চা শ্রমিকের সস্তা জীবন

শিমলা পাল, লেখক ও কলামিস্ট, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নাগরিক সভ্যতার আড্ডায় বা কর্মব্যস্ততার সকালে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা আমাদের পরম সঙ্গী। সকালের ক্লান্তি মুছে দিতে এক কাপ গরম চায়ের কোনো বিকল্প নেই। যে মানুষগুলোর হাত ধরে আমাদের প্রতিটি সকালের ক্লান্তি মুছে যায়, তখন আমাদের অবচেতনেও কি ভেসে ওঠে পাহাড়ের ঢালে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ তোলা হাতগুলোর কথা? চা শুধু একটি পানীয় নয়; এটি আমাদের অর্থনীতি, আমাদের আতিথেয়তা আর সতেজতার এক অনবদ্য প্রতীক। অথচ, যে মেহনতি মানুষের হাত ধরে এই চায়ের বিশ্বজোড়া সুবাস, তাদের জীবন আজ মুদ্রাস্ফীতির বাজারে কতটা সস্তা আর অবহেলিত, তা ভাবার সময় এসেছে।

বাংলাদেশের চা শিল্প আজ এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। প্রিমিয়াম কোয়ালিটির ব্ল্যাক টি, গ্রিন টি কিংবা হোয়াইট টি এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বয়ে আনছে। অভিজাত ক্যাফেগুলোতে এক কাপ চায়ের দাম এখন ১০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত। অথচ নির্মম বাস্তবতার সমীকরণ দেখুন যে শ্রমিকের হাড়ভাঙা খাটুনিতে এই প্রিমিয়াম পাতাগুলো সংগৃহীত হচ্ছে, তার সারাদিনের ৮ ঘণ্টার তীব্র শারীরিক শ্রমের নগদ মজুরি মাত্র ১৭৮ টাকা! অর্থাৎ, শহুরে জীবনের এক কাপ চায়ের দামের চেয়েও কম একজন চা শ্রমিকের পুরো একটা দিনের জীবনের মূল্য। এই চরম অবহেলা ও বৈষম্য সভ্যতার বুকে এক বড় আঘাত। বর্তমান আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্যের ও মুদ্রাস্ফীতির বাজারে এই সামান্য আয়ে শ্রমিকদের জন্য পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা এবং সন্তানদের শিক্ষা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

২০২২ সালের ঐতিহাসিক আন্দোলনের পর যখন চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা করা হয়েছিল। আবার ২০২৪ সালের মজুরি বোর্ডের চূড়ান্ত গেজেট অনুযায়ী চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৮ টাকা বাড়িয়ে ১৭৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই মুদ্রাস্ফীতির বাজারে ১৭৮ টাকার এই মজুরি কাঠামো আজ শুধু তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু বিগত কয়েক বছরের লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি সেই আশাকে চিরতরে নুন-ভাতের থালায় বন্দি করে ফেলেছে। সমসাময়িক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে একটু গাণিতিক হিসাব কষা যাক। বর্তমান বাজারে এক কেজি চালের দাম ৬৫-৭০ টাকা, এক লিটার ভোজ্যতেল ১৬০ টাকার ওপরে,। এই বাজারে একজন চা শ্রমিক ১৭৮ টাকা নিয়ে যখন হাটে যান, তখন তার থলিতে চালের পর আর কোনো পুষ্টিকর খাদ্য তো দূর, একমুঠো ডাল বা সামান্য সবজি কেনার টাকাও অবশিষ্ট থাকে না। আর মাছ মাংসের কথা তো বাদই দেওয়া যাক। এক বুক অবহেলা আর পেটের ক্ষুধা নিয়ে পাহাড়ের ঢালু জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলোর দিন কাটে আধপেটা খেয়ে। অথচ যে চা-শিল্প দেশকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা এনে দিচ্ছে, সমসাময়িক এই মুদ্রাস্ফীতির বাজারে সেই শিল্পের প্রাণ চা-শ্রমিকদের জীবন আজ সবচেয়ে সস্তা আর অবহেলিত।

