প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৫ মে, ২০২৬
মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ তিনটি সম্পদ হলো- মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা। এই তিনের প্রতি মমত্ববোধ কোনো কৃত্রিম শিক্ষার ফল নয়, বরং এটি মানুষের এক শাশ্বত ও সহজাত প্রবৃত্তি। প্রতিটি মানুষের অস্তিত্বের গভীরে এই তিনটি সত্তা এমনভাবে মিশে থাকে যে, এদের কোনো একটিকে বাদ দিলে জীবন শিকড়হীন বৃক্ষের মতো নিরাশ্রয় হয়ে পড়ে। পৃথিবীর আলো দেখার প্রথমলগ্ন থেকে জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা আমাদের পরম আশ্রয়, শক্তি ও নিরন্তর অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে। এই নিবন্ধে আমরা অন্বেষণ করার চেষ্টা করব কীভাবে এই তিনটি ভিন্ন সত্তা মূলত একই চেতনার সূত্রে গাঁথা এবং আমাদের আত্মপরিচয় ও জাতিসত্তা গঠনে এদের ভূমিকা কতটা অনস্বীকার্য। একজন মানুষের জীবনে প্রথম উচ্চারিত শব্দ এবং প্রথম নির্ভরতার নাম হলো ‘মা’। সৃষ্টির আদিকাল থেকে মাতৃত্বের যে মহিমা আমরা দেখে আসছি, তার কোনো বিকল্প পৃথিবীতে নেই। মা কেবল জন্মদাত্রীই নন, তিনি শিশুর জীবনের প্রথম শিক্ষক এবং বহির্বিশ্বের সাথে পরিচয়ের প্রধানতম মাধ্যম। গর্ভধারণের কষ্টসাধ্য সময় থেকে শুরু করে একটি সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলা পর্যন্ত একজন মা যে অসীম ত্যাগ স্বীকার করেন, তার কোনো পার্থিব মূল্য হয় না। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, শিশুর মানসিক ও আবেগীয় বিকাশের মূল ভিত্তি হলো মায়ের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক। মায়ের স্নেহের আঁচল শুধু একটি নিরাপত্তা বলয় নয়, বরং এটি একজন মানুষকে আদর্শ ও নীতিবান হয়ে ওঠার প্রাথমিক পাঠশালা। তাই মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি নিজের অস্তিত্বের মূলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নামান্তর। মায়ের মমতাময়ী ছায়ার পরেই অবধারিতভাবে আসে মাতৃভূমির কথা। মাতৃভূমিকে আমরা বলি ‘জন্মভূমি’, যা আমাদের অস্তিত্বের ভৌগোলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিশ্চিত করে। যে মা আমাদের রক্ত-মাংসে গড়ে তুলেছেন, আর যে মাটি আমাদের অন্ন, বস্ত্র ও আশ্রয় দিয়ে লালন-পালন করছে- এই দুইয়ের মধ্যে কোনো মৌলিক ব্যবধান নেই। দেশপ্রেম শুধু ভাবালুতা নয়, এটি একটি যৌক্তিক নাগরিক দায়বদ্ধতা। বিশ্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেসব জাতি তাদের মাতৃভূমিকে পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আগলে রেখেছে, তারাই উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে পেরেছে। আমাদের এই সবুজ-শ্যামল ভূখণ্ডের জন্য যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও বীরত্বপূর্ণ ত্যাগের ইতিহাস রয়েছে, তা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, মাতৃভূমি কোনো নিছক মানচিত্র বা ভূখণ্ড নয়; এটি আমাদের পরিচয় এবং আমাদের জাতীয় অহংকার। মাতৃভূমির অবমাননা করা মানে নিজের আত্মসম্মানকেই প্রকারান্তরে ধূলিসাৎ করা।
?মানুষের ভাব প্রকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও আপন মাধ্যম হলো মাতৃভাষা। মা ও মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের প্রধান হাতিয়ারও এই ভাষা। মাতৃভাষা শুধু কতগুলো বর্ণ বা শব্দের সমষ্টি নয়, এটি একটি জাতির সংস্কৃতি, সহস্রাব্দের ঐতিহ্য ও মৌলিক মূল্যবোধের ধারক। মানুষ তার স্বপ্নের জাল বুনে মাতৃভাষায় এবং হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতিগুলো সবচেয়ে নিপুণভাবে প্রকাশ করে এই ভাষাতেই। পৃথিবীর অন্য যেকোনো ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব; কিন্তু মাতৃভাষার মতো হৃদস্পন্দন ও সাবলীলতা অন্য কোনো বিদেশি ভাষায় খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। আমাদের ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রক্তঝরা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার জন্য বাঙালি জাতি প্রাণ দিতেও দ্বিধা করেনি। বায়ান্নর সেই আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে—ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা মানেই জাতির অস্তিত্বকে রক্ষা করা। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে বৈশ্বিক প্রয়োজনে অন্য ভাষা শেখার গুরুত্ব থাকলেও, নিজ ভাষাকে অবহেলা করা মানে নিজের আত্মপরিচয় বিসর্জন দেওয়া।
