ঢাকা সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মূল্যায়ন সংকটে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
মূল্যায়ন সংকটে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

‘একটি নম্বর শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি’- বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এই বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। দেশের প্রায় ৩৫ লাখ শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করছেন। দেশের উচ্চশিক্ষা গ্রহণেচ্ছু শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭০ শতাংশই এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের অসংখ্য শিক্ষার্থী এখান থেকেই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। দেশের বৃহত্তম উচ্চশিক্ষা কাঠামোগুলোর একটি হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন ব্যবস্থা কতটা স্বচ্ছ, ন্যায্য ও নির্ভুলতা শুধু শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের সঙ্গেই নয়, দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। গত ১১ মে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ৩য় বর্ষের (সেশন ২০২১-২২) ফল প্রকাশিত হয়েছে। ফলাফলের পর যথারীতি পুনর্মূল্যায়ন বা রিচেকের আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে, যেখানে প্রতি বিষয়ে প্রায় ১২০০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। বিষয়টি নতুন নয়; কয়েক বছর ধরেই এই উচ্চ ফি বহাল রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- খাতা মূল্যায়নে ভুল বা অসঙ্গতি থাকলে সেই ভুল সংশোধনের দায়ভার কেন শিক্ষার্থীকেই অর্থ দিয়ে বহন করতে হবে? আর পুনর্মূল্যায়নের জন্য এত উচ্চ ফি আদায় কতটা যৌক্তিক? শিক্ষাব্যবস্থায় মূল্যায়ন শুধু পরীক্ষার ফল নয়; এটি একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা ও সম্ভাবনার স্বীকৃতি। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা অসন্তোষ রয়েছে। অনেকের অভিযোগ, ভালো পরীক্ষা দিয়েও আশানুরূপ ফল আসে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিতভাবে কম নম্বর, ফেল কিংবা ফলাফলে মারাত্মক অসঙ্গতি দেখা যায়।

এসব অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে- পৃথিবীর দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন ব্যবস্থা কি যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে? পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে ঘিরেও রয়েছে নানা বিতর্ক। একজন শিক্ষার্থী যখন প্রতি বিষয়ে ১২০০ টাকা ব্যয় করে পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করেন, তখন ধরে নেওয়াই স্বাভাবিক যে তিনি নিজের পরীক্ষার মান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। কারণ অধিকাংশ মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীর জন্য এই অর্থ মোটেও ছোট অঙ্ক নয়। অনেক সময় একাধিক বিষয়ে রিচেক করতে গিয়ে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়ে যায়। ফলে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বহু শিক্ষার্থী পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন। বাস্তবে দেখা যায়, পুনর্মূল্যায়নের পর অনেক শিক্ষার্থীর ফলাফলে পরিবর্তন আসে। কোথাও ফেল থেকে পাস, কোথাও গ্রেড বৃদ্ধি, আবার কোথাও বিভাগ পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটে। যদিও সবার ফল পরিবর্তিত হয় না, তবুও যেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসে, সেগুলো অন্তত এটুকু প্রমাণ করে যে প্রাথমিক মূল্যায়নে ভুল বা অসঙ্গতির সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রশ্ন হলো, যদি মূল্যায়ন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নির্ভুল হতো, তাহলে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কেন পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করতেন? বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতায় আরও কিছু অসঙ্গতির বিষয় উঠে এসেছে। দেখা যায়, প্রথম বর্ষে ফেল করা কোনো বিষয়ে চতুর্থ বর্ষে গিয়েও পুনরায় পরীক্ষা দিয়েও আশানুরূপ ফল পাচ্ছেন না। এসব ঘটনা মূল্যায়ন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। অপ্রত্যাশিত ফল শুধু শিক্ষাগত ক্ষতিই নয়, অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও মানসিক চাপও সৃষ্টি করে। বিশেষ করে চাকরি, স্কলারশিপ কিংবা উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে একটি নম্বরই কখনও কখনও ভবিষ্যতের গতিপথ বদলে দেয়। ‘Bangladesh Institute of Development Studies (BIDS)’-এর বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা অনেক গ্র্যাজুয়েট চাকরির বাজারে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতার অভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। যদিও এর পেছনে একক কোনো কারণ নেই, তবুও দুর্বল মূল্যায়ন কাঠামো, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা এবং দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নের অভাবকে অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে- বর্তমান মূল্যায়ন ব্যবস্থা কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা যাচাই করতে পারছে? আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক দেশ উচ্চশিক্ষায় স্বচ্ছ ও শিক্ষার্থীবান্ধব মূল্যায়ন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, শ্রীলঙ্কাতে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও চূড়ান্ত পরীক্ষার সমন্বয়ে ফল নির্ধারণ করা হয়। অনেক দেশে শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র দেখার সুযোগ, অনলাইন মূল্যায়ন রুব্রিক্স এবং ডিজিটাল স্ক্রুটিনির ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কিছু বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। খাতা মূল্যায়নে জবাবদিহিতা ও মান নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতে হবে। পুনর্মূল্যায়ন ফি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। কারণ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের। প্রমাণিত ভুলের ক্ষেত্রে ফি ফেরতের ব্যবস্থাও চালু করা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র দেখার সুযোগ কিংবা মূল্যায়ন ব্যাখ্যার ব্যবস্থা চালু করা হলে স্বচ্ছতা ও আস্থা দুটোই বাড়বে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় কাঠামো। তাই এই প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন ব্যবস্থার প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি নম্বর শুধু ফলাফল নয়; এটি একজন শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা, কর্মজীবন ও ভবিষ্যৎ জীবনের দিকনির্দেশনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে মূল্যায়ন ব্যবস্থার সংকট শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি সরাসরি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিক্ষার ন্যায্য অধিকারের প্রশ্ন। এখন সময় এসেছে এই সংকটকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে একটি স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত ও আধুনিক মূল্যায়ন কাঠামো গড়ে তোলার। শিক্ষার্থীদের পরিশ্রমের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি একটি নৈতিক মানবিক দায়িত্ব।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত