খেলাপি ঋণের বোঝা বহন করে ডিজিটাল ব্যাংকিং কতদূর যাবে

মো. শাহিন আলম, কলামিস্ট ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ, যা তৎকালীন বিশ্বে সর্বোচ্চ। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের এনপিএল অনুপাত যেখানে ছিল ২৬ শতাংশ, আর্থিক সংকটে জর্জরিত তিউনিসিয়ায় ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাওয়া আর্জেন্টিনায় মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের এই অবস্থান ব্যাংকিং খাতের চরম দুরবস্থাকেই স্পষ্ট করে। অতি সম্প্রতি, ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সর্বশেষ প্রতিবেদন নিশ্চিত করেছে যে, বাংলাদেশ এখনও এশিয়ার সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশ। এখানে বিপর্যস্ত সম্পদ আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেড়েছে এবং সংস্থাটি দেশের ব্যাংক খাতকে সরাসরি এ অঞ্চলের সবচেয়ে ভঙ্গুর আর্থিক ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই নড়বড়ে বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়েই এখন দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা চলছে।

পরিসংখ্যানের আলোকেই যদি দেখি, ২০২৪ সালে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মোট লেনদেন প্রায় ১৭ দশমিক ৩৭ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালে এমএফএস-এর মাধ্যমে রেমিট্যান্স এসেছে ২০,২৩৬ কোটি টাকা, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। অন্যদিকে, সক্রিয় এমএফএস ব্যবহারকারীর হার ২০১৯ সালের ২৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালের মার্চে ৪৩ দশমিক ৮২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তদুপরি, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ইন্টারঅপারেবিলিটি চালু হওয়ায় ব্যাংক হিসাব, বিকাশ, নগদ ও রকেটসহ সব প্ল্যাটফর্ম এখন একটি একক কাঠামোয় যুক্ত। নির্ধারিত ফি দিয়ে সরাসরি অর্থ স্থানান্তরের এই বাস্তব অর্জনগুলোকে কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই।

কিন্তু আর্থিক প্রবেশাধিকার আর প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি কখনও এক জিনিস নয়, এই সত্যটা স্বীকার করা দরকার। ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী বাংলাদেশিদের ৫১ দশমিক ৭ শতাংশের কোনো না কোনো আর্থিক হিসাব থাকলেও, মাত্র ২৮ দশমিক ৩ শতাংশের রয়েছে প্রকৃত ব্যাংক হিসাব। বাকি বিশাল জনগোষ্ঠী এখনও এমএফএস হিসাবের ওপর নির্ভরশীল, যা দৈনন্দিন লেনদেনে কার্যকর হলেও ঋণ, সঞ্চয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সীমিত। এর চেয়েও বড় কথা হলো, খাতায়-কলমে হিসাব থাকা আর তা সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। লাখ লাখ মানুষ শুধু অ্যাকাউন্ট খুলে রাখলেও নিয়মিত লেনদেন করেন খুব সামান্যসংখ্যক মানুষ। ফলে, নিবন্ধনপত্রে যে সংখ্যাটি রেকর্ড হয়, তা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রকৃত পরিমাপক নয়; এটি শুধুই নাম নথিভুক্তির পরিসংখ্যান। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি স্বীকার না করলে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থায়নের অগ্রগতির কোনো সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন সম্ভব নয়।

অবশ্য এই ব্যবস্থাটি যেখানে সফল হয়েছে, সেখানে তার ইতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। রেমিট্যান্স প্রবাহ ত্বরান্বিত করা থেকে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতিকে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল বা হুন্ডির কবল থেকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে এমএফএস-এর অর্থনৈতিক অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে, এই ব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে আছেন নারী গ্রাহকরা, যারা জীবনের প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন নারী যখন নিজের মোবাইল অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখেন, তখন প্রকারান্তরে তিনি নিজের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের স্বাধীনতাও লাভ করেন, যা শুধু একটি আর্থিক লেনদেন নয়, একটি কাঠামোগত রূপান্তর। একই সঙ্গে, দেশের ৮০ শতাংশের বেশি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় সরকারি সামাজিক সুরক্ষার অর্থ সরাসরি সুবিধাভোগীদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের দৌরাত্ম্য কমে এসেছে, যা সংবাদমাধ্যমে কম আলোচিত হলেও গভীরতার দিক থেকে যেকোনো অর্জনের চেয়ে কম নয়। এতসব অর্জনের সমান্তরালে এই ব্যবস্থার কিছু কাঠামোগত ব্যর্থতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