প্রকৃতপক্ষে মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা- এই তিনটি শব্দ একে অপরের পরিপূরক ও অবিচ্ছেদ্য। যে মানুষ নিজের মাকে যথাযোগ্য শ্রদ্ধা করে না, তার পক্ষে দেশের মাটিকে প্রকৃত অর্থে ভালোবাসা কঠিন; আর যে নিজের ভাষাকে তুচ্ছজ্ঞান করে, তার পক্ষে খাঁটি দেশপ্রেমিক হওয়া অসম্ভব। এই তিনের প্রতি যথাযথ দায়বদ্ধতা পালন করার অর্থই হলো একটি সার্থক ও পূর্ণাঙ্গ জীবন অতিবাহিত করা। আমরা যখন মাকে সম্মান করি, তখন মূলত জীবনের উৎসকেই শ্রদ্ধা জানাই। যখন আমরা দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করি, তখন আমরা সমষ্টিগত কল্যাণের পথ প্রশস্ত করি। আর যখন আমরা মাতৃভাষাকে লালন করি, তখন আমরা আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে সগৌরবে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেই। মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা কোনো বিশেষ দিবস বা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়। এটি আমাদের প্রাত্যহিক আচরণ, চিন্তা ও প্রতিটি কর্মে প্রতিফলিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। আজকের জটিল পৃথিবীতে যেখানে নৈতিক অবক্ষয় ও আত্মপরিচয়ের সংকট প্রকট হচ্ছে, সেখানে এই তিনটি মৌলিক স্তম্ভই হতে পারে আমাদের সঠিক পথের দিশারি। এই তিনের মর্যাদা রক্ষা করা এবং এদের সেবায় নিজেকে নিবেদিত করাই হোক আমাদের জীবনের প্রধান ব্রত। কারণ, এই ত্রিমাত্রিক বন্ধনেই গড়ে ওঠে একজন মানুষের পূর্ণাঙ্গ
কয়েকদিন ধরে দেশের বাইরে আছি, কিন্তু দেশের খবর থেকে দূরে নই। প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইউটিউব চ্যানেল আর অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঘেঁটে বাংলাদেশের রাজনীতি, সরকারের তৎপরতা বোঝার চেষ্টা করছি। একটি চমৎকার দৃশ্য আমাকে বিশেষভাবে ভাবিয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে মতবিনিময়ে গিয়েছিলেন। পুরো অনুষ্ঠানটি ছিল অনেকটা আনুষ্ঠানিকতার বাইরে, স্বাভাবিক এবং আন্তরিক এক আলাপচারিতা।
অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে বললেন, চল না আমরা শুরু করি। কথাটা খুব সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ বাক্যের মধ্যেই ছিল দূরত্ব কমিয়ে আনার একটি প্রচেষ্টা। তারপর তিনি আরও সহজভাবে বললেন, আমি জানতে চাই আপনারা কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান? বাংলাদেশের জন্য আমরা কী করতে পারি? আর বাংলাদেশের জন্য আপনারা কী করতে পারেন? একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মুখে এই ধরনের প্রশ্ন শুনে আমার মনে হয়েছে, দেশের রাজনীতিতে হয়তো নতুন ধরনের এক ভাষা ফিরে আসছে; যেখানে নির্দেশের চেয়ে সংলাপ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আর ক্ষমতার চেয়ে অংশগ্রহণ বড়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা যে কথাগুলো বলেছে, তার ভেতরে ছিল দেশের বর্তমান বাস্তবতা, স্বপ্ন আর হতাশার মিশ্র প্রতিফলন। তারা বলেছে কর্মসংস্থানের কথা। তারা বলেছে শিক্ষার মান নিয়ে। তারা বলেছে এমন একটি বাংলাদেশের কথা, যেখানে মেধার মূল্য থাকবে, দুর্নীতি কমবে, প্রশাসন মানুষের জন্য কাজ করবে, আর রাজনৈতিক ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখা হবে না। অনেক শিক্ষার্থী বলেছে, তারা এমন বাংলাদেশ চায়, যেখানে চাকরির জন্য বিদেশে পালাতে হবে না। তারা দেশে থেকেই নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে কাজ করতে চায়। কেউ কেউ বলেছে, তারা এমন রাষ্ট্র চায় যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেওয়ার জায়গা হবে না; বরং চিন্তা, গবেষণা আর নতুন উদ্ভাবনের কেন্দ্র হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তরুণরা শুধু সরকারের কাছে দাবি জানায়নি; তারা নিজেদের দায়িত্বের কথাও বলেছে। তারা বলেছে, দেশ গড়ার কাজ শুধু সরকারের নয়। নাগরিক হিসেবেও তাদের ভূমিকা আছে। সততা, মানবিকতা আর সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে তারা একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে চায়। প্রধানমন্ত্রীও ছাত্র-ছাত্রীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন; তরুণদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং তরুণ নেতৃত্ব তৈরির বিষয়ে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে তরুণ সমাজকে রাখা হবে। আমি বলি এমন প্রতিশ্রুতি আমরা অতীতেও অনেক শুনেছি। তাইতো বলছি প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না। মানুষ এখন বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান, ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক সহনশীলতা কিংবা প্রশাসনিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি সমাধান হয়নি। এখানেই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মানুষ আসলে কেমন দেশ চায়? আমার মনে হয়, এ দেশের মানুষ খুব বেশি কিছু চায় না। তারা চায় নিরাপদে বাঁচতে। সন্তানদের ভালো শিক্ষা দিতে। চিকিৎসা পেতে। সৎভাবে কাজ করে সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে। তারা চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে আইনের চোখে সবাই সমান হবে। যেখানে ক্ষমতাবান আর সাধারণ মানুষের জন্য আলাদা বিচার থাকবে না।
মানুষ এমন বাংলাদেশ চায়, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু শত্রুতা থাকবে না। যেখানে নির্বাচন নিয়ে ভয় থাকবে না। যেখানে সাংবাদিক সত্য কথা বলতে পারবে। যেখানে একজন কৃষক তার ন্যায্য মূল্য পাবে, একজন শ্রমিক তার প্রাপ্য মজুরি পাবে, আর একজন শিক্ষার্থী তার স্বপ্ন দেখার অধিকার হারাবে না। যারা দেশের বাইরে আছেন, তারাও বাংলাদেশের পরিবর্তন চায়। কারণ পৃথিবীর যেখানেই তারা থাকেন না কেন, বাংলাদেশের পরিচয়ই তাদের পরিচয়। দেশের ভালো খবর শুনলে গর্ব হয়, খারাপ খবর শুনলে কষ্ট পায়। তাই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের এমন খোলামেলা আলোচনা তাদেরও আশাবাদী করেছে। তারেক রহমান সতের বছর দেশের বাইরে ছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই প্রবাসীদের মনোভাব বুঝতে পারবেন। তাই আমার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে এ পর্যন্ত যাদের দেখা ও কথা হয়েছে তাদের আশাবাদের কথা জানিয়েছেন। তবে এই দেশের ও দেশের বাইনের মানুষের আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে, শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। দরকার বিশ্বাসযোগ্য উদ্যোগ, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
তরুণদের শুধু বক্তৃতার মঞ্চে ডাকলেই হবে না; রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়াতেও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আজকের পৃথিবীতে যে দেশ তার তরুণদের শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে, সেই দেশই এগিয়ে যায়। বাংলাদেশও পারে। আমাদের আছে মেধাবী তরুণ সমাজ, আছে অদম্য সম্ভাবনা। দরকার শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই আলাপচারিতা তাই শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি হতে পারে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের একটি প্রতীক। যেখানে সরকার শুনবে, তরুণরা বলবে, আর সবাই মিলে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখবে। আমরা সেই বাংলাদেশই দেখতে চাই। যে বাংলাদেশে মানুষ ভয় নয়, আশা নিয়ে বাঁচবে।