্য আনন্দময়।