প্রথমত, এটি আমাদের ক্যাশলেস সমাজের একটি মিথ্যা আভাস দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব পেমেন্ট সিস্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেও মোট লেনদেনের ৭১ দশমিক ৭২ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে নগদে, যার মোট মূল্যমান ছিল ১৯ দশমিক ৫৮ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ, লেনদেনের সংখ্যার দিক থেকে ৮৪ শতাংশ ডিজিটাল হলেও মূল্যমানের দিক থেকে নগদের আধিপত্য এখনও অটুট।

এর কারণটি সম্পূর্ণ কাঠামোগত; উচ্চ ক্যাশ-আউট ফি এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবের কারণে সাধারণ ব্যবহারকারীরা টাকা অ্যাকাউন্টে আসামাত্রই তা তুলে নেন। যে প্ল্যাটফর্ম মানুষ শুধু টাকা তোলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, তাকে প্রকৃত ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা বলা যায় না, এটি আসলে এক ধরনের ডিজিটাল এটিএম। এই ক্যাশ-আউট সংস্কৃতি বহাল রেখে শুধু ইন্টারঅপারেবিলিটি যোগ করলেই মানুষের আচরণ রাতারাতি বদলে যায় না।

এখানে কেনিয়ার অভিজ্ঞতাটি প্রাসঙ্গিক। বিকাশ যে এমপেসা মডেল থেকে অনুপ্রাণিত, সেই কেনিয়া আজ জিডিপির ৫০ শতাংশেরও বেশি লেনদেন মোবাইলে সম্পন্ন করছে। পার্থক্যটা শুধু প্রযুক্তিতে নয়, কেনিয়া ক্যাশ-আউট ফি কমিয়ে ডিজিটাল অর্থ রাখার প্রণোদনা তৈরি করেছে, আর বাংলাদেশ উল্টো পথে হেঁটেছে।

দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গভীর ব্যর্থতাটি নিহিত রয়েছে খেলাপি ঋণ সংকটের মধ্যে। গত বছরের ২০ ডিসেম্বরে এনপিএল অনুপাত কাগজে-কলমে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে সত্য, কিন্তু এই হ্রাস কোনো প্রকৃত পুনরুদ্ধারের ফসল নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট এবং ১০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ পরিশোধের সুযোগ দিয়ে খেলাপি ঋণ পুনর্তফসিলের যে নমনীয় নীতি নিয়েছে, এটি তারই কৃত্রিম ফল। আইএমএফ-এর শর্ত মেনে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে এনপিএল ৮ শতাংশে নামিয়ে আনার যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা মূলত অবলোপনের মাধ্যমেই পূরণ করা হবে। এর ফলে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার হলেও লুণ্ঠিত টাকা আর ব্যাংকে ফেরত আসবে না। একে ঋণ পুনরুদ্ধার না বলে নামমাত্র হিসাব মেলানোর প্রসাধন বলা চলে। অথচ প্রতিবেশী ভারত বাস্তব ব্যাংক সংস্কারের মধ্য দিয়ে তাদের এনপিএল অনুপাত ২ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে এবং সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় এই গড় এখন ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। বাংলাদেশ সেই সুস্থ আলোচনার ধারেকাছেও নেই।

এই পতনের পেছনে একটি ধারাবাহিক শৃঙ্খল কাজ করে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকরণ হলে তা ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের অন্যায্য সুযোগ করে দেয়। এই খেলাপি সংস্কৃতি ব্যাংকের মূলধন ক্ষয় করে, যা নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতাকে সংকুচিত করে ফেলে। আর এই সংকটের চূড়ান্ত কোপ গিয়ে পড়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক এবং প্রথমবার ঋণপ্রত্যাশীদের ওপর; যাদের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েই মূলত ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের অবতারণা করা হয়েছিল। যে ব্যবস্থা দাবি করছে সে প্রান্তিক মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করছে, সে-ই একই সময়ে কাঠামোগতভাবে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মানুষদের ব্যাংকিং সুবিধা থেকে ছিটকে দিচ্ছে, এর চেয়ে বড় বৈপরীত্য আর কী হতে পারে?

তৃতীয় ব্যর্থতাটি হলো প্রকট ডিজিটাল বিভাজন।