বাগান মালিকদের পক্ষ থেকে প্রায়ই যুক্তি দেওয়া হয় যে, শ্রমিকদের সস্তায় রেশন (চাল বা আটা), কাঁচা বাসস্থান এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই এই ‘সুযোগ-সুবিধায়’ লুকিয়ে থাকা ফাঁকিটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রেশনের আটা বা চালের মান এতটাই নিম্নমুখী যে তা অনেক সময়ই খাওয়ার অনুপযোগী। আর চিকিৎসার নামে বাগানের ডিসপেনসারিগুলোতে প্যারাসিটামল ছাড়া আর কোনো ওষুধ মেলে না বললেই চলে। ফলস্বরূপ, অপুষ্টির এক ভয়াবহ চক্র প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আবর্তিত হচ্ছে চা বাগানগুলোতে। কম মজুরির কারণে শ্রমিকদের সন্তানরা পুষ্টিহীনতায় ভোগে, মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেয় এবং জীবনধারণের তাগিদে কিশোর বয়সেই আবার সেই ১৭৮ টাকার সস্তা শ্রমের বৃত্তে নিজেকে সঁপে দিতে বাধ্য হয়। দারিদ্র্যের এই উত্তরাধিকার যেন এক অন্তহীন ফাঁদ।

যেখানে দৈনিক আয় মাত্র ১৭৮টাকা, সেখানে সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগানো এক অলীক বিলাসিতা। একবিংশ শতাব্দীর এই মুদ্রাস্ফীতির বাজারে পরিবারগুলোকে প্রতিদিন এক নির্মমতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তারা কি রাতে চাল কিনে পেটের ক্ষুধা মেটাবে, নাকি সন্তানের জন্য কলম আর খাতা কিনবে? খাতাণ্ডকলমের চেয়ে চালের দাবিটাই যেখানে বেঁচে থাকার তাগিদে জয়ী হয়, সেখানে শিক্ষার আলো শুরুতেই নিভে যায়। বাগানগুলোর ভেতরে মানসম্মত স্কুল নেই, আর দূরের সরকারি বিদ্যালয়ে যাওয়ার মতো যাতায়াত খরচ বা প্রাইভেট পড়ার ফি জোগানো তো রূপকথার মতো। ফলে, বুকভরা স্বপ্ন থাকা সত্ত্বেও অর্থাভাবে মাঝপথেই ঝরে পড়ে এই শিশুরা। যে বয়সে তাদের হাতে বই থাকার কথা, সেই কৈশোরেই বাধ্য হয়ে পিঠে ঝুঁড়ি বেঁধে তারা নেমে পড়ে চা-বাগানের ঢালু পাহাড়ে। শিক্ষার এই অপমৃত্যু তাদের ভাগ্যবদলের সব পথ বন্ধ করে দেয় এবং কিশোর বয়সেই তারা বাবা-মায়ের মতো সেই ১৭৮ টাকার সস্তা শ্রমের অন্তহীন খাঁচায় বন্দি হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই আধুনিক যুগেও চা শ্রমিকরা এক প্রকার ভূমিহীন নাগরিক। দেড়শত বছর ধরে বংশানুক্রমিকভাবে তারা এই বাগানের মাটিতে রক্ত পানি করলেও, সেই জমির ওপর তাদের কোনো আইনি মালিকানা নেই। বাগান কর্তৃপক্ষ চাইলে যেকোনো সময় তাদের উচ্ছেদ করতে পারে। ফলে তারা স্বাধীনভাবে বাঁচতেও পারেন না, আবার এই নামমাত্র মজুরির বৃত্ত ছেড়ে অন্য কোথাও চলেও যেতে পারেন না। এই কাঠামোগত বন্দিত্ব ও ভূমির অধিকারহীনতা আধুনিক যুগের এক অলিখিত দাসপ্রথাই মনে করিয়ে দেয়। সভ্যতার তৃষ্ণা মেটানো চায়ের কাপের প্রতি ফোঁটা সুবাসে আর কতকাল মিশে থাকবে এই মেহনতি মানুষের দীর্ঘশ্বাসের লোনা জল? এই নির্মম অবহেলা আর সস্তা শ্রমের বৃত্ত ভেঙে এখনই রাষ্ট্র ও বাগান মালিকদের এগিয়ে আসতে হবে; রেশন বা অনুগ্রহ নয়, তাদের ন্যায্য মজুরি আর ভূমির স্থায়ী অধিকার নিশ্চিত করাই হোক সমসাময়িক সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। যে শ্রমিকের হাত ধরে আমাদের প্রতিটি সকাল সতেজ হয়ে ওঠে, তাদের জীবনের গল্পে এমন নির্মম অবহেলা